জুলাই সনদ ও গণভোটের আইনি গোলকধাঁধা: পঞ্চদশ সংশোধনী, হাইকোর্টের রায় ও সাংবিধানিক শূন্যতা




সম্প্রতি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐক্যমত হয়েছে—তা হলো একটি রাজনৈতিক ঐকমত্যের দলিল ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে গণভোটের আয়োজন। সংবাদ মাধ্যম অনুযায়ী, এই সনদের আইনি ভিত্তি দিতে গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বিএনপি, এনসিপি এবং জামায়াত ইসলামীসহ অন্যান্য বিরোধী দল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনি কাঠামোর মধ্যে এমন একটি গণভোট আয়োজন করা কি আদৌ সম্ভব?

এই লেখায় আমরা দেখব, রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকা সত্ত্বেও এই গণভোট আয়োজনের পথে কী কী সাংবিধানিক, আইনি এবং প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে এবং কেন এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি জটিল আইনি গোলকধাঁধার সৃষ্টি করেছে।

গণভোটের ইতিহাস ও বর্তমান সাংবিধানিক শূন্যতা

গণভোট বা রেফারেন্ডাম একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণ সরাসরি মতামত দেওয়ার সুযোগ পায়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এ পর্যন্ত তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে:

১৯৭৭: রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নীতির প্রতি জনগণের আস্থা প্রদর্শনের জন্য।

১৯৮৫: সামরিক শাসক এরশাদের প্রতি আস্থা প্রদর্শনের জন্য।

১৯৯১: সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের জন্য (এটিই একমাত্র 'সাংবিধানিক' গণভোট, যা জনগণের ভোটের মাধ্যমে সরকার পদ্ধতির পরিবর্তন নিশ্চিত করেছিল)।

এই তিনটি গণভোটই অনুষ্ঠিত হয়েছিল যখন প্রক্রিয়াটি আইনিভাবে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং এখানেই মূল সমস্যাটি নিহিত।

মূল বাধা: পঞ্চদশ সংশোধনী ও গণভোটের বিধান বাতিল

২০০৯-২০২৪ মেয়াদে শেখ হাসিনার শাসনামলে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর (২০১১ সালে গৃহীত) মাধ্যমে সংবিধানে বড় পরিবর্তন আনা হয়। এই সংশোধনীতেই সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে গণভোটের বিধান সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়

অর্থাৎ, বর্তমানে আমাদের সংবিধানে জাতীয় কোনো ইস্যুতে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার জন্য গণভোট আয়োজনের কোনো আইনি বিধান নেই। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, যে বিধান সংবিধানে নেই, কোন আইনি কর্তৃত্ববলে সেই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে? সংবিধান যেহেতু দেশের সর্বোচ্চ আইন, তাই সাংবিধানিক ভিত্তি ছাড়া যেকোনো গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায়: আশার আলো নাকি নতুন জটিলতা?

এই আইনি শূন্যতার মধ্যে একটি 'আশার আলো' সৃষ্টি করেছে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি সাম্প্রতিক রায় (২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর)

ঐ রায়ে হাইকোর্ট অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদটি (যা দ্বাদশ সংশোধনীতে বাদ দেওয়া হয়েছিল এবং পঞ্চদশ সংশোধনীতে যার মাধ্যমে গণভোটের বিধান বাতিল করা হয়েছিল) পুনরায় বহাল করার কথা বলেন। এর মানে, আদালত এক অর্থে গণভোটের বিধান পুনর্বহালের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

হাইকোর্টের রায়ের জট ও অনিশ্চয়তা

যদি ধরে নেওয়া হয় যে হাইকোর্টের এই রায়টি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে, তবে ১৪২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত পরিস্থিতিতে গণভোট অনুষ্ঠানের বিষয়টি আইনসিদ্ধ হতে পারে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন জটিল:

সাংবিধানিক কার্যকারিতা: আদালতের রায়ের পর ১৪২ অনুচ্ছেদ কি সরাসরি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে, নাকি আদালতের রায়ের আলোকে সংসদ কর্তৃক সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন পড়বে?

সংসদের অনুপস্থিতি: বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে আদালতের রায়ের পর সংসদ কর্তৃক প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার নজির থাকলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেহেতু সংসদ বহাল নেই, তাই সংবিধান সংশোধনের কাজটি করা সম্ভব নয়। সংবিধান সংশোধন করতে হলে পরবর্তী নির্বাচিত সংসদকেই এই দায়িত্ব নিতে হবে।

রায়ের চূড়ান্ততা: এছাড়াও, হাইকোর্টের এই রায় এখনো চূড়ান্ত নয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল এবং রিভিউ পিটিশনের আইনসিদ্ধ সুযোগ রয়েছে। আপিল বিভাগ যদি হাইকোর্টের রায় বাতিল করে দেন, তাহলে গণভোটের সমস্ত আইনি ভিত্তি আবার শূন্য হয়ে যাবে।

জুলাই সনদ গণভোটের জন্য কেন অধ্যাদেশের প্রয়োজন?

