আরপিও সংশোধন অধ্যাদেশ: বিশেষ দল বা ব্যক্তিকে লক্ষ্য করেই কি আরেকটি ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’?
![]() |
বাংলাদেশের প্রতিটি সংবাদপত্রের প্রধান শিরোনাম দখল করেছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন অধ্যাদেশের অনুমোদন সংক্রান্ত খবর। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে এই আইন সংশোধনের বিষয়টি বরাবরই সংবেদনশীল এবং তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। উপদেষ্টা পরিষদের (অস্থায়ী সরকারের) অধীনে এই সংশোধনীগুলো অনুমোদিত হয়েছে, যেখানে ইভিএম বাতিল, ‘না ভোট’ ফিরিয়ে আনা, প্রার্থীর দেশি-বিদেশি আয়ের তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা এবং জোটের প্রার্থীদের প্রতীক ব্যবহারে স্বচ্ছতা আনার মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। সরকারি ভাষ্যমতে, এই সংশোধনীগুলো নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য অপরিহার্য। তবে, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে প্রশ্ন জাগে, এই পদক্ষেপগুলো কি কেবলই নির্বাচনী সংস্কার, নাকি কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলকে প্রতিহত করার জন্য সুচিন্তিত ও সতর্কভাবে তৈরি (মেটিকুলাস ডিজাইন) একটি কৌশল?
সংবাদ বিশ্লেষণ ও সংশয়ের জন্ম:
সংবাদপত্রের প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায়, মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদ এই সংশোধনীগুলোর নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। আইন উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, এই বিধানগুলো আনা হয়েছে মূলত ২০১৪ সালের "সাজানো নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি" ঠেকাতে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে।
তবে, সংশোধিত আরপিও-এর কিছু দিক নিবিড় পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি করেছে:
‘না ভোট’ ও একক প্রার্থী:
একক প্রার্থীর ক্ষেত্রে ‘না ভোট’ দেওয়ার সুযোগ এবং ‘না ভোট’ জয়ী হলে পুনরায় নির্বাচনের বিধানটি আপাতদৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক অধিকারকে শক্তিশালী করে। কিন্তু এই বিধান কার্যত একটি বিশেষ রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে। যদি কোনো বৃহৎ দল নির্বাচন বর্জন করে বা একক প্রার্থী দেয়, তবে ‘না ভোট’ ব্যবহার করে সেই প্রার্থীকে পরাজিত করার সুযোগ তৈরি হয়। এটি কি পূর্ববর্তী নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়া রাজনৈতিক শক্তিকে লক্ষ্য করে তৈরি?
জোটের প্রার্থীদের প্রতীক ব্যবহার:
জোটের প্রার্থীদের নিজস্ব দলের প্রতীক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জোটবদ্ধ নির্বাচনে এই বিধানের মাধ্যমে ভোটারদের জন্য প্রার্থীর পরিচয় পরিষ্কার হবে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে, এর ফলে জোটের সুবিধা হ্রাস পেতে পারে এবং একটি বিশেষ বড় দলের পক্ষে একক প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কঠিন হতে পারে, যারা হয়তো জোটবদ্ধভাবে শক্তিশালী। এটি কি দীর্ঘদিনের জোট-ভিত্তিক রাজনীতিতে অভ্যস্ত কোনো দলের সাংগঠনিক ভিত্তিকে দুর্বল করার একটি প্রচেষ্টা?
প্রার্থীর দেশি-বিদেশি আয়ের তথ্য প্রকাশ:
প্রার্থীর দেশি-বিদেশি আয়ের তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এটি নির্বাচনের স্বচ্ছতা বাড়াতে সাহায্য করবে। কিন্তু এই বিধানটি কি কেবলই স্বচ্ছতা, নাকি প্রতিপক্ষের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তুলে তাদের হেয় করার একটি সুযোগ সৃষ্টি করবে? অতীতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সম্পদ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। এই বিধান সেই বিতর্কের একটি আইনি ভিত্তি তৈরি করবে কিনা, সেই প্রশ্নও আসে।
পলাতক অভিযুক্তদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা:
বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত পলাতক ব্যক্তিরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না – এই বিধানটি আনা হয়েছে। যদিও পলাতক অভিযুক্তদের নির্বাচনে অংশ না নিতে পারা সাধারণ যুক্তিতে সঠিক মনে হয়, তবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মামলা ও অভিযুক্ত হওয়া একটি সাধারণ ঘটনা। বিশেষ করে, বিগত ১৫ বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনেক বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মী মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন এবং অনেকে বিদেশে অবস্থান করছেন। এই বিধান কি সেই সকল রাজনৈতিক নেতাদের নির্বাচনী মাঠে ফিরে আসাকে আইনিভাবে প্রতিহত করার একটি সূক্ষ্ম কৌশল?
একটি ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ এর ছায়া?
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন অধ্যাদেশের প্রতিটি বিধানকে যদি বিচ্ছিন্নভাবে দেখা হয়, তবে এগুলো নির্বাচনী সংস্কারের অংশ। কিন্তু যদি সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বিগত বছরগুলোর ক্ষমতা পরিবর্তনের ইতিহাসকে বিবেচনায় নেওয়া হয়, তবে এই সংশোধনীগুলো একটি 'মেটিকুলাস ডিজাইন'-এর ইঙ্গিত দেয়।
এই সংশোধনীগুলো এমন একটি সময়ে এবং এমনভাবে আনা হয়েছে, যখন প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং অস্থায়ী সরকার একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মঞ্চ তৈরি করার চেষ্টা করছে। তবে, সংশোধনীগুলোর নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু (যেমন: একক প্রার্থী, জোটের প্রতীক, পলাতক অভিযুক্ত) দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল বা তাদের নেতৃবৃন্দকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নির্বাচনী প্রতিযোগিতার দৌড় থেকে দূরে রাখতে বা তাদের দুর্বল করতে এই আইনগুলো তৈরি করা হয়েছে।
নির্বাচন ব্যবস্থা শক্তিশালী হোক, তা সকলের কাম্য। তবে, আইন প্রণয়নের সময় যদি জনগণের মনে এমন প্রশ্ন জাগে যে এর নেপথ্যে কোনো ‘বিশেষ ব্যক্তি বা দলকে প্রতিহত করার নকশা’ লুকিয়ে আছে, তবে সেই আইন তার উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত, এই অধ্যাদেশের লক্ষ্য যদি শুধু সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা হয়, তবে সরকারকে এর প্রয়োগে নিরপেক্ষতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড বজায় রাখতে হবে, অন্যথায় এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে সমালোচিত হবে।

মন্তব্যসমূহ