ডুরান্ড লাইনের বারুদ: আফগান-পাক সীমান্তে কেন এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত?
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলা: ভূ-রাজনীতির এক বিপজ্জনক মোড়
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্ত পরিস্থিতি সাম্প্রতিক সময়ে এক গুরুতর আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশের প্রায় সব দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবেশী এই দুই মুসলিম দেশের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে, যা এ অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলেছে। সংঘাতের মূল কারণ, ঘটনাপ্রবাহ এবং এর সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে একটি বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।
সংঘাতের সূত্রপাত ও ঘটনাপ্রবাহ
সংবাদ অনুযায়ী, গত কয়েক দিন ধরে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সীমান্তে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ মাত্রার উত্তেজনা।
পাকিস্তানের বিমান হামলা:
এই সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে যখন আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল এবং সীমান্তবর্তী পাকতিকা প্রদেশে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে। তালেবান সরকার সরাসরি এই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে। যদিও ইসলামাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটিই করেনি, তবে রয়টার্সসহ কিছু সংবাদ সংস্থার সূত্র অনুযায়ী, এই হামলার লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর প্রধান নূর ওয়ালি মেহসুদকে লক্ষ্য করে।
তালেবানের পাল্টা হামলা:
বৃহস্পতিবারের (৯ অক্টোবর, ২০২৫) হামলার ‘প্রতিশোধ’ নিতেই আফগান তালেবান বাহিনী শনিবার (১১ অক্টোবর, ২০২৫) রাতে পাকিস্তানের সীমান্ত চৌকিগুলোতে ব্যাপক গোলাবর্ষণ ও সামরিক অভিযান শুরু করে। তালেবানের দাবি, এটি ছিল পাকিস্তানের 'জাতীয় সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন'-এর জবাব।
পাল্টা-পাল্টি দাবি:
উভয় পক্ষই ক্ষয়ক্ষতির পরস্পর-বিরোধী ও অত্যধিক দাবি করেছে।
পাকিস্তানের দাবি: পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১৯টি আফগান ঘাঁটি দখল এবং ২০০-এর বেশি তালেবান যোদ্ধা ও সহযোগী সন্ত্রাসীকে হত্যা করার দাবি করেছে। তাদের দাবি, আফগান বাহিনীর হামলায় ২৩ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত ও ২৯ জন আহত হয়েছেন।
আফগানিস্তানের দাবি: তালেবান মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেছেন, তাদের হামলায় ৫৮ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে এবং তারা ২০টি পাকিস্তানি সামরিক পোস্ট দখল করেছে। তবে এতে তাদের ৯ জন সদস্য নিহত হয়েছেন।
সীমান্ত বন্ধ:
তুমুল সংঘর্ষের জেরে পাকিস্তান তোরখাম ও চমন-সহ দুই দেশের মধ্যে থাকা প্রায় ২৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের প্রধান ক্রসিংগুলো বন্ধ করে দিয়েছে।
সংঘাতের মূল কারণ: ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা
এই সীমান্ত উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে প্রধানত তিনটি জটিল বিষয়:
টিটিপি-কে আশ্রয় দেওয়া (পাকিস্তানের অভিযোগ): পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, আফগানিস্তানের তালেবান প্রশাসন তাদের ভূখণ্ডকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো টিটিপি-কে নিরাপদ আশ্রয় ও কার্যক্রমের সুযোগ দিচ্ছে। ইসলামাবাদ বারবার এ বিষয়ে কাবুলকে পদক্ষেপ নিতে বললেও তালেবান এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
ডুরান্ড লাইন (সীমান্ত রেখা) নিয়ে বিরোধ: আফগানিস্তান ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে আঁকা প্রায় ২৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই 'ডুরান্ড লাইন'-কে আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে কখনওই পুরোপুরি স্বীকৃতি দেয়নি। এই ঐতিহাসিক বিরোধ সীমান্তের ছোটখাটো ঘটনাকেও বড় সংঘাতে রূপ দিতে সাহায্য করে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনৈতিক চাপ: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তানে টিটিপি-র ক্রমবর্ধমান হামলার ফলে ইসলামাবাদ সরকারের উপর চাপ বাড়ছে। এই হামলা পাল্টা হামলার মাধ্যমে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী একদিকে তাদের শক্তি প্রদর্শন করছে, অন্যদিকে আফগান ভূখণ্ডে সন্ত্রাসীদের উপস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাইছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
* সৌদি আরব, ইরান ও কাতার-সহ একাধিক দেশ এই সংঘর্ষে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শন ও আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা নিরসনের আহ্বান জানিয়েছে।
* তালেবানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী আমির খান মুতাক্কি এই সংঘাত চলাকালীন ভারত সফরে ছিলেন, যেখানে তিনি পাকিস্তানকে তার অভ্যন্তরীণ সমস্যার জন্য আফগানিস্তানকে দায়ী না করার আহ্বান জানান। এটিকে ইসলামাবাদ ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে না।
* প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই ধরনের হামলা-পাল্টা হামলা যদি চলতে থাকে, তবে পরিস্থিতি দ্রুতই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পুরোদস্তুর যুদ্ধে পরিণত হতে পারে, যা গোটা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করবে। এই সুযোগে পরাশক্তি দেশগুলোও পরোক্ষভাবে যুক্ত হতে পারে।
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের এই সংঘাত কেবল সীমান্ত সমস্যা নয়, বরং গভীর ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার বহিঃপ্রকাশ। আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুই দেশের 'ভাই-ভাই' সম্পর্ক শীতল হয়েছে। টিটিপি-কে আশ্রয় দেওয়া বা না দেওয়ার প্রশ্নে পারস্পরিক দোষারোপের এই খেলা শেষ পর্যন্ত দুই দেশের সাধারণ জনগণের জন্যই দুর্ভোগ নিয়ে আসবে। এই উত্তেজনা নিরসনে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা বা আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে অবিলম্বে একটি কার্যকর সংলাপ শুরু হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায়, ডুরান্ড লাইনের এই বারুদ আঞ্চলিক শান্তিকে যেকোনো মুহূর্তে ধ্বংস করে দিতে পারে।

মন্তব্যসমূহ