বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে উত্তাল শিক্ষাঙ্গন: রাজপথে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা
বাংলাদেশে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ এবার রূপ নিয়েছে তীব্র আন্দোলনে। গত কয়েকদিন ধরে প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে, মূলত এমপিওভুক্ত (মান্থলি পে অর্ডার বা মাসিক বেতন আদেশ) শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের সীমিত বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে সরকারের দেওয়া সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে ‘অপর্যাপ্ত’ ও ‘প্রহসনমূলক’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। দাবি পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় তারা রাজধানী ঢাকায় লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন এবং প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সর্বাত্মক কর্মবিরতির ঘোষণাও আসতে পারে।
আন্দোলনের মূল দাবি কী?
শিক্ষক সংগঠনগুলোর জোট, যেমন 'এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোট'-এর নেতৃত্বে এই আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলো হলো:
১. বাড়িভাড়া ভাতা বৃদ্ধি: শিক্ষকদের মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা প্রদান করতে হবে।
২. চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি: চিকিৎসা ভাতা ১,৫০০ (এক হাজার পাঁচশত) টাকায় উন্নীত করতে হবে।
৩. উৎসব ভাতা বৃদ্ধি: কর্মচারীদের উৎসব ভাতা ৭৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।
৪. সর্বজনীন বদলি চালু: এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য একটি সর্বজনীন বদলি ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
কেন এই তীব্র অসন্তোষ?
শিক্ষকদের অসন্তোষের প্রধান কারণ হলো সরকারের সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্ত। দীর্ঘ আন্দোলনের পর সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়িভাড়া ভাতা ৫০০ টাকা বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
* বর্তমানে শিক্ষকরা মাত্র ১,০০০ টাকা বাড়িভাড়া ভাতা পান।
* সরকার এটি ৫০০ টাকা বাড়িয়ে ১,৫০০ টাকা করার প্রস্তাব করে।
* শিক্ষকরা এই সামান্য বৃদ্ধিকে 'অপর্যাপ্ত ও অবাস্তব' বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের যুক্তি, বর্তমান বাজারদরে এই টাকায় একদিনের বাজার খরচও হয় না, যেখানে সরকারি কর্মচারীরা মূল বেতনের ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া পান।
শিক্ষক নেতারা মনে করেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত শিক্ষকদের সাথে একপ্রকার 'পরিহাস'। এই প্রেক্ষাপটে, তারা পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন।
রাজপথের পরিস্থিতি ও পরবর্তী পদক্ষেপ
গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষক-কর্মচারীরা ঢাকায় এসে আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন। শিক্ষকদের এই সমাবেশ থেকে যেকোনো সময় দেশের সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা কর্মবিরতির ঘোষণা আসতে পারে।
* সংবাদ মাধ্যমের খবর: কোনো কোনো সংবাদে দেখা গেছে, শিক্ষকরা যখন প্রেস ক্লাবের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছিলেন, তখন পুলিশ তাদের সরাতে লাঠিচার্জ, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে এবং এর ফলে কয়েকজন শিক্ষক আহত হন। শিক্ষকদের শহীদ মিনারে অবস্থান নিতে বলা হলেও, তারা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান।
শিক্ষকদের দাবি, তাদের এই জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন না হলে এবং বেতন-ভাতা ন্যায্যভাবে না বাড়ালে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী হবেন না। ফলে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মানের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের এই আন্দোলন শুধু বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্য এবং বেসরকারি শিক্ষকদের করুণ আর্থিক দশার এক প্রতিচ্ছবি। একদিকে সরকার শিক্ষার মান উন্নয়নের কথা বলছে, অন্যদিকে শিক্ষকরা সামান্য কিছু আর্থিক সুবিধার জন্য রাজপথে নামতে বাধ্য হচ্ছেন। শিক্ষক সমাজ বিশ্বাস করে, শিক্ষার মেরুদণ্ডকে সোজা রাখতে হলে এই বৈষম্য দূর করে শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি অবিলম্বে মেনে নেওয়া উচিত। সরকারের দ্রুত ও ইতিবাচক সিদ্ধান্তই পারে এই অচলাবস্থা দূর করে শিক্ষাঙ্গনে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে।

মন্তব্যসমূহ