এইচএসসি ফলাফল: 'বিপর্যয়' নাকি 'প্রকৃত চিত্র'?
গতকাল প্রকাশিত উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল দেশের শিক্ষা অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ২১ বছরের মধ্যে এবারই সর্বনিম্ন পাসের হার (৫৮.৮৩%) রেকর্ড করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ কম। একই সাথে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। এই ফলাফলকে কেউ বলছেন ‘ফল বিপর্যয়’, আবার কেউ দেখছেন দীর্ঘদিনের শিক্ষা সংকটের বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে। এখন প্রশ্ন হলো, এটি কি নেহাতই একটি ফল বিপর্যয়, নাকি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোর প্রকৃত চিত্র?
ফলাফল বিপর্যয়ের পক্ষের যুক্তি
হঠাৎ করে পাসের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যায় এমন বড় ধরনের পতনকে অনেকেই ‘ফলাফল বিপর্যয়’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। এর পেছনে যেসব কারণ থাকতে পারে, তা হলো:
* কোভিড-১৯ জনিত ‘লার্নিং লস’ (Learning Loss): এই শিক্ষার্থীরা তাদের মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকের অনেকটা সময় মহামারীর কারণে স্বাভাবিক ক্লাসরুম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল। সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা দিলেও দীর্ঘদিনের শিক্ষণ ঘাটতি রয়ে গেছে, যা চূড়ান্ত ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
* শিক্ষক ও মূল্যায়ন পদ্ধতির কঠোরতা: শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করছেন, ফলাফলের মানের পরিবর্তন আসায় এ বছর খাতা মূল্যায়নে কঠোরতা অবলম্বন করা হয়েছে। যদি এই কঠোরতা মান নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে, তবে এটি প্রশংসনীয়, তবে শিক্ষার্থীদের কাছে তা বিপর্যয় হিসেবেই ধরা দেবে।
* পরীক্ষার শর্তে পরিবর্তন: গত কয়েক বছর ধরে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে এবং কম বিষয়ে পরীক্ষা হলেও, এবার প্রায় পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস ও পূর্ণ নম্বর-সময়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে না পারাও একটি বড় কারণ হতে পারে।
প্রকৃত চিত্রের পক্ষের যুক্তি
শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা কিন্তু এই ফলাফলকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। তাদের মতে, বিগত বছরগুলোতে পাসের হার যে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, তা ছিল 'কৃত্রিম সাফল্য'। এবার তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত ফলাফল এসেছে, যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোকে তুলে ধরেছে।
* কৃত্রিম পাসের হার থেকে মুক্তি: ২০২০ সালের 'অটোপাস' এবং পরের দুই বছর কোভিড-জনিত সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও শিথিল মূল্যায়নের কারণে পাসের হার ছিল অস্বাভাবিক বেশি (২০২০: ১০০%, ২০২১: ৯৫.২৬%, ২০২২: ৮৫.৯৫%)। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই কৃত্রিম হার থেকে বেরিয়ে এসে এবারের ফলাফল শিক্ষার্থীর প্রকৃত মানের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
* শিখন ঘাটতির প্রকাশ: শিক্ষা উপদেষ্টারা এই ফলাফলকে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু হওয়া ‘শিখন ঘাটতির’ চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা, মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব এবং অপর্যাপ্ত অবকাঠামো—দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এসব সমস্যার সমাধান না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার স্তরে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ছে।
* গুণগত মান রক্ষার ইঙ্গিত: কেউ কেউ মনে করছেন, পাসের হার কম হলেও এটি শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত মান বজায় রাখার চেষ্টার একটি প্রতিফলন। শুধু পাসের সংখ্যা বৃদ্ধি না করে, যারা সত্যিই মান অর্জন করেছে, তাদেরই উত্তীর্ণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।এ
খন কী করণীয়?
এইচএসসি পরীক্ষার এই ফলাফলকে স্রেফ ‘বিপর্যয়’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, আবার এটিকে ‘পূর্ণাঙ্গ প্রকৃত চিত্র’ বলেও স্বস্তি পাওয়ার অবকাশ নেই। বরং এই ফলাফল হলো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা।
এটি একটি বাস্তবতার আয়না, যা আমাদের শিক্ষা প্রশাসনের কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, শুধুমাত্র পরীক্ষা পদ্ধতি বা মূল্যায়নে সাময়িক কঠোরতা এনে সমস্যার সমাধান হবে না। এর জন্য প্রয়োজন:
* গভীর বিশ্লেষণ: কেন এই পতন ঘটল, তার কারণ খুঁজে বের করে বোর্ড ও অঞ্চলভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা।
* দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা: বিশেষত কোভিড-১৯ এর কারণে তৈরি হওয়া লার্নিং লস পূরণে জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচি গ্রহণ করা।
* গুণগত মান উন্নয়ন: মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষাকে উৎসাহিত করা এবং শিক্ষকের মান উন্নয়নে বিনিয়োগ করা।
এই ফলাফল আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল পাসের সার্টিফিকেট অর্জন নয়, বরং মানসম্মত জ্ঞান অর্জন। সরকার ও শিক্ষাবিদদের এখন এই ফলাফলের নেপথ্যের কারণগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করে শিক্ষাব্যবস্থায় টেকসই ও মৌলিক পরিবর্তন আনা দরকার।

মন্তব্যসমূহ