ক্ষোভ না ক্ষমতার দম্ভ? রাজনৈতিক মঞ্চে 'কলিজা ছিঁড়ে ফেলার' হুমকি এবং এর তাৎপর্য



পঞ্চগড়ে পথসভায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট: এনসিপি নেতা সারজিস আলমের ‘কলিজা ছিঁড়ে ফেলার’ হুমকির রাজনীতি

“এই পঞ্চগড়ে যদি কোনো প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক আচরণ করে, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান এখানে থাকবে না”—এই চরম হুঁশিয়ারির আড়ালে কী বার্তা দিতে চাইলেন কিংস পার্টির এই “নেতা”?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে “ব্যাঙেরছাতা”র মতো সদ্য গজে উঠা “কিংস পার্টি” ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি বা এনসিপি। এই কিংস পার্টির উত্তর অঞ্চলের প্রধান সমন্বয়ক সারজিস আলমের একটি মন্তব্যের জেরে বর্তমানে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে দলটি। গত রাতে পঞ্চগড়ে আয়োজিত এক পথসভায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নেসকো (NESCO)-এর কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে যে চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, আইনের শাসন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

ঘটনা: বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং চরম হুঁশিয়ারি

শনিবার রাতে পঞ্চগড় থেকে বাংলাবান্ধা পর্যন্ত এক লং-মার্চের সমাপ্তি শেষে শের-এ-বাংলা পার্ক সংলগ্ন জুলি মেমোরিয়ালের কাছে পথসভা করছিলেন সারজিস আলম। সভা চলাকালীন সময়েই হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এই “নেতা”। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন, এর আগেও তাদের অনুষ্ঠানে ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

ক্ষোভের বশেই তিনি নেসকো কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন: “এই পঞ্চগড়ে যদি কোনো প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক আচরণ করে, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান এখানে থাকবে না। এটা আমার ব্যক্তিগত কমিটমেন্ট... এনইএসকো-র (NESCO) মালিককে এর উত্তর দিতে হবে। তাদের কলিজা কত বড়, সেটা আমরা দেখব। তাদের কলিজা আমরা ছিঁড়ে রাস্তার মধ্যে ফেলে যাব।”

তিনি আরও কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের নেসকো কর্মকর্তাদের নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই, কারণ তিনি নাকি “খুনি হাসিনাকে” নিয়েও ভাবেননি।

ক্ষোভের আড়ালে ক্ষমতার দম্ভ

“নেতা”র জনসভায় বিদ্যুৎ চলে গেলে ক্ষুব্ধ হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়, বিশেষত যদি তিনি মনে করেন এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তবে সেই ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা যখন ‘কলিজা ছিঁড়ে ফেলার’ মতো হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা কেবল এক ব্যক্তিগত ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ থাকে না—তা হয়ে ওঠে ক্ষমতা এবং দম্ভের ভয়ংকর মিশ্রণ।

রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা: বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে তিনি সরাসরি রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক আচরণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, যা প্রমাণ করে যেকোনো বাধা বা ত্রুটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখার প্রবণতা তার মধ্যে প্রবল। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এমন চরম অসহিষ্ণুতা সুস্থতার লক্ষণ নয়।

আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা: একটি রাষ্ট্রায়ত্ত বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো ত্রুটির জন্য তার কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য জনসভায় এমন হুমকি দেওয়া স্পষ্টতই আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন। এর মাধ্যমে তিনি যেন বিচারবহির্ভূত শাস্তির হুমকি দিয়েছেন। একজন রাজনীতিবিদ যখন প্রতিষ্ঠানকে ‘এখানে থাকতে দেব না’ বলে হুমকি দেন, তখন তা রাষ্ট্রের কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

নতুন রাজনীতির অঙ্গীকার বনাম পুরোনো সংস্কৃতি: এনসিপি বা কিংস পার্টির আবির্ভাব নতুন রাজনীতির বার্তা নিয়ে হলেও, এই নেতার ভাষা পুরোনো, ক্ষমতাধর রাজনীতির ‘দাপট’ আর ‘অহমিকা’কেই তুলে ধরে। এতে স্পষ্ট হয়, দলের মূলনীতি যতই জনকল্যাণমুখী হোক না কেন, নেতার ব্যক্তিগত আচরণে ‘পুরাতন রীতির’ পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

রাজনৈতিক বার্তা: এই হুমকির মাধ্যমে তিনি একদিকে তার অনুসারীদের কাছে তার ‘শক্তিশালী’ ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন, অন্যদিকে বিরোধীদের কাছে এই বার্তা দিয়েছেন যে, তার কোনো কাজ বা জনসভায় বিঘ্ন ঘটানো হলে তার পরিণাম হবে ভয়ঙ্কর।

সারজিস আলমের এই চরম মন্তব্য ক্ষণিকের উত্তেজনার ফল হোক বা সুচিন্তিত রাজনৈতিক কৌশল, এর ফলাফল সুদূরপ্রসারী হতে পারে। রাজনৈতিক মঞ্চে এমন হিংস্র ও আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানো ভাষা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। একজন নেতার কাজ হবে সমস্যা সমাধানে গঠনমূলক পথে হাঁটা এবং জনতাকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে উৎসাহিত করা। তার এই মন্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও একবার এই কঠিন প্রশ্নটি সামনে এনেছে—জনগণ কি কেবল এক ক্ষমতালোভী চক্রের হাতের পুতুল হয়ে থাকবে, নাকি নতুন নেতৃত্ব নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দেবে? এই চরম ভাষা কিংস পার্টির ভাবমূর্তি এবং দেশের গণতান্ত্রিক রীতিনীতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি কালো দাগ।

মন্তব্যসমূহ