‘মবের শিকার’ পুলিশ: জননিরাপত্তা কি তবে বিপন্ন?
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই এখন গণ-আক্রমণের বা 'মবের শিকার' হচ্ছেন। এটি কেবল পুলিশের মনোবল নয়, রাষ্ট্রের সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থার উপরই প্রশ্ন তুলছে। যে বাহিনী জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তারাই যদি হামলার মুখে পড়ে, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান:
পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি যে কতটা নাজুক, তা স্পষ্ট। গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চলতি বছরের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র ১৪ মাসে পুলিশের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১৯৫টি।
পরিসংখ্যানের ধারাবাহিকতা আরও বেশি ভয়ংকর। চলতি বছরের জানুয়ারিতে যেখানে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ছিল ৩১টি, সেখানে আগস্ট মাসে তা বেড়ে ৫১টিতে দাঁড়িয়েছে—যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি নির্দেশ করে। অভিযান চালাতে গিয়ে উল্টো হামলার শিকার হচ্ছে পুলিশ, মাদক উদ্ধার হোক বা অবৈধ দখল উচ্ছেদ।
কিছু ভয়াবহ চিত্র:
এই হামলাগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এক নতুন প্রবণতার অংশ। কয়েকটি সাম্প্রতিক ঘটনা এর ভয়াবহতা তুলে ধরে:
ওয়াকিটকি ও শটগান ছিনতাই:
ফেনীর সোনাগাজীতে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে ধরতে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা কেবল আক্রান্তই হননি, উল্টো তাদের কাছ থেকে একটি ওয়াকিটকি ও একটি শটগান কেড়ে নিয়ে পালিয়ে গেছে হামলাকারীরা। এই ঘটনায় ছয়জন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করা হয়েছে।
চাঁদাবাজদের ছিনিয়ে নেওয়া:
নরসিংদীতে সড়কে চাঁদা তোলার সময় আটক ব্যক্তিদের ছিনিয়ে নিতে পুলিশের ওপর হামলা হয়, যাতে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আহত হন।
প্রকাশ্যে প্রতিরোধ:
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় অবৈধ অটোরিকশা আটক করতে গেলে ট্রাফিক পুলিশের ওপর ৫০ থেকে ৬০ জন লোক হামলা চালায় এবং আটক অটোরিকশাটি ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মবের ভূমিকা:
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪৪টি হামলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ৩৯ জন আসামিকে ছিনিয়ে নিয়েছে। এছাড়াও, 'তৌহিদি জনতার' ব্যানারে উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিরা বিভিন্ন মাজারে হামলা ঠেকাতে যাওয়া পুলিশের ওপরও আক্রমণ করেছে।
কেন এই পরিস্থিতি? বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে কারণ:
পুলিশের ওপর এই হামলার প্রবণতা বৃদ্ধির পিছনে একাধিক গভীর কারণ রয়েছে বলে অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন:
‘আত্মসমর্পণমূলক’ পুলিশিং: ৫ আগস্টের পর থেকে মাঠ পর্যায়ে পুলিশ তাদের অপারেশনের ধরন পরিবর্তন করেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এখন 'আক্রমণাত্মক' পুলিশিংয়ের পরিবর্তে ‘আত্মসমর্পণমূলক’ পুলিশিং করা হচ্ছে। ফলে অপরাধীরা পুলিশের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে।
সমন্বয়হীনতার অভাব: অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, পুলিশের মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের সঙ্গে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে স্পষ্ট সমন্বয়হীনতা রয়েছে। অপরাধীরা এই সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে, যখন তারা বুঝতে পারে পুলিশের ওপর আক্রমণ করলেও তেমন কোনো পরিণতি হবে না।
রাজনৈতিক মদদ: ৪৪টি ঘটনায় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা আসামি ছিনতাইয়ের অভিযোগ প্রমাণ করে যে হামলার পেছনে এক শ্রেণির রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাও কাজ করছে, যা পুলিশের আইনি কার্যক্রমে সরাসরি বাধা দিচ্ছে।
ভবিষ্যতের উদ্বেগ ও পুলিশের বার্তা:
পুলিশের উপর এমন হামলা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ও শৃঙ্খলার জন্য একটি চরম হুমকি। অপরাধ বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন—পুলিশ যদি নিজেই মবের শিকার হয়, তবে তারা কীভাবে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করবে?
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এবং পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে একটি "কুচক্রী মহল সুপরিকল্পিতভাবে পুলিশের মনোবল দুর্বল করতে" এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। তবে তারা একইসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
পুলিশের মনোবল ও কর্মক্ষমতা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা এবং তাদের বৈধ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। নীতিনির্ধারকদের উচিত দ্রুত অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা দূর করা এবং মব ও বেআইনি হামলার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। অন্যথায়, জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে এবং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলার চেইনটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

মন্তব্যসমূহ