ছায়াপথ পেরিয়ে প্রাণের খোঁজ: জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের নতুন দিগন্ত

ব্যাঙেরছাতা


আদি অনন্তকাল ধরে মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলির মধ্যে অন্যতম হলো—আমরা কি একা? পৃথিবী বা আমাদের ছায়াপথ, মিল্কিওয়েতে প্রাণের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক রাসায়নিক উপাদানগুলি কি কেবল আমাদের জন্যই বিশেষ? সম্প্রতি, এই প্রশ্নের একটি যুগান্তকারী উত্তর খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার মহাবিশ্বের রাসায়নিক ইতিহাস এবং প্রাণের উৎপত্তি সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আমূল পরিবর্তন করতে পারে।

নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার এবং ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ডের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) ব্যবহার করে আমাদের ছায়াপথের বাইরে অন্য একটি গ্যালাক্সিতে প্রাণের জন্য অপরিহার্য জটিল জৈব অণু (Complex Organic Molecules - COMs) আবিষ্কার করেছেন। বিজ্ঞানীদের এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স’-এ। এই অনুসন্ধান ইঙ্গিত দেয় যে, জীবনের উপাদানগুলি মহাবিশ্বের এক বিশাল অংশ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে।

বরফের মধ্যে জমে থাকা 'জীবনের বীজ'



বিজ্ঞানীরা এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি করেছেন আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী একটি বামন ছায়াপথে, যার নাম লার্জ ম্যাগেলানিক ক্লাউড (Large Magellanic Cloud - LMC)। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির এই উপগ্রহ ছায়াপথটি দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে খালি চোখেও দেখা যায়। LMC-এর মধ্যে ST6 নামক একটি নবীন নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা বরফের পুরু আবরণের মধ্যে তাঁরা পাঁচটি জটিল জৈব অণুর সন্ধান পেয়েছেন। এই অণুগুলি বরফের মধ্যে জমাট বাঁধা অবস্থায় ছিল, যা মহাকাশের ধূলিকণার গায়ে লেগে থাকা বরফের স্তরকে বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে।

এই আবিষ্কৃত অণুগুলির মধ্যে রয়েছে:

  ০১। মিথানল (Methanol)।

  ০২। ইথানল (Ethanol) (সাধারণ অ্যালকোহল)।

  ০৩। অ্যাসিটালডিহাইড (Acetaldehyde)।

  ০৪। মিথাইল ফরমেট (Methyl Formate)।

  ০৫। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অ্যাসেটিক অ্যাসিড (Acetic Acid)।

এই পাঁচটি অণুর মধ্যে ইথানল, অ্যাসিটালডিহাইড এবং মিথাইল ফরমেট অণুকে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরে বরফের মধ্যে এই প্রথমবার শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হলো অ্যাসেটিক অ্যাসিড (যা ভিনেগারের প্রধান উপাদান)। এই অণুটি এর আগে মহাকাশের বরফের মধ্যে কোথাও নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি। এই জটিল জৈব অণুগুলি প্রিবায়োটিক রসায়নের (Prebiotic Chemistry) জন্য এক অপরিহার্য 'বিল্ডিং ব্লক' হিসেবে বিবেচিত হয়। এগুলি অন্তত ছয়টি পরমাণু এবং একটি কার্বন পরমাণু নিয়ে গঠিত। বিজ্ঞানীদের কাছে এদের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এই COMs-গুলিই অ্যামিনো অ্যাসিড, চিনি বা নিউক্লিওবেসের মতো বৃহত্তর জীবন-গঠনকারী অণুর পূর্বসূরি হিসেবে কাজ করে। এই আবিষ্কারের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছেন যে, পৃথিবীতে প্রাণের প্রাথমিক অণুগুলির উৎপত্তির আগে মহাজাগতিক ধূলিকণায় কীভাবে এই রাসায়নিক যৌগগুলি তৈরি হয়েছিল।

প্রতিকূল পরিবেশেও প্রাণের উপাদানের উপস্থিতি

এই আবিষ্কারের গুরুত্ব কেবল অন্য গ্যালাক্সিতে জৈব অণুর সন্ধান পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যে পরিবেশে এই অণুগুলি পাওয়া গেছে, তার মধ্যেও এর গভীর তাৎপর্য নিহিত। লার্জ ম্যাগেলানিক ক্লাউডের পরিবেশ আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিকূল বা 'কঠোর'।

