জুলাই সনদ দিয়ে আদৌ কি বাংলাদেশের কোনো পরিবর্তন আসবে?



পুরোনো বোতলে নতুন মদ! ‘জুলাই সনদ’ কি কেবলই এক অলঙ্কার?

গতকাল ১৭ অক্টোবর, ২০২৫, জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় মুহাম্মদ ইউনূস এবং দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বহু আলোচিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’- এ স্বাক্ষর করলেন। সংবাদমাধ্যমগুলো একে ‘নতুন বাংলাদেশের সূচনা’, ‘ঐতিহাসিক দিন’ এবং ’নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে এক সামাজিক চুক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জাঁকজমকপূর্ণ এই আনুষ্ঠানিকতা কি আমাদের দেশের মৌলিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে? নাকি এটি ক্ষমতার পালাবদলের পুরোনো নাটকেরই নতুন এক দৃশ্যপট?

প্রত্যাশিত পরিবর্তন নাকি পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা?

জুলাই সনদে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য মোট ৮৪টি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা যায়। কাগজে-কলমে এটি একটি প্রগতিশীল দলিল। কিন্তু এর বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর সংশয়।

 * বিভেদের সুর: সংবাদ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রায় ৩০টি দলকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও মাত্র ২৫টি দল অনুষ্ঠানে অংশ নেয় এবং এর মধ্যে ২৪টি দল সনদে স্বাক্ষর করে। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল গণফোরাম এবং কয়েকটি বাম ধারার দল এতে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত ছিল। এমনকি, জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম অংশীদার 'জুলাই যোদ্ধারা' ব্যানারে একদল লোক অনুষ্ঠানস্থলে এসে বিক্ষোভ করেছে, যা পরে সংঘর্ষের রূপ নেয়। একটি 'জাতীয় ঐকমত্যের দলিল' যখন নিজেই এমন বিভেদ ও সংঘাতের জন্ম দেয়, তখন এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ঐক্যের স্বপ্ন দেখাটা কি দিবাস্বপ্ন নয়?

 * আইনি কার্যকারিতা ও গণভোটের ধূম্রজাল: সনদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো কার্যকর করার জন্য গণভোটের কথা বলা হচ্ছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ জিল্লুর রহমানের মতে, গণভোটে যদি সনদের ৮৪টি প্রস্তাব একসঙ্গে 'হ্যাঁ-না' ভোটের মাধ্যমে যায়, তাহলে ভোটাররা বিস্তারিত না জেনে সিদ্ধান্ত নেবেন। এটি কেবলই একটি বিভাজনের যন্ত্র হতে পারে। অতীতে বাংলাদেশে গণভোটের অভিজ্ঞতাও খুব একটা সুখকর নয়, যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ছিল। আইনি আদেশ বা প্রজ্ঞাপন জারি না করে কেবল আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই সনদ কতটা আইনগত ভিত্তি পেল, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

 * ক্ষমতাসীনদের নৈতিক দায়বদ্ধতা: সনদে যেসব রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেছে, তাদের অনেকেই অতীতের ক্ষমতা ও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। দুর্নীতি, দুঃশাসন, স্বৈরাচারী আচরণ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের জন্য তাদের দায় কম নয়। প্রশ্ন হলো, যারা নিজেরা অগণতান্ত্রিক চর্চায় অভ্যস্ত, তারা কি কেবল একটি দলিলে স্বাক্ষর করে রাতারাতি গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক হয়ে উঠবেন? এই সনদ বাস্তবায়নের প্রধান দায়িত্ব পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের। কিন্তু স্বাক্ষরকারী দলগুলোর মধ্যে যদি সেই নৈতিক ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকে, তবে সনদের পরিণতি হবে কেবলই স্মারকপত্রের মতো।

মানুষের আকাঙ্ক্ষা বনাম রাজনৈতিক কৌশল

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল দাবি ছিল রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার। কিন্তু এই সনদ প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়াটি কি জনগণের সেই গভীর আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পেরেছে? জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে ঠিকই, তবে এতে নাগরিক সমাজের অংশীদারিত্ব এবং দীর্ঘ আলোচনা, গণশুনানি ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার অভাব ছিল বলে সমালোচকরা মনে করেন।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ সনদটিকে ‘সামাজিক চুক্তি’ বললেও, এটি মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের প্রতি অঙ্গীকারনামা, যার আইনি বা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই সনদ আসলে একটি রাজনৈতিক কৌশল মাত্র, যা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের একটি প্রচেষ্টা হতে পারে।

এতে দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান—যেমন হাসপাতালের উন্নতি, শিক্ষার মান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—নিয়ে কোনো কার্যকর ও অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগের আশ্বাস দেখা যায় না। মানুষ পরিবর্তন দেখতে চায় এসব মৌলিক ক্ষেত্রে, কেবল বড় বক্তৃতা বা আন্তর্জাতিক করতালি নয়।

আলোর নিচে অন্ধকার

’জুলাই সনদ’ কে একটি আশার আলো হিসেবে দেখা যেতে পারত, যদি এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হতো অবিচ্ছিন্ন, বিতর্কহীন ও আইনগতভাবে সুদৃঢ়। কিন্তু বিভেদ, আইনি দুর্বলতা এবং স্বাক্ষরকারী দলগুলোর অতীত কার্যকলাপ—সবকিছুই এই সনদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় সৃষ্টি করে।

তাই, প্রশ্নটা থেকেই যায়—জুলাই সনদ দিয়ে আদৌ কি বাংলাদেশের কোনো পরিবর্তন আসবে? নাকি, এটি কেবলই একটি পোশাকী সংস্কার, যা পুরোনো খেলোয়াড়দেরকেই নতুন মঞ্চে হাজির করার সুযোগ করে দেবে? এই সনদ তখনই সফল হবে, যখন দলগুলো স্বাক্ষর করার দায়বদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিকারের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখাবে। তার আগ পর্যন্ত, এই সনদ আমাদের কাছে কেবলই ‘একটি দলিল’ হিসেবে বিবেচিত হবে, যা একটি বড় পরিবর্তনের সুযোগ পেয়েও তাকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির কাছে বলি দিয়েছে।

মন্তব্যসমূহ