রাজনৈতিক পালাবদল ও দুর্নীতির ভবিষ্যৎ: কেন ‘নাহিদ-সারজিসরা’ পালাতে পারবেন না? — গোলাম মাওলা রনির বিশ্লেষণের আলোকে
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণে সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদল এবং দুর্নীতিবাজদের পরিণতি নিয়ে এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ‘নাহিদ-সারজিসরা’ চাইলেও শেষ মুহূর্তে দেশ ছেড়ে পালাতে পারবেন না, যা দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে চলমান অস্থিরতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের দিকে ইঙ্গিত করে।
একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রনি যে পর্যবেক্ষণগুলি তুলে ধরেছেন, তা বিশ্লেষণ করলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো পরিলক্ষিত হয়:
‘সেফ এক্সিট’ একটি পুরনো কৌশল, কিন্তু এবার ভিন্ন প্রেক্ষাপট
গোলাম মাওলা রনি তার বিশ্লেষণে প্রথমেই স্বীকার করেছেন যে, ক্ষমতা থেকে হঠাৎ পতন বা অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় একটি ‘সেফ এক্সিট’ বা নিরাপদে দেশত্যাগ করার প্রবণতা আমাদের দেশে নতুন নয়। তিনি ওয়ান-ইলেভেনের মতো পরিস্থিতি বা অন্যান্য সময়ে দ্রুত অর্থ উপার্জনকারী ও বিদেশে টাকা পাচারকারীদের লন্ডন, আমেরিকা বা দুবাইয়ের ‘বেগমপাড়া’য় পালিয়ে যাওয়ার অতীতের উদাহরণ টেনেছেন।
তিনি বলছেন, এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে কিছু মানুষ দ্রুত দেশত্যাগ করে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
কেন নতুন প্রজন্মের দুর্নীতিবাজরা পালাতে পারবেন না?
রনির মতে, বর্তমানে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে যারা দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত, তাদের একটি অংশ (যেমন নাহিদ, সারজিস, হাসনাত প্রমুখ) সরকারের উত্থানে বিরাট অবদান রেখেছেন। কিন্তু, যখন পালানোর সময় আসবে, তখন তাদের পথ কঠিন হয়ে উঠবে।
রনির যুক্তিটি তাৎপর্যপূর্ণ:
“পালানোর মতো যে বয়স দরকার, যে কৌশল দরকার, ওটা রপ্ত করতে তাদের আরো ১০-১৫ বছর লাগবে।”
তিনি মনে করেন, বর্তমানে যারা ক্ষমতায় আছেন, তাদের একটি বিরাট অংশ অভিজ্ঞ এবং জীবন যুদ্ধে অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। কিন্তু ‘নাহিদ-সারজিসদের’ মতো তুলনামূলক নতুনদের সেই অভিজ্ঞতা, কৌশল ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। ফলে, অভিজ্ঞদের অনেকেই হয়তো ঠিক সময়ে পালাতে পারলেও, অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞরা চাইলেও সহজে বিদেশে পাড়ি জমাতে পারবেন না। যদি তাদের মধ্যে গণপিটুনি খাওয়ার ভয় থাকে এবং তারা মন্দ কাজে জড়িত হয়ে থাকেন, তবে পালানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হবেন।
রাজনীতির নতুন সংঘাতপূর্ণ ‘ট্রেন্ড’: অপমান ও জনরোষের ভয়
রনি তার বিশ্লেষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেন রাজনীতির নতুন ‘সংঘাতপূর্ণ ধারা’। তিনি দাবি করেন, দেশের রাজনীতিতে এখন প্রতিহিংসা ও চরম অপমানের একটি নতুন প্রবণতা শুরু হয়েছে।
তিনি আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতাদের প্রতি যে আচরণ করা হচ্ছে, তার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি উদাহরণস্বরূপ সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের মতো হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিদের গ্রেফতার, দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে দেওয়া, এবং পিঠমোড়া করে হাতকড়া পরানোর ঘটনার উল্লেখ করেন।
এখানে তিনি যে চিত্রায়ণটি করেন, তা এই নতুন রাজনৈতিক সহিংসতার মাত্রা তুলে ধরে:
“এরপর দুইজনের পরনে নতুন লুঙ্গি পরিয়ে দিল। এমন লুঙ্গি পরিয়ে দিল, দেখে মনে হলো যেন দুজনের একসঙ্গে সুন্নতে খতনা করানোর মতো তাদেরকে নতুন লুঙ্গি পরিয়ে দেয়। এই যে একটা ট্রেন্ড চালু হলো, আপনার কি মনে হয় এটা থেমে থাকবে? না, কখনই থেমে থাকবে না।”
ভবিষ্যৎবাণী: সংঘাত আরও বাড়বে
গোলাম মাওলা রনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, এই সংঘাতপূর্ণ ও অপমানের প্রবণতা আর থামবে না। বরং, আগামীতে সালমান এফ রহমানের সঙ্গে যা করা হয়েছে, তার চেয়েও বেশি কঠোর ও অপমানজনক ঘটনা ঘটতে পারে। এটি মূলত দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতাশালীদের প্রতি জনগণের এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তীব্র ক্ষোভের প্রকাশ।
গোলাম মাওলা রনির এই বিশ্লেষণ বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যপটের এক ভয়াবহ দিক উন্মোচন করে। একদিকে যেমন ক্ষমতাশালীদের দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের পুরনো প্রবণতা রয়েছে, তেমনই অন্যদিকে রয়েছে ক্ষমতার পালাবদলের সময় জনরোষ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মাধ্যমে কঠিন শাস্তির ঝুঁকি।
তার মতে, অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ দুর্নীতিবাজরা, যারা ভেবেছিলেন দ্রুত অর্থ বিত্ত গড়ে তুলে ‘সেফ এক্সিট’ নেবেন, তাদের সেই কৌশল হয়তো আর কাজ করবে না। রাজনীতির মাঠে এখন ‘গণপিটুনি’র ভয় এতটাই প্রকট যে, পালানোর কৌশল না জানা ‘নাহিদ-সারজিসদের’ পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত নির্মম। এই বিশ্লেষণ ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য এক কঠিন বার্তা বহন করছে—ক্ষমতা ও দুর্নীতির খেলার দিন হয়তো শেষ হতে চলেছে, আর তার স্থানে আসছে চরম সংঘাতের এক নতুন অধ্যায়।

মন্তব্যসমূহ