​সোনার দামে 'রেকর্ড-হ্যাট্রিক': কয়েক দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে কী?



বাংলাদেশের বাজারে স্বর্ণের দাম যেন এখন 'পাগলা ঘোড়া'র মতো ছুটছে। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে পরপর দু'বার মূল্যবৃদ্ধি করে দেশের ইতিহাসে মূল্যবান এই ধাতুর দামে তৈরি হয়েছে নতুন রেকর্ড। এতে যেমন সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, তেমনি বিনিয়োগকারী এবং স্বর্ণ ব্যবসায়ীরাও রয়েছেন এক জটিল পরিস্থিতিতে।

সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা অতীতের সব রেকর্ডকে ছাপিয়ে গেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) এই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে, যা কার্যকর হয়েছে দ্রুত সময়ের ব্যবধানে।

মূল্যবৃদ্ধির সাম্প্রতিক চিত্র

বিভিন্ন সংবাদপত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল একবারের ঘোষণা নয়, বরং একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

 * ৬ অক্টোবর: প্রথম দফায় বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, যখন ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ১৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়ে।

 * ৭ অক্টোবর: এর ঠিক একদিন পরেই দ্বিতীয় দফায় দাম সমন্বয় করা হয়, যেখানে প্রতি ভরিতে আরও ১ হাজার ৪৬৯ টাকা বেড়ে যায়।

 * ৮ অক্টোবর: আবারও দাম বাড়ানো হয় প্রায় ৭ হাজার টাকা, যা দামকে ২ লাখ ৯ হাজার টাকার মাইলফলকে নিয়ে গেছে।

অর্থাৎ, এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল দ্বিতীয় দফায় থেমে থাকেনি, বরং টানা তিন দিন ধরে এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে।

কেন এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি?

বাজুস সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধি এবং স্থানীয় বাজারে 'তেজাবি স্বর্ণের' (Pure Gold) দাম বাড়ার কারণে মূল্য সমন্বয় করে থাকে। তবে, একাধিক সংবাদপত্রের বিশ্লেষণ বলছে, এই দ্রুত ও বিশাল মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আরও কয়েকটি কারণ রয়েছে:

১. আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব: বিশ্বব্যাপী স্বর্ণের দাম বর্তমানে অস্থির। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ ক্রয় বৃদ্ধি, ডলারের দুর্বলতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম দ্রুত বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বাজারে।

২. ডলারের উচ্চ মূল্য: বাংলাদেশে ডলারের মূল্য দীর্ঘদিন ধরেই উর্ধ্বমুখী। স্বর্ণ আমদানি করতে হয় ডলারে। ডলারের বিনিময় হার বাড়লে আমদানি খরচ বেড়ে যায়, যা স্থানীয় বাজারে স্বর্ণের দামকে বাড়িয়ে দেয়।

৩. স্থানীয় 'পিওর গোল্ড' সংকট: বাজুসের দাবি অনুযায়ী, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সমন্বয় করা হয়েছে। তবে, এর পেছনে সরবরাহ শৃঙ্খলের কোনো সমস্যা রয়েছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়।

৪. মুদ্রাস্ফীতি: দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ সঞ্চয় ধরে রাখতে সোনাকে একটি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে দেখছে। এতে চাহিদা বাড়ছে, যা মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া

স্বর্ণের এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি বাজারে মিশ্র প্রভাব ফেলছে:

 * ক্রেতা কমে যাওয়া: জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দাম বাড়ার কারণে অলঙ্কার বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। অনেকে প্রয়োজনেও স্বর্ণ কিনতে পারছেন না। বিশেষত দুর্গাপূজা এবং শীতকালীন বিয়ের মৌসুম সামনে থাকলেও ক্রেতা সমাগম কম।

 * বিনিয়োগে আকর্ষণ: অন্যদিকে, অনেকে সোনাকে আরও বেশি নিরাপদ বিনিয়োগ মনে করছেন এবং পুরোনো স্বর্ণ বিক্রি করে দিচ্ছেন।

ভবিষ্যৎ কী?

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরে না আসা পর্যন্ত স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা বজায় থাকতে পারে। ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের বাজারে স্বর্ণের দামের ভবিষ্যৎ। এই রেকর্ড ভাঙা মূল্যবৃদ্ধির ধারা থামবে কিনা, তা দেখার জন্য সবাইকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

মন্তব্যসমূহ