সাংবিধানিক সংঘাত, গোঁজামিল ও আস্থার সংকট: প্রসঙ্গ জুলাই সনদ
২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণ-অভ্যুত্থান (?) এর পর নতুন করে রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের যে ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তারই ফলশ্রুতিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ প্রণয়ন। এই সনদকে ঘিরে বাংলাদেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর একটি লেখায় যে গভীর আইনি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে- জুলাই সনদ দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে এক নতুন সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তাঁর মতে, ঐকমত্য কমিশন যে পথে সংস্কারের সুপারিশ করেছে, তা কেবল আইনি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে না, দেশের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
সাংবিধানিক সংঘাত: বর্তমান সংবিধান বাতিলের প্রশ্ন
ড. শাহদীন মালিকের মূল বক্তব্য হলো, জুলাই সনদে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত যে ৪৮টি প্রস্তাব করা হয়েছে, তার বেশিরভাগই বিদ্যমান সংবিধানের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সাংঘর্ষিক। তিনি উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, বর্তমান সংবিধানে এক কক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদের বিধান থাকলেও জুলাই সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব করা হয়েছে। তাঁর মতে, সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো অনুচ্ছেদ বা ধারা বলবৎ করতে গেলে বর্তমান সংবিধানকে বাতিল ঘোষণা করতে হবে। এটি না করে সাংঘর্ষিক প্রস্তাব বাস্তবায়ন করাকে তিনি সম্পূর্ণ অবাস্তব এবং ‘গোঁজামিল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনের ইতিহাসে সুপ্রিম কোর্ট বহুবার সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সংশোধনী বাতিল করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলোও বাতিলযোগ্য হবে, যদি না বর্তমান সংবিধানকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা হয়। ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, যারা এই সনদের সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের ন্যূনতম ব্যাকরণ সম্পর্কে ধারণা নেই, যার ফলশ্রুতিতে এমন এলোমেলো ও অবাস্তব বিষয়গুলো সনদে যুক্ত হয়েছে। এই আইনি দুর্বলতা দেশের চলমান অস্থিতিশীলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
ঐকমত্য কমিশনের নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রতারণা
ঐকমত্য কমিশন গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু ড. শাহদীন মালিক তাঁর নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, এই কমিশনের নিরপেক্ষতা ভীষণভাবে নষ্ট হয়েছে। তিনি বিএনপির উত্থাপিত গুরুতর অভিযোগটির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন—বিএনপি যেটিতে স্বাক্ষর করেছে এবং চূড়ান্ত যে দলিল হয়েছে, তার মধ্যে ফারাক আছে। একটি কাগজ দেখিয়ে স্বাক্ষর নিয়ে অন্য কাগজ চূড়ান্ত করা হলে, তা ঐকমত্য কমিশনের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ জমা দেওয়ার পর বিএনপি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা অভিযোগ করেছে যে, যে বিষয়গুলোতে তাদের 'নোট অব ডিসেন্ট' (ভিন্নমত) ছিল, তা সুপারিশমালায় পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। বিএনপির মহাসচিব এই প্রক্রিয়াকে জনগণের সঙ্গে 'প্রতারণা' বলে উল্লেখ করেছেন, যা প্রমাণ করে যে ঐকমত্য কমিশন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়েছে এবং দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য আরও তীব্রভাবে সামনে এসেছে। জাতীয় ঐকমত্যের নামে রাজনৈতিক বিভেদ স্পষ্ট হওয়ায় কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা বড় সংকটে পড়েছে।
গণভোটের অবাস্তবতা ও আইনগত ত্রুটি
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অন্যতম প্রস্তাব ছিল গণভোটের আয়োজন। ড. শাহদীন মালিক এই প্রস্তাবের অবাস্তবতা তুলে ধরেছেন। তিনি যুক্তি দেন যে, গণভোট সাধারণত একটি সুনির্দিষ্ট একক প্রস্তাবের (যেমন: ব্রেক্সিট) ওপর হয়ে থাকে। ২৫ পৃষ্ঠার দলিলে থাকা ৪৮টি জটিল বিষয়ে সাধারণ ভোটারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়া সম্ভব নয়; এমনকি সনদের জটিলতা বোঝার মতো ভোটার সংখ্যাও দেশে ১৫ শতাংশের বেশি হবে না।
এছাড়াও, গণভোট আয়োজনের জন্য দেশে সুনির্দিষ্ট আইন নেই। এর জন্য অধ্যাদেশ জারি করতে হবে, যেখানে ৪৮টি বিষয়ে গণভোট কিভাবে পরিচালিত হবে, তার বিস্তারিত উল্লেখ থাকতে হবে। ৪৮টি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে গণভোটের প্রশ্নটিই তিনি অবান্তর বলে মন্তব্য করেন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সনদে এমন একটি ধারা রয়েছে যে, সংসদে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ২৭০ দিনের মধ্যে প্রস্তাব পাস না করলে তা পাস বলে গণ্য হবে। যদি ফলাফল পূর্বনির্ধারিতই থাকে, তবে এত দীর্ঘ আলোচনার কী যৌক্তিকতা ছিল—এই প্রশ্নও তিনি উত্থাপন করেছেন।
আইনের শাসনের ভবিষ্যৎ ও দীর্ঘমেয়াদী খেসারত
ড. শাহদীন মালিক তাঁর বিশ্লেষণে এক গভীর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো যখন ‘সাংবিধানিক আদেশ’ (Constitutional Order) এর মাধ্যমে বলবৎ করার প্রস্তাব আসে, তখন দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থা এলোমেলো হয়ে যায়। আইনের ধারাবাহিকতা ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে, এর ফলে তৈরি হওয়া আইনি ব্যবস্থার টালমাটাল অবস্থা থেকে দেশকে স্থিতিশীল অবস্থায় আনতে দীর্ঘ ২০ বছর লেগে যেতে পারে।
ড. শাহদীন মালিকের এই গভীর আইনি বিশ্লেষণ এবং এর সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দেয় যে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পথ মসৃণ নয়। সাংবিধানিক আইনের প্রাথমিক ব্যাকরণ উপেক্ষা করে যদি কোনো সংস্কার চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা দেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পরিবর্তে আরও দীর্ঘমেয়াদী আইনি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেবে। জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার নামে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়া বর্তমানে এক গুরুতর আইনি বিভেদ ও আস্থার সংকটে পতিত হয়েছে।




মন্তব্যসমূহ