স্বপ্নভঙ্গ ও অনিশ্চিত পথে বাংলাদেশ: বহুমুখী সংকট

ব্যাঙেরছাতা


২০২৪ সালের “ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান(!)” এর পর বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ এক সোনালী ভোরের প্রত্যাশা করেছিল। স্বপ্ন ছিল—দেশে পূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে, আইনের শাসন ফিরবে এবং মানুষ তার ভোটাধিকার ফিরে পাবে। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও সেই উচ্চাশা আজ প্রায় ভঙ্গুর। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রমে প্রত্যাশিত সাফল্য না আসায় দেশ আজ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই বহুমুখী চ্যালেঞ্জের জালে আবদ্ধ।

অর্থনৈতিক অস্থিরতা: মূল্যস্ফীতির চাপ ও কর্মসংস্থান সংকট

সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংকিং ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে কিছুটা অগ্রগতির আভাস দেখা গেলেও, সেই গতি এখন মন্থর। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, যা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এর পাশাপাশি, দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আশানুরূপভাবে না আসায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না।

বরং, চলমান অর্থনৈতিক চাপের মুখে অনেক কলকারখানা তাদের উৎপাদন ক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না, ফলস্বরূপ শ্রমিক ছাঁটাই এবং কারখানা বন্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটছে। এর ফলে বেকারত্বের সমস্যা ক্রমশ জটিল আকার ধারণ করছে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতার বহুকেন্দ্রিকতা

একটি স্থিতিশীল ও উন্নত সমাজের জন্য আইনের শাসন অপরিহার্য। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশে ‘মব সন্ত্রাস’ বা গোষ্ঠীতন্ত্রকে নিরঙ্কুশভাবে চলতে দিয়েছে এবং অনেকক্ষেত্রে তাদের 'চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী' হিসেবে ব্যবহার করছে বলে জনমনে ধারণা তৈরি হয়েছে। এর ফলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, বরং একধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

আরও জটিলতা সৃষ্টি করেছে ‘বহু পাওয়ার সেন্টার’ বা ক্ষমতার বহুকেন্দ্রিকতা। দেশে আজ প্রকৃত ক্ষমতা কার হাতে, তা সাধারণ মানুষ খুঁজে পাচ্ছে না। শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এই বহুকেন্দ্রিকতা স্বাভাবিকভাবেই দুরূহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।

ভূ-রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। জনগণের মনে এই সন্দেহ দানা বেঁধেছে যে, সরকার দেশীয় স্বার্থ রক্ষার চেয়ে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে বেশি আগ্রহী। স্বাধীনতার পর আন্দোলনের মাধ্যমে যত সরকার ক্ষমতায় এসেছে, কোনোটিই গণ-আকাঙ্ক্ষা পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি, এবং বর্তমান সরকারও একই পথে হাঁটছে।

অন্যদিকে, বিগত স্বৈরাচারী শাসনের ফলে সৃষ্ট জনবিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি রাজনৈতিক অঙ্গনে সুকৌশলে প্রবেশ করেছে এবং তাদের অবস্থানকে মজবুত করছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও তাদের উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা জাতির ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মধ্যকার ‘পাওয়ার গেম’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

নির্বাচন দীর্ঘসূত্রিতা ও জুলাই সনদের বিতর্ক

দ্রুত প্রাথমিক সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না, এই দীর্ঘসূত্রিতাই ক্ষমতার বহুকেন্দ্রিকতা সৃষ্টি করেছে।

নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার কারণে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার প্রশ্ন যেমন উঠেছে, তেমনি ‘জুলাই সনদ’ নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। ‘৭২-এর সংবিধানকে বাতিল করার লক্ষ্য নিয়ে প্রণীত এই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েও মতভেদ দেখা দিয়েছে। এর পাশাপাশি, সনদ সংশ্লিষ্টদের জন্য 'দায়মুক্তি' বা 'নিরাপদ প্রস্থান' চাওয়ার বিষয়টিও জনমনে সন্দেহ তৈরি করেছে। সরকার যদি সৎ উদ্দেশ্যেই কাজ করে থাকে, তাহলে কেন এই দায়মুক্তির প্রয়োজন হবে—এই প্রশ্ন জনগণের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।

স্থিতিশীলতার জন্য সেনাবাহিনীর ভূমিকা

বাংলাদেশে বর্তমানে এক অগ্নিগর্ভ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সেনাবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। মব সন্ত্রাস দমন এবং সরকারের তৈরি প্রেশার গ্রুপগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনীকে আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন। পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে আসতে আরও সময় লাগবে, তাই একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনার মূল দায়িত্ব সেনাবাহিনীকেই গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশ আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, অন্যদিকে আইনের শাসনের দুর্বলতা এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব। এই সমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য দ্রুততম সময়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অপরিহার্য। নীতিনির্ধারকদের উচিত, সংকীর্ণ দলীয় বা বিদেশি এজেন্ডার ঊর্ধ্বে উঠে কেবল জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দেশকে একটি একক ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা, যাতে জনগণের স্বপ্নভঙ্গ না হয়ে নতুন এক স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ার পথে এগিয়ে যাওয়া যায়।

মন্তব্যসমূহ