বিনিয়োগের খরা: বেকারত্বের সুনামিতে তলিয়ে যাচ্ছে সমাজ, বাড়ছে নেশা ও নৈরাজ্য



দেশে কি একটি ‘বেকার তৈরির কারখানা’ চলছে? মুখে যতই উন্নয়নের বুলি শোনানো হোক না কেন, চারপাশে চাকরির বাজারে চলছে চরম আকাল। বিনিয়োগের স্থবিরতা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে কোথায় ঠেলে দিচ্ছে, তার একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে আসছে সমাজের নানা স্তরে। চাকরি না পাওয়ার এই গভীর হতাশা এখন শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগে সীমাবদ্ধ নেই, এটি জন্ম দিচ্ছে নতুন এক সামাজিক নৈরাজ্যের।

বিনিয়োগ বন্ধ্যত্ব ও চাকরির চরম দুর্ভিক্ষ

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বিনিয়োগে এক ধরনের স্থবিরতা চলছে। আর বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান অবান্তর। প্রতি বছর ২০ থেকে ২৪ লাখ কর্মক্ষম মানুষ চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন, অথচ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বদলে উল্টোদিকে চাকরি খোয়া যাচ্ছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২৬ লাখ ২০ হাজার, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দেড় লাখ বেশি। কিন্তু যারা সপ্তাহে মাত্র এক ঘণ্টা কাজ করেন বা পরিবারের জন্য হাঁস-মুরগি পালন করেন, তাদেরকে বেকার ধরা হয় না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এই নীতির কারণে বাস্তবে বেকারের সংখ্যাটা যে আরও অনেক বেশি, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকারি-বেসরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে লাখ লাখ প্রার্থীর আবেদনই সেই বাস্তবতার প্রমাণ।

শিক্ষিত বেকারের অভিশাপ: গভীর ক্ষত রাষ্ট্রের জন্য

এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুসারে, মোট বেকারদের মধ্যে প্রায় ১৩.৫ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী এবং ৭.১৩ শতাংশ উচ্চ মাধ্যমিক পাস। অর্থাৎ, প্রতি পাঁচজন বেকারের মধ্যে অন্তত একজন উচ্চশিক্ষিত।

বছরের পর বছর ধরে উচ্চশিক্ষা শেষ করেও কাঙ্ক্ষিত চাকরি না পাওয়ায় তরুণ সমাজ এখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কর্মসংস্থান যে বেসরকারি খাত তৈরি করে, সেই খাতটি বর্তমানে বিনিয়োগের অভাবে ও একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ায় চরম সংকটে রয়েছে। এই শিক্ষিত তরুণ সমাজের হতাশা শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের জন্য নয়, গোটা রাষ্ট্রের জন্য এক গভীর ক্ষত।

সামাজিক নৈরাজ্য ও হতাশার ডালপালা

বেকারত্ব শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এর ফলে সমাজে ভয়াবহ নৈরাজ্য সৃষ্টি হচ্ছে।

১. নেশার রাজ্যে প্রবেশ: কাজ না পেয়ে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির (যা এখনো ৮ শতাংশের ওপরে) চাপে দিশেহারা যুবকরা হতাশা থেকে জড়িয়ে পড়ছে নানা মন্দকাজে, যার মধ্যে অন্যতম হলো মাদকাসক্তি। নেশার টাকার জন্য মা-বাবাসহ স্বজনদের ওপর আক্রমণ করা বা খুন-খারাবির মতো সামাজিক অপরাধও বাড়ছে।

২. ‘মুখঢাকা’ বেকারের দল: কাজ হারিয়ে বা লজ্জা ও হতাশায় অনেক শিক্ষিত মানুষ বাধ্য হচ্ছেন ছদ্মবেশে নিম্নমানের কাজ বেছে নিতে। অনেকেই মাস্কে মুখ ঢেকে ভ্যান বা ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাচ্ছেন, যাতে পরিচিত কেউ তাদের চিনতে না পারে। এর ফলে যেমন নগরে ট্র্যাফিকের নৈরাজ্য বাড়ছে, তেমনি এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বাস্তব হিসাব রাখাও অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

৩. গ্রামের অর্থনীতিতে আঘাত: মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল। সাধারণ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাকিতে কিনে দাম পরিশোধ করতে না পারায় গ্রামের মুদির দোকানগুলো লাটে উঠছে। ওই সব ছোট দোকানদাররাও বেকার দশায় পড়ে নানা আজেবাজে কাজে জড়াচ্ছেন।

বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি এবং বেসরকারি খাতের এই শ্লথগতি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। রাষ্ট্রের এই গভীর ক্ষত সারানো সহজ নয়। এখনই যদি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করে বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করা না যায়, বিশেষ করে শিল্প-কারখানাগুলোর চাকা সচল রাখার ব্যবস্থা না করা হয়, তবে অর্থনৈতিক নৈরাজ্যের পাশাপাশি সামাজিক নৈরাজ্যও ভবিষ্যতে আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে। এই জাতীয় সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ।

মন্তব্যসমূহ