ক্রিকেট বোর্ডে এত 'মধু' কেন? — ভেতরের খেলা, কোটি টাকার রাজস্ব ও প্রভাবের রাজনীতি



বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচন এলেই দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে একই প্রশ্ন উঁকি দেয়: কী এমন অমূল্য 'মধু' আছে এই ক্রিকেট বোর্ডে? পরিচালকের মাত্র ২৫টি চেয়ার, অথচ সেই চেয়ার দখলের লড়াইয়ে যে তীব্রতা, দলাদলি, সমঝোতার নাটক আর মামলা-মোকদ্দমা দেখা যায়, তা দেখে অনেকেই মনে করেন—বিসিবি নির্বাচনও জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়!

এই প্রতিযোগিতা দেখে মনে হতে বাধ্য যে বিসিবির সিন্দুকে নিশ্চিতভাবেই কোনো অমূল্য ধন-রত্ন লুকিয়ে আছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, বিসিবি পরিচালকদের কিন্তু কোনো মাসিক বেতন বা বড় অঙ্কের সম্মানী নেই। কেবল বোর্ড সভা কিংবা বছরে একবারের এজিএমে যোগ দিলে সামান্য কিছু প্রাপ্তি থাকে, যা তাঁদের আর্থিক সঙ্গতির তুলনায় একেবারেই নগণ্য।

তাহলে কিসের আশায় এমন কপাল ঠুকে মরা? কেন ক্রিকেটের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই—এমন লোকগুলোও এই লাইনে ভিড় করছেন? আসলে, লাভটা সরাসরি অর্থে নয়, বরং অন্য জায়গায়। এই লাভ তিনটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর নির্ভরশীল— ব্যবসায়িক প্রভাব, রাজনৈতিক পরিচিতি এবং রাজকীয় জীবনযাপন।

ব্যবসা ও রাজনীতির সিঁড়ি: প্রভাবই আসল 'মধু'

বিসিবি পরিচালকের পদটি কেবল একটি ক্রীড়া সংগঠকের পদ নয়, এটি সামাজিক মর্যাদা ও প্রভাবের এক অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার।

ক. ব্যবসায়িক গ্রহণযোগ্যতা: কোটি টাকার লবিং

বিসিবি পরিচালক হওয়া একজন ব্যবসায়ীর জন্য 'ভিআইপি স্ট্যাটাস' নিশ্চিত করে। এই পদটি তাঁর সামাজিক অবস্থান রাতারাতি পাল্টে দেয়। এর ফলে:

ব্যাংকিং ও লোন সুবিধা: ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে, যা বড় অঙ্কের লোন বা বিনিয়োগ পেতে সহায়ক হয়।

সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক: সরকারের উচ্চ মহলে সহজে প্রবেশাধিকার মেলে, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর ব্যবসাকে সুরক্ষা দেয় বা নতুন সরকারি চুক্তি পেতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, এই পদটি ব্যবসায়িক গ্রহণযোগ্যতা ও সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে।

খ. রাজনৈতিক সুবিধা: জনসম্পৃক্ততা ও ক্ষমতা

রাজনীতিবিদদের জন্য এটি নিজেকে জনসম্মুখে তুলে ধরার বিরাট এক সুযোগ। নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে 'ক্রিকেট সংগঠক'-এর পরিচিতি যোগ হলে তাঁর প্রোফাইল শক্তিশালী হয়। এলাকার মানুষ ভাবে—'আরে, আমাদের নেতা তো ক্রিকেট বোর্ডেও আছেন!' এই প্রভাব সরাসরি ব্যালট বাক্সেও সুফল দেয়। ক্রীড়াঙ্গনের জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে নেতা হিসেবে নিজেকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়াই মূল লক্ষ্য।

বিসিবির আর্থিক ক্ষমতা: শত কোটি টাকার উৎস

পরিচালকদের বেতন না থাকলেও বোর্ড কিন্তু বিপুল অর্থের নিয়ন্ত্রক। বিসিবির আয়ের মূল উৎস দুটি:

আইসিসি থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব (ICC Revenue): প্রতি চার বছর অন্তর আইসিসি থেকে একটি বড় অঙ্কের টাকা আসে। এই অর্থ বোর্ডের অবকাঠামো উন্নয়ন, টুর্নামেন্ট আয়োজন ও খেলোয়াড়দের বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়।

সম্প্রচার স্বত্ব ও স্পন্সরশিপ (Broadcast & Sponsorship): বাংলাদেশ দলের খেলার সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করে বিসিবি শত শত কোটি টাকা আয় করে। এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে বড় অঙ্কের স্পন্সরশিপ পাওয়া যায়।

পরিচালকরা সরাসরি বেতন না নিলেও, বোর্ডের এই বিশাল অর্থ খরচের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তাঁদের হাতেই থাকে। এই সিদ্ধান্তগুলো টেন্ডার, সরবরাহকারী নির্বাচন বা অবকাঠামো নির্মাণ— ইত্যাদি ক্ষেত্রে পরিচালকদের পরোক্ষভাবে সুবিধা দিতে পারে।