জুলাই সনদ একটি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেকার ঐকমত্যের দলিল, এটি কোনো আইনি বিল নয়। ফলে সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ কোনোভাবে মোকাবিলা করা গেলেও, গণভোট আয়োজনের জন্য বিদ্যমান আইনি কাঠামো যথেষ্ট নয়।

গণভোট আইন, ১৯৯১-এর সীমাবদ্ধতা

বর্তমানে কার্যকর থাকা 'গণভোট আইন, ১৯৯১'-এর মাধ্যমে জুলাই সনদ সংক্রান্ত গণভোট আয়োজন করা সম্ভব নয়। কারণ, এই আইন অনুযায়ী কেবল সংসদে পাস হওয়া কোনো বিল নিয়েই গণভোট করার কথা বলা হয়েছে। জুলাই সনদ যেহেতু কোনো বিল নয়, তাই এই আইনে গণভোট আয়োজন করা যাবে না।

আইনি সংশোধন অপরিহার্য

এমতাবস্থায়, গণভোটের সিদ্ধান্ত যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে সরকার নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিতে পারে, যার জন্য প্রয়োজন হবে অস্থায়ী অধ্যাদেশ:

সংবিধানের কার্যকারিতা ধরে নেওয়া: হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের আলোকে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীকে সাংবিধানিক ভিত্তি ধরে নেওয়া।

গণভোট আইনের সংশোধন: একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৯৯১ সালের গণভোট আইনটি প্রয়োজনীয় সংশোধন করে নিতে হবে, যাতে 'রাজনৈতিক ঐকমত্যের দলিল' নিয়েও গণভোট আয়োজন করা যায়।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO) সংশোধন: গণভোট আয়োজনের প্রশাসনিক কাঠামো ও প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (RPO)-এরও সংশোধন প্রয়োজন হবে।

বিদ্যমান আইনের এসব সংশোধন ছাড়া জুলাই সনদ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠান আইনসংগত হবে না।

প্রশাসনিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ

আইনি জট ছাড়াও গণভোট আয়োজনে বড় ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে:

নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা: নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাজ হলো নির্বাচন আয়োজন করা। সংবিধানে গণভোটের বিধান না থাকলে, ইসি কীভাবে গণভোট আয়োজনের আইনি কর্তৃত্ব প্রয়োগ করবে? ইসিকে সম্পূর্ণ নতুন প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা (জাতীয় নির্বাচনের মতোই প্রায় ১০ লক্ষাধিক) এবং ভোট কেন্দ্র প্রস্তুত করতে হবে।

ব্যয় ও সময়: একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় নির্বাচনের মতোই গণভোট আয়োজনে বিপুল পরিমাণ অর্থের (কয়েকশো কোটি টাকা) প্রয়োজন হবে। সেই সঙ্গে নির্বাচনের প্রস্তুতি ও প্রচারণার জন্য যথেষ্ট সময়েরও প্রয়োজন, যা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সময় নিয়ে নতুন করে মতভেদ তৈরি করতে পারে।

ফলাফলের বাধ্যতামূলকতা: রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে এলেও, গণভোটের ফলাফল যদি জুলাই সনদের বিপক্ষে যায়, তখন সেই ফলাফল আইনত মানতে সরকার বাধ্য হবে কিনা, সেই বিধানও সংশোধিত আইনে স্পষ্ট করতে হবে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দলগুলোর মধ্যে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে, বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক ও আইনি প্রেক্ষাপটে এই গণভোট আয়োজন করা একটি সরল প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি বহুস্তরীয় আইনি ও সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।

এই গণভোট কেবল তখনই আইনগত ভিত্তি পেতে পারে যখন সরকার একটি অস্থায়ী অধ্যাদেশ জারি করে বিদ্যমান গণভোট আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনবে এবং হাইকোর্টের রায় চূড়ান্তভাবে সুপ্রিম কোর্টে বহাল থাকবে। অন্যথায়, এটি আইনি বাধ‍্যবাধকতা তৈরি না করে শুধুই একটি রাজনৈতিক ঐকমত্যের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে থেকে যাবে, যার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ সংসদের আইন প্রণয়ন ক্ষমতার ওপর। দেশের আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণের পথটি বেশ দুর্গম।

মন্তব্যসমূহ