মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড দুর্ঘটনা: নকশা ত্রুটি না রক্ষণাবেক্ষণের অভাব?
ঢাকাবাসীর জন্য আধুনিক গণপরিবহণের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল মেট্রোরেল। তবে, সাম্প্রতিক একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা সেই স্বপ্নযাত্রায় এক গুরুতর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। ২৬ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের একটি বিয়ারিং প্যাড (কম্পনরোধক স্প্রিং) খুলে নিচে পড়ে গিয়ে এক পথচারীর মৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশের প্রায় সব গণমাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদ বিশ্লেষণ বলছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এক বছর আগেও একই ধরনের ব্যর্থতা উদ্বেগের জন্ম দিয়েছিল।
এই দুর্ঘটনা কেবল একটি প্রাণহানির খবর নয়, এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পের নকশা, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ কেজি ওজনের একটি বিয়ারিং প্যাড উড়ালপথ থেকে মাটিতে ছিটকে পড়া এবং নিচে থাকা এক ব্যক্তির (নিহত আবুল কালাম, ৩৫) ওপর আঘাত হানার ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, সামান্য ত্রুটিও কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা ও নকশাগত ত্রুটির প্রশ্ন
সংবাদ সূত্র অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ফার্মগেট-খামারবাড়ি এলাকায় একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল। সেইবার ট্রেন চলাচল প্রায় ১১ ঘণ্টা বন্ধ থাকলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু সেই দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি এবং বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছিল, আজকের মর্মান্তিক ঘটনা সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।
বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন, নকশাগত ত্রুটির কারণেই এমন দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, "যেখানে ট্রেন বাঁক নেয়, সেখানে চাপ বেশি থাকে। কিন্তু নকশাতেই হয়তো এই অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়নি।" তিনি আরও উন্নত প্রযুক্তির 'পড বিয়ারিং' ব্যবহারের পরামর্শ দেন। মূলত, বিয়ারিং প্যাডগুলো ট্রেনের ওজন বহন করা ছাড়াও রেল চলার সময় সৃষ্ট কম্পন এবং এমনকি ভূমিকম্পের সময়ও কাঠামোর ভারসাম্য রক্ষা করে। লাইনের বাঁকানো অংশে যেখানে কাঠামোর ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে, সেখানেই প্যাড খুলে পড়ার ঘটনা বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বকে সমর্থন করছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও দায়বদ্ধতার সংকট
দুর্ঘটনার পর মেট্রোরেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগের উপদেষ্টা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ডিএমটিসিএল-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগের ঘটনার পর প্রতিটি পিলার পরীক্ষা করা হয়েছিল। তবে, উপদেষ্টা যখন প্রশ্ন তোলেন, “তাহলে এই ঘটনা কেন ঘটল?”, তখন দায়বদ্ধতার বিষয়টি স্পষ্টতই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সংবাদে আরও উঠে এসেছে যে, জাপানি ঠিকাদারদের এটি ঠিক করতে বলা হলেও তারা সেটি করেনি। ফলে, প্রশ্ন উঠেছে: এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও কেন সেটি সংশোধন করা হয়নি এবং এর জন্য সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
তদন্ত ও ক্ষতিপূরণ: তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া
দুর্ঘটনার পরপরই উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকার সেতু বিভাগের সচিবকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছে। একই সাথে, নিহত আবুল কালামের পরিবারকে প্রাথমিকভাবে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং পরিবারের কোনো সক্ষম সদস্য থাকলে মেট্রোরেলে চাকরির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো মানবিক হলেও, জননিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে যথেষ্ট নয়।
নিরাপত্তা ও আস্থার ফাটল
মেট্রোরেল ঢাকাবাসীর জন্য ছিল এক গর্বের প্রতীক। কিন্তু বারবার একই ধরনের দুর্ঘটনা, বিশেষ করে যেখানে মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তা সাধারণ জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আস্থার ফাটল সৃষ্টি করছে। মেট্রোরেল ব্যবহারকারীরা এখন কেবল ট্রেনের ভেতরেই নয়, নিচে হাঁটার সময়ও নিজেদের অনিরাপদ মনে করতে পারেন।
এই দুর্ঘটনাটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি আধুনিক ও দ্রুতগতির গণপরিবহণ ব্যবস্থার নির্মাণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এর ত্রুটিমুক্ত নকশা, উচ্চ মানসম্পন্ন নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবহার এবং কঠোর ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ আরও বেশি জরুরি। বিয়ারিং প্যাড খুলে পথচারীর মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার একটি গুরুতর দুর্বলতা। তদন্তের পর দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে, এই 'স্বপ্নযাত্রা' অচিরেই 'উদ্বেগের যাত্রায়' পরিণত হতে পারে। সরকারের উচিত হবে কেবল ক্ষতিপূরণ বা আশ্বাস নয়, বরং অবকাঠামোগত নিরাপত্তার সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

মন্তব্যসমূহ