ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির দাবিতে উত্তাল ইসরায়েলি পার্লামেন্ট: ট্রাম্পের ভাষণে বাধা
গতকাল আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত- “ইসরায়েলি পার্লামেন্টে ট্রাম্পের ভাষণে বাধা, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির দাবি”- শিরোনামের একটি সংবাদ বেশ নজর কেড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইসরায়েলের পার্লামেন্ট বা নেসেট-এ (Knesset) ভাষণ দেওয়ার সময় এমন একটি ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের দাবিকে আরও একবার সামনে এনেছে।
সংবাদের সারমর্ম: এক ঝলকে যা ঘটেছে
সম্প্রতি (অক্টোবর ২০২৫) ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেট-এ ভাষণ দেন। ট্রাম্পকে সেখানে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয় এবং প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাকে ইসরায়েলের “সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু” হিসেবে অভিহিত করেন। ট্রাম্পও তার ভাষণে মধ্যপ্রাচ্যে “শান্তি ও নতুন যুগের ঐতিহাসিক সূচনা”-র কথা বলেন এবং ইসরায়েলের প্রতি তার পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
তবে, তাঁর ভাষণ চলাকালীনই নেসেট-এর দুই বামপন্থী সদস্য, আইমেন ওদেহ (Ayman Odeh) এবং ওফের কাসিফ (Ofer Cassif), “ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দাও” লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ শুরু করেন। এই বিক্ষোভে ট্রাম্পের ভাষণ সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হয়। নিরাপত্তারক্ষীরা দ্রুত ওই দুই সদস্যকে পার্লামেন্ট কক্ষ থেকে জোর করে বের করে দেন।
বের করে দেওয়ার পর বিক্ষোভকারী সদস্যরা জোর দিয়ে বলেন যে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার এই দাবি সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক সমাজের মতামতের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং এর মাধ্যমেই কেবল ন্যায়, শান্তি ও নিরাপত্তা আসতে পারে।
ঘটনার তাৎপর্য ও বিশ্লেষণ
নেসেট-এর অভ্যন্তরে এমন প্রতিবাদ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি ইসরায়েলি সমাজের ভেতরের গভীর বিভাজন এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ফিলিস্তিন ইস্যুর অমোঘ গুরুত্বকে ফুটিয়ে তোলে।
দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের দাবি পুনরুত্থান
এই বিক্ষোভের মূল বার্তা ছিল—ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। ইসরায়েলের অভ্যন্তরের আইনপ্রণেতাদের দ্বারা এমন দাবি উত্থাপন প্রমাণ করে যে, যুদ্ধ ও সংঘাতের পরও দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের ধারণাটি সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয়ে যায়নি। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান চাপের প্রতিফলন, যেখানে কানাডা, ব্রিটেন এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
ট্রাম্পের নীতির প্রতি চ্যালেঞ্জ
ডোনাল্ড ট্রাম্প ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত। তার পূর্ববর্তী প্রশাসন জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং বিতর্কিত “শতাব্দীর সেরা চুক্তি”-র প্রস্তাব করার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের স্বার্থকে অগ্রাহ্য করেছিল বলে মনে করা হয়। নেসেট-এ ট্রাম্পের ভাষণে সরাসরি প্রতিবাদ জানানোর মাধ্যমে বিক্ষোভকারীরা প্রকারান্তরে তার মধ্যপ্রাচ্য নীতির প্রতিই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। তারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, শুধুমাত্র ইসরায়েলের স্বার্থ বিবেচনা করে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
ইসরায়েলের ভেতরের রাজনৈতিক বিভাজন
ইসরায়েলি পার্লামেন্টে যে দুই আইনপ্রণেতা প্রতিবাদ করেছেন, তারা ইসরায়েলি বামপন্থী এবং আরব সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেন। এই প্রতিবাদ নেসেট-এর ভেতরের আরব-ইহুদি বিভাজনকে তুলে ধরে। ইসরায়েলের নীতি নির্ধারণী মহলের একটি অংশ, বিশেষত বামপন্থীরা মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও মর্যাদা ছাড়া ইসরায়েলেরও দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নিশ্চিত হতে পারে না। তাদের এই পদক্ষেপ অভ্যন্তরীণভাবে ক্ষমতাসীন দলের কট্টর নীতির সমালোচনা।
সময়ের গুরুত্ব
এই প্রতিবাদ এমন এক সময় ঘটল যখন গাজা সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। জিম্মি মুক্তি ও যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ফিলিস্তিন সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিক্ষোভকারীরা এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির বিষয়টি সামনে এনে বিশ্বকে মনে করিয়ে দিলেন যে, সংঘাতের মূল কারণকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যাবে না।
ইসরায়েলি পার্লামেন্টে ট্রাম্পের ভাষণে বাধা দেওয়ার ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি সংবাদ নয়, এটি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের জটিল পরিস্থিতিতে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা। এটি প্রমাণ করে যে, চরমপন্থার উত্থান বা যুদ্ধ থামার পরও ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি একটি বৈধ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিষয়। স্থায়ী শান্তি কেবল তখনই সম্ভব যখন সব পক্ষ, এমনকি ইসরায়েলের ভেতরেও, ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকারকে স্বীকার করে নেওয়া হবে। এই প্রতিবাদ দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানকে আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে আরও গুরুত্বের সঙ্গে ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

মন্তব্যসমূহ