চলচ্চিত্রের অমর নায়ক সালমান শাহ: ২৯ বছর পর হত্যা মামলা, রহস্যের নতুন মোড়!

ব্যাঙেরছাতা


১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। এই তারিখটি বাংলাদেশের কোটি ভক্তের কাছে এক অমোচনীয় শোকের দিন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে রহস্যজনকভাবে বিদায় নেন বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ষণজন্মা সুদর্শন নায়ক সালমান শাহ (প্রকৃত নাম চৌধুরী সালমান শাহরিয়ার ইমন)। মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর, নব্বইয়ের দশকের এই আইকনের রহস্যময় মৃত্যু নিয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আবার যে শোরগোল শুরু হয়েছে, তার মূল কারণ হলো আদালতের এক নতুন নির্দেশ। দীর্ঘদিনের 'অপমৃত্যু' মামলাটি এখন হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

কেন এত আলোচনা? আদালতের নতুন নির্দেশনা

দীর্ঘ ২৯ বছর ধরে সালমান শাহর মৃত্যু 'আত্মহত্যা' নাকি 'পরিকল্পিত হত্যা'— এই প্রশ্নটি ছিল অমীমাংসিত। একাধিক তদন্ত সংস্থা, যেমন থানা-পুলিশ, সিআইডি এবং সবশেষ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবেই চিহ্নিত করেছিল। বিশেষত, ২০২০ সালে পিবিআই তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, পারিবারিক কলহ (স্ত্রী সামিরার সঙ্গে), শাবনূরের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা, সন্তান না হওয়ায় অপূর্ণতা এবং মানসিক যন্ত্রণার কারণে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন।

কিন্তু সালমানের মা নীলা চৌধুরী শুরু থেকেই এটিকে পরিকল্পিত হত্যা বলে দাবি করে আসছেন। তিনি পিবিআই-এর তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে 'নারাজি' আবেদন জানান। সেই নারাজি আবেদন মঞ্জুর করে গত অক্টোবর মাসে (২০২৫) ঢাকা শহরের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত এই চাঞ্চল্যকর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা দায়েরের নির্দেশ দেন। আদালতের এই নির্দেশের পরই রমনা থানায় সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে মোট ১১ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। আর এ কারণেই দেশের বিনোদন জগতে এবং ভক্ত মহলে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

ব্যাঙেরছাতা


আসামির তালিকায় যারা: সাবেক স্ত্রী ও সহকর্মীরা

নতুন করে দায়ের হওয়া এই হত্যা মামলায় যে ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলো হলো:

সামিরা হক: সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী এবং এই মামলার প্রধান আসামি।

আশরাফুল হক ডন: জনপ্রিয় খল-অভিনেতা, যাকে মামলার ৪ নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আজিজ মোহাম্মদ ভাই: চলচ্চিত্রের প্রযোজক ও ব্যবসায়ী, যার নামও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।

ব্যাঙেরছাতা


মামলা দায়েরের পর থেকেই আসামিদের বক্তব্য ও অবস্থান নিয়ে গণমাধ্যমে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। যেমন, সামিরা হক বর্তমানে গা ঢাকা দিয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে, যদিও তার বর্তমান স্বামী জামিন চাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। অন্যদিকে, ডন বারবার দাবি করছেন যে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন, এমনকি সালমান শাহর মৃত্যুর দিন তিনি ঢাকায় ছিলেন না। এসব পুরনো ও নতুন তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'ট্রেন্ডিং' হয়ে উঠেছে।

শাবনূরের প্রতিক্রিয়া ও ভক্তদের ক্ষোভ

সালমান শাহর সঙ্গে তার জুটি ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয়। তার মৃত্যুর সময় থেকেই সহ-অভিনেত্রী শাবনূরের নাম নানাভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল বিতর্কে। সম্প্রতি নতুন করে হত্যা মামলা হওয়ায় শাবনূরও নীরবতা ভেঙেছেন। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এই অভিনেত্রী সংবাদমাধ্যমকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি এই মৃত্যুর বিষয়ে সত্যিই কিছু জানেন না এবং তার নাম জড়ানোকে ভিত্তিহীন গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি কেবল সঠিক তদন্ত ও ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন।

এদিকে, প্রিয় নায়কের হত্যার বিচার চেয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে, যেমন যশোরে, মশাল মিছিল করেছেন সালমান শাহর ভক্তরা। তাদের একটাই দাবি, দ্রুত এই মামলার সঠিক তদন্ত এবং দোষীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি নিশ্চিত করা।

রহস্যের জট কি এবার খুলবে?

সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় প্রায় তিন দশক ধরে যে রহস্যের ধোঁয়াশা ছিল, আদালতের নতুন নির্দেশনা সেই ধোঁয়াশা ভেদ করে আলো দেখাবে কি না, তা নিয়েই এখন সকলের আগ্রহ। এর আগে ১৯৯৭ সালে একজন আসামি (রিজভি আহমেদ) অন্য এক মামলায় জবানবন্দিতে সালমানকে হত্যা করে আত্মহত্যার নাটক সাজানোর কথা স্বীকার করেছিলেন। সেই জবানবন্দি এবং সালমানের মায়ের 'নারাজি' আবেদনের ভিত্তিতেই এখন হত্যা মামলাটি সামনে এসেছে।

ব্যাঙেরছাতা


বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, এটি একটি জাতীয় আবেগ। বারবার তদন্তের পর যখন 'আত্মহত্যা'র কথাই এসেছে, ঠিক তখনই আদালতের নির্দেশে এটিকে 'হত্যা মামলা' হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়টি প্রমাণ করে যে আইনি প্রক্রিয়ায় এই মামলার যথেষ্ট গুরুত্ব ও ভিত্তি রয়েছে। সালমান শাহর কোটি কোটি ভক্ত, তার পরিবার এবং গোটা দেশের মানুষ এখন নতুন করে তদন্তের দিকে তাকিয়ে— সত্যিই কি এবার ২৯ বছরের রহস্যের জট খুলবে? সময়ই বলে দেবে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে লুকিয়ে থাকা সত্য শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখবে কি না।

মন্তব্যসমূহ