মেট্রোরেল যাত্রীদের জন্য নতুন নিয়ম: স্টেশনে ঢুকে না চড়লেই ১০০ টাকা জরিমানা!



ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে মেট্রোরেল। তবে সম্প্রতি ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) কর্তৃপক্ষ একটি নতুন নিয়ম কার্যকর করেছে, যা সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মেট্রোরেলের কোনো স্টেশনে কার্ড পাঞ্চ করে প্রবেশ করার পর ট্রেনে আরোহণ না করেই যদি কোনো যাত্রী বাইরে বেরিয়ে আসেন, তাহলে তার কার্ড থেকে ১০০ টাকা ভাড়া বা জরিমানা হিসেবে কেটে নেওয়া হবে।

নতুন নিয়ম ও কার্যকর হওয়ার তারিখ

মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জারি করা এক নোটিশের মাধ্যমে জানা গেছে, এই নিয়মটি ২০ অক্টোবর, ২০২৫, সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে। এর আগে এমন একটি নিয়ম ছিল যে, কার্ড স্ক্যান করে স্টেশনে প্রবেশের পাঁচ মিনিটের মধ্যে বেরিয়ে গেলে কোনো ভাড়া কাটা হতো না। কিন্তু নতুন সিদ্ধান্তে সেই সুযোগ সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা হয়েছে।

ডিএমটিসিএল-এর নোটিশে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে:

“সম্মানিত যাত্রী সাধারণের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, বর্তমানে একই স্টেশনে বিনা ভাড়ায় এন্ট্রি-এক্সিট বন্ধ আছে। একই স্টেশনে এন্ট্রি করে এক্সিট করলে ১০০ টাকা ভাড়া কাটা হবে। আদেশক্রমে—ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ।”

কেন এই সিদ্ধান্ত?

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও ডিএমটিসিএল সূত্রের খবর অনুযায়ী, এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রধান কারণ হলো এক শ্রেণির সংঘবদ্ধ চক্রের অপব্যবহার রোধ করা। জানা গেছে, কিছু লোক এমআরটি পাস বা র‍্যাপিড পাস কার্ড ব্যবহার করে একটি কৌশল অবলম্বন করছিল। তারা এমনভাবে কার্ড ব্যবহার করত যাতে সিস্টেমে দেখাত যাত্রী একই স্টেশনে প্রবেশ ও প্রস্থান করেছেন, ফলে কোনো ভাড়া কাটা হতো না। এই চক্রের সদস্যরা দুটি দলে ভাগ হয়ে কাজ করত—এক দল ট্রেনে ওঠার স্টেশনে প্রবেশ করে ভেতরে থাকা সহযোগীকে কার্ড দিয়ে দিত, যিনি কার্ডটি স্ক্যান করে বেরিয়ে যেতেন। এর মাধ্যমে তারা মূলত বিনা ভাড়ায় যাতায়াত করছিল। এই অনিয়ম বন্ধ করতেই কর্তৃপক্ষকে ‘একই স্টেশনে বিনা ভাড়ায় এন্ট্রি-এক্সিট’ সুবিধা বাতিল করতে হয়েছে।

যাত্রী সাধারণের প্রতিক্রিয়া

মেট্রোরেলের এই নতুন নিয়মের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ যাত্রীরা। তাদের মতে, কোনো জরুরি প্রয়োজনে বা ভুল করে স্টেশনের ভেতরে ঢুকে গেলে ১০০ টাকা জরিমানা দেওয়াটা অযৌক্তিক। বিশেষ করে যেসব যাত্রী শুধুমাত্র স্টেশনের ভেতরের সুবিধা (যেমন এস্কেলেটর, লিফট বা অপেক্ষাকৃত ভালো পরিবেশ) ব্যবহার করে দ্রুত বেরিয়ে আসতে চাইতেন, এখন তারা বিপাকে পড়বেন।

যাত্রীসাধারণের যুক্তি হলো:

১. জরুরী পরিস্থিতি: অনেক সময় অসুস্থতা, গুরুত্বপূর্ণ ফোন কল বা অন্য কোনো জরুরি কারণে ভেতরে ঢুকেও ভ্রমণ করা সম্ভব হয় না।

২. ভুলবশত প্রবেশ: তাড়াহুড়ো বা ভুলবশত টিকিট পাঞ্চ করে ভেতরে ঢুকে গেলে আর ফেরত আসার সুযোগ থাকছে না।

৩. অযৌক্তিক জরিমানা: ১০০ টাকা জরিমানা মেট্রোরেলের সর্বনিম্ন ভাড়া (২০ টাকা) বা অধিকাংশ স্বল্প দূরত্বের ভাড়ার তুলনায় অনেক বেশি।

কর্তৃপক্ষকে কী ভাবা উচিত?

যাত্রী ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের প্রধান কাজ। তবে যাত্রীদের বৈধ অসুবিধাও বিবেচনা করা জরুরি। অপব্যবহার রোধ করতে গিয়ে যদি সাধারণ যাত্রীরা ভোগান্তির শিকার হন, তবে তা কাম্য নয়। কর্তৃপক্ষ হয়তো জরিমানা বা ভাড়ার অঙ্ক পুনর্বিবেচনা করতে পারে। অথবা, একটি নির্দিষ্ট, খুব স্বল্প সময়ের (যেমন ১ বা ২ মিনিট) জন্য প্রবেশের পর বিনা ভাড়ায় বের হওয়ার সুবিধা সীমিত আকারে চালু রাখার বিকল্প ভাবতে পারে, যা চক্রের অপব্যবহারকে কঠিন করে তুলবে।

মেট্রোরেল দেশের আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রতীক। এর নিয়ম-কানুন ও ব্যবস্থাপনা যেন একদিকে যেমন কঠোর হয়, তেমনি অন্যদিকে যেন যাত্রী-বান্ধবও হয়, সেই প্রত্যাশাই আমাদের সবার।

মন্তব্যসমূহ