অন্তর্বর্তী সরকারের গণমাধ্যম নীতি: নতুন টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স প্রাপ্তি ও সমালোচনা
নতুন টিভি লাইসেন্স বিতর্ক: 'ফ্যামিলি চালাতেই হিমশিম খাওয়া নেতারা কীভাবে চ্যানেল চালাবেন?'- বলেছেন নূরুল হক নূরু।
সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার দুটি নতুন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল—'নেক্সট টিভি' এবং 'লাইভ টিভি'-কে অনুমোদন দেওয়ায় বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে এই লাইসেন্স প্রাপ্তদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের বিস্ফোরক মন্তব্য এই বিতর্কের কেন্দ্রে। তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন যে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যে নেতারা এই গণমাধ্যমের অনুমোদন পেয়েছেন, তারা নিজেদের 'ফ্যামিলি চালাতেও হিমশিম খাচ্ছেন'।
কে কী পেলেন? নেপথ্যে কারা?
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অনুমোদিত এই দুটি চ্যানেলের মালিকানার সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের নাম জড়িয়েছে।
* নেক্সট টিভি (Next TV): এই চ্যানেলের লাইসেন্স পেয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক মো. আরিফুর রহমান তুহিন। গণঅভ্যুত্থানের পর সাংবাদিকতা ছেড়ে তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। তিনি ছিলেন একটি ইংরেজি দৈনিকের স্টাফ রিপোর্টার।
* লাইভ টিভি (Live TV): এই চ্যানেলটির অনুমোদন পেয়েছেন আরিফুর রহমান নামের আরেক ব্যক্তি, যিনি একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক হিসেবে সাংবাদিকতা করেছেন এবং পরে সাংবাদিকতা ছেড়ে জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য হন।
নতুন সরকারের নীতি অনুসারে 'ফ্যাসিবাদমুক্ত গণমাধ্যম তৈরি' ও 'গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সুযোগ সৃষ্টি' করার কথা বলা হলেও, লাইসেন্স প্রাপ্তদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার বিষয়টি নিয়েই মূলত সমালোচনা শুরু হয়েছে।
নুরের কড়া মন্তব্য: 'ফ্যামিলি চালানোই কঠিন, চ্যানেল চালানো কীভাবে সম্ভব?'
গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এই লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন,
"আমরা শুনেছি এনসিপির নেতৃবৃন্দের নামে দুটি গণমাধ্যম অনুমোদন করা হয়েছে। যাদের নামে এই গণমাধ্যম অনুমোদন পেয়েছে, তারা নিজের ফ্যামিলি চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে। একজন স্টাফ রিপোর্টার থেকে শুরু করে কীভাবে এত বড় একটি চ্যানেল পরিচালনার জন্য তারা অনুমোদন পেলেন, তা বোধগম্য নয়। আমরা এই সরকার দ্বারা এমন পদক্ষেপ আশা করিনি। এই সরকারের যারা আছেন, তাদের এর দায় নিতে হবে।"
নুরুল হক নুরের এই মন্তব্যটি কেবল ব্যক্তিবিশেষের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন নয়, বরং গণমাধ্যমের মতো একটি বিশাল শিল্পে লাইসেন্স বিতরণের সামগ্রিক নীতির দিকেই ইঙ্গিত করে। তিনি মনে করিয়ে দেন, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যেভাবে চ্যানেলের লাইসেন্স বিতরণ করা হতো, নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও যদি একই প্রবণতা দেখা যায়, তবে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হবে সরকার।
সুযোগ নাকি প্রশ্নবিদ্ধ নীতি?
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, লাইসেন্স বিতরণের ক্ষেত্রে যদি কেবল রাজনৈতিক আনুগত্য বা গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা, কারিগরি সক্ষমতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তবে নতুন চ্যানেলগুলো কেবল জন্মগতভাবেই দুর্বল হবে। একটি পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন চ্যানেল পরিচালনা করতে যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়, তা মেটানোর সক্ষমতা না থাকলে চ্যানেলগুলো হয় মুখ থুবড়ে পড়বে, নয়তো অন্য কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে, তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম জানিয়েছেন যে, লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে সব ধরনের নীতিমালা মানা হচ্ছে এবং এটি গণঅভ্যুত্থানের অবদানকারীদের জন্য সরকারের একটি নতুন সুযোগ।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে লাইসেন্স বিতরণের প্রক্রিয়া কি আরও বেশি উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ হওয়া জরুরি নয়? নাকি শুধুমাত্র কিছু "ফ্যামিলি" বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সদস্যের হাতেই গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ থাকবে? এই বিতর্ক আরও দীর্ঘ হবে বলেই মনে করছে সচেতন মহল।

মন্তব্যসমূহ