জামাতের বিরুদ্ধে কিংস পার্টির অবস্থান: আবার কোন নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে?



বাংলাদেশের রাজনীতিতে হঠাৎ “ব্যাঙেরছাতা”র মতো গজে উঠা এবং ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাদের নেতাদের সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ও তীর্যক মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যেখানে এই দুই দলের মধ্যে এক ধরনের সুসম্পর্ক ও কাছাকাছি অবস্থান লক্ষ্য করা গিয়েছিল, সেখানে এনসিপির এই হঠাৎ ইউ-টার্ন অনেককেই ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষত, যখন এনসিপিকে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা বা ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে আখ্যায়িত করার অভিযোগ রয়েছে, তখন জামাতের মতো একটি পুরনো ও বিতর্কিত ইসলামী দলের বিরুদ্ধে তাদের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশল নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো খেলা মঞ্চস্থ হচ্ছে – সেই প্রশ্ন সামনে আসা স্বাভাবিক।

প্রেক্ষাপট: কিংস পার্টি ও জামাত-এনসিপি সখ্যতা

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সৃষ্ট একটি নতুন রাজনৈতিক দল। তবে দলের গঠন প্রক্রিয়া ও এর এক নেতার এক সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার কারণে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সহ বিভিন্ন মহল থেকে দলটিকে ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, সংস্কার প্রক্রিয়া ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি-কে অনেক ক্ষেত্রে কাছাকাছি অবস্থানে দেখা গিয়েছিল। এমনকি, একাধিক অভিন্ন দাবিতে জামায়াতসহ অন্যান্য ইসলামপন্থী দলের আন্দোলনে এনসিপিকে যুক্ত করারও চেষ্টা ছিল। এসব ঘটনায় দুই দলের মধ্যে একটি ‘সুসম্পর্কের’ ধারণা তৈরি হয়েছিল।

হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন: নতুন কৌশল

সাম্প্রতিক সময়ে সেই সখ্যতায় হঠাৎ করেই ছেদ পড়েছে। সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, এনসিপি নেতারা প্রকাশ্যেই জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে বক্তব্য রাখছেন। এনসিপির এক শীর্ষ নেতার ফেসবুকে জামায়াতকে লক্ষ্য করে দেওয়া ‘তির্যক পোস্ট’ বিশেষ আলোচিত হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত নেতারাও এর কঠোর প্রত্যুত্তর দিতে দ্বিধা করেননি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাঙনের সূত্রপাত হতে পারে ‘জুলাই সনদ’ স্বাক্ষরকে কেন্দ্র করে। সনদে স্বাক্ষর না করার বিষয়ে একসময় এনসিপির কাছাকাছি অবস্থানে থাকলেও শেষ পর্যন্ত জামায়াত নিজস্ব রাজনৈতিক বিবেচনায় সনদে স্বাক্ষর করে। অন্যদিকে এনসিপি ঘোষণাপত্র দিয়েও শেষ পর্যন্ত সনদে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকে। এনসিপি হয়তো প্রত্যাশা করেছিল, জামায়াতও তাদের পথ অনুসরণ করবে। কিন্তু জামায়াতের সিদ্ধান্তে এনসিপির সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এনসিপি এখন উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) চাইলেও, জামায়াত নিম্নকক্ষেও পিআর চালুর দাবিতে আন্দোলনে রয়েছে, যেখানে এনসিপি তাদের পাশে নেই। এসব রাজনৈতিক মতপার্থক্যই হয়তো এই প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে।

রাজনৈতিক নাটকের মঞ্চায়ন?

প্রশ্ন হলো, জামাতের বিরুদ্ধে এনসিপির এই অবস্থান কি কেবল মতাদর্শগত দূরত্ব নাকি কোনো নতুন রাজনৈতিক নাটকের অংশ?

 * বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা: একটি দিক হলো, ‘কিংস পার্টি’ তকমা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। জামায়াতের মতো একটি বিতর্কিত দলের সঙ্গে সখ্যতা থেকে দূরে সরে গিয়ে এনসিপি হয়তো জনগণের কাছে একটি ‘মধ্যপন্থী’ ও ‘বহুত্ববাদী’ ভাবাদর্শ তুলে ধরতে চাইছে।

 * ভোটব্যাংকে ভাগ বসানো: অন্য একটি সম্ভাবনা হলো, প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি-এর পাশাপাশি জামায়াতকেও চাপে রাখা। দেশের ইসলামী ধারার একটি বড় ভোটব্যাংককে বিভক্ত করার কোনো কৌশল কিনা, তা-ও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেকার টানাপোড়েনের সুযোগ নিয়ে এনসিপি কি এই রক্ষণশীল ও ইসলামী ধর্মীয় ধারার রাজনীতিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে?

 * সরকারের ‘ছক’: যেহেতু এনসিপি-কে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতাপুষ্ট বলে মনে করা হয়, তাই এই দ্বন্দ্বে সরকারের কোনো পরোক্ষ ইন্ধন আছে কিনা, সেই প্রশ্নও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জামায়াতকে একঘরে করার বা প্রধান বিরোধী বলয় থেকে আরও দূরে সরানোর কোনো ‘ছক’ এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা, তা সময় বলে দেবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এনসিপির উত্থান ও তাদের কার্যক্রম বরাবরই সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে। জামায়াতের বিরুদ্ধে তাদের এই আকস্মিক ও কঠোর অবস্থান একটি বহুমাত্রিক খেলার ইঙ্গিত দেয়। এটি এনসিপির রাজনৈতিক অপরিণত সিদ্ধান্ত, প্রত্যাশা ভঙ্গের ফল, নাকি বৃহত্তর কোনো রাজনৈতিক মেরুকরণের অংশ – তা নিয়ে বিতর্ক থাকবে। তবে এই সংঘাতের ফল যাই হোক না কেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এটি যে আরও অস্থিরতা ও নতুন সমীকরণের জন্ম দেবে, তা নিশ্চিত। এই 'নাটক' শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ জনগণের।

মন্তব্যসমূহ