LMC-তে আমাদের গ্যালাক্সির চেয়ে ধাতবতা (Metallicity) অনেক কম। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায়, হিলিয়ামের চেয়ে ভারী মৌলিক উপাদানগুলিকে 'ধাতু' বলা হয়। LMC-তে কার্বন, নাইট্রোজেন বা অক্সিজেনের মতো ভারী উপাদানের পরিমাণ কম। এছাড়া, এখানে অতিবেগুনী বিকিরণের মাত্রা অনেক তীব্র এবং ধুলোর পরিমাণও তুলনামূলকভাবে কম।



সাধারণ ধারণা ছিল, এমন কঠোর রাসায়নিক পরিবেশে এত জটিল জৈব অণু তৈরি হওয়া বা টিকে থাকা বেশ কঠিন। কিন্তু জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের মিড-ইনফ্রারেড ইনস্ট্রুমেন্ট (MIRI)-এর সাহায্যে সংগৃহীত ডেটা প্রমাণ করেছে যে, এই প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রাণের উপাদানগুলি কার্যকরভাবে তৈরি হতে পারে। এই আবিষ্কারের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, জীবন-সৃষ্টিকারী রাসায়নিক উপাদানগুলি মহাবিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে এবং অত্যন্ত স্থিতিশীল বা মজবুত। লাইডেন ইউনিভার্সিটির গবেষক উইল রোচা বলেছেন, "LMC-তে বরফের মধ্যে COMs শনাক্তকরণ প্রমাণ দেয় যে এই ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া সৌরজগতের নিকটবর্তী এলাকার চেয়ে অনেক কঠোর পরিবেশেও কার্যকরীভাবে ঘটতে পারে।"

মহাবিশ্বের জন্ম-রসায়ন এবং ভবিষ্যৎ গবেষণা

গবেষক দলের প্রধান, ড. মার্টা সেউইলো (Marta Sewiło) জানিয়েছেন, এই আবিষ্কার প্রাথমিক মহাবিশ্বের রাসায়নিক গঠনের দুর্লভ তথ্য জানার সুযোগ করে দিয়েছে। LMC-এর কম ধাতবতার পরিবেশ আদি মহাবিশ্বের (Early Universe) পরিবেশের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই পরিবেশে জটিল জৈব অণুর উপস্থিতি নির্দেশ করে যে, প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলি আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক আগে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে গঠিত হতে শুরু করেছিল।

এই আবিষ্কার আরও একবার মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা মহাজাগতিক এক বিশাল প্রক্রিয়ার অংশ। জীবনের প্রাথমিক উপাদানগুলি কেবল সৌরজগতের কাছাকাছিই নয়, বরং পুরো মহাবিশ্বেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বিজ্ঞানীরা এখন লার্জ ম্যাগেলানিক ক্লাউড এবং স্মল ম্যাগেলানিক ক্লাউডের (Small Magellanic Cloud) মতো আরও নক্ষত্র তৈরির অঞ্চলগুলিতে গবেষণা করার পরিকল্পনা করছেন।



ড. সেউইলো আরও বলেন, "আমাদের কাছে বর্তমানে লার্জ ম্যাগেলানিক ক্লাউডে মাত্র একটি উৎস রয়েছে এবং মিল্কিওয়েতে এই অণুগুলি শনাক্তকরণের চারটি উৎস রয়েছে। এই দুটি ছায়াপথের মধ্যে জৈব অণুর প্রাচুর্যে কোনো পার্থক্য আছে কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের উভয় স্থান থেকে আরও বেশি নমুনার প্রয়োজন।" তবুও, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের এই অনুসন্ধান নিশ্চিত করে যে, প্রাণের আবির্ভাব কোনো দৈব ঘটনা নয়, বরং এটি মহাজাগতিক রাসায়নিকের একটি সাধারণ পরিণতি, যা সুদূর ছায়াপথের বরফের কণাগুলিতেও তার স্বাক্ষর রেখে চলেছে।

মন্তব্যসমূহ