রাজকীয় জীবনযাপন ও বিলাসবহুল বিদেশ ভ্রমণ

বিসিবির পরিচালকদের আরেকটি বড় প্রাপ্তি হলো জাতীয় দলের সঙ্গে নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ। দলের সঙ্গে এক-দুজন থাকা প্রয়োজন হলেও দেখা যায়, পরিচালকদের বহর ক্রমেই লম্বা হতে থাকে।

বিলাসবহুল ট্যুর: বিজনেস ক্লাস টিকিট, পাঁচতারা হোটেলে থাকা, এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভিআইপি গ্যালারিতে বসে খেলা দেখা— অর্থাৎ, খেলার আবহে রাজকীয় স্টাইলে জীবনযাপন করার সুযোগ সৃষ্টি হয় এই পদ থেকে। অনেক সময় একই সিরিজ দেখতে দেশ থেকে একাধিকবার বিদেশ আসা-যাওয়ার নজিরও দেখা যায়।

কূটনৈতিক সুবিধা: আইসিসি (ICC), এসিসি (ACC) বা অন্যান্য ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের বোর্ডের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার নামে এই বিদেশ ভ্রমণ কেবল পদমর্যাদা বাড়ায় না, আন্তর্জাতিক মহলে ব্যক্তিগত লবিংয়ের সুযোগও তৈরি করে দেয়।

ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচনের কাঠামোগত দুর্বলতা

নির্বাচনে এই তীব্র প্রতিযোগিতার আরেকটি প্রধান কারণ হলো ভোটিং পদ্ধতির দুর্বলতা ও অগণতান্ত্রিক প্রকৃতি।

ক্লাবভিত্তিক ভোটিং: বিসিবি নির্বাচনে ভোট দেন মূলত ক্লাব ও জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা। এই ক্লাবগুলোর অধিকাংশই ক্ষমতাসীন পরিচালকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। হাতে গোনা কয়েকটি ক্লাব বা প্রতিষ্ঠানের হাতে বোর্ডের ভাগ্য থাকায়, অর্থের বিনিময়ে বা প্রভাব খাটিয়ে সহজেই ভোট সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।

অ-ক্রিকেটীয় ভোটার: অনেক জেলা ক্রীড়া সংস্থার ভোটার এমন ব্যক্তিরা, যাদের ক্রিকেটের সঙ্গে সামান্যই সম্পর্ক আছে। তারা সরাসরি ক্রিকেট বা খেলোয়াড়দের উন্নয়নের চেয়ে ব্যক্তিগত বা দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে আগ্রহী হন।

এই কাঠামোই নিশ্চিত করে যে, ক্রিকেটকে ভালোবাসার চেয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র হবে।

‘ক্রিকেট বাঁচাও’ স্লোগানের আড়ালের সংঘাত

নির্বাচনে আসা প্রায় সব প্রার্থীই নিজেদের নির্লোভ প্রমাণ করতে চান এবং 'ক্রিকেট বাঁচাও' স্লোগান দেন। অথচ ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচনের চিত্রটি ঠিক তার উল্টো। এখানে যারা ক্রিকেটের মঙ্গল চান বলে দাবি করেন, তাঁদের মধ্যেই কোনো মিলমিশ নেই। শুধু সংঘাত আর দলাদলি। একে অন্যকে বিব্রত আর বিপদে ফেলার ছক কষতে ব্যস্ত থাকেন। এই স্ব-বিরোধিতা দেখে মনে হতে বাধ্য—ক্রিকেটের সেবা করার চেয়ে পদটি দখল করাই যেন এখানে আসল উদ্দেশ্য।

দুর্নীতির অভিযোগ এবং সেই অভিযোগগুলোর কখনোই জনসমক্ষে না আসা এই খেলাকে আরও ঘোলাটে করে। যখন এক পক্ষ দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ক্ষমতায় আসে, তখন তারা এ বিষয়ে চুপ হয়ে যায়। আর বাইরে থাকা পক্ষ তখন আবার অভিযোগ তুলতে থাকে। দুর্নীতির তথ্যপ্রমাণ যেন দরকারের সময় ভয় দেখানোর 'গোপন অস্ত্র' হয়ে পকেটে থেকে যায়, কিন্তু তা কখনও প্রকাশ্যে আসে না।

আসলে, দেশের ক্রিকেটের উন্নতির জন্য নয়, বরং এই পদের মাধ্যমে নিজেদের সামাজিক, ব্যবসায়িক এবং রাজনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্যই এই তীব্র লড়াই। ক্রিকেট বোর্ড যেন এক মৌচাক, যেখানে সবাই নিজের মতো করে সময় ও সুযোগ বুঝে মধু খেয়ে নিতে চান। একজন সাধারণ ক্রিকেট ভক্ত হিসেবে এই দৃশ্য দেখতে কষ্ট হয়। সত্যিকারের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য দরকার এমন একটি বোর্ড যা সুবিধাভোগী রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত।

মন্তব্যসমূহ