গণভোটের সিদ্ধান্ত দেবেন মোহাম্মদ ইউনুস। কিন্তু কী বিষয়ের উপরে গণভোট হবে?

ব্যাঙেরছাতা


গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে প্রতিটি অনলাইন পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ছিল- গণভোটের সিদ্ধান্ত দেবেন মোহাম্মদ ইউনুস। বলছেন- আসিস নজরুল। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গণভোট এবং ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন মোহাম্মদ ইউনুস। এই খবরটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মূলত ঐকমত্য কমিশন যে 'জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫'-এর জন্য গণভোটের সুপারিশ করেছে, সেই গণভোট কখন এবং কীভাবে হবে, সেই সিদ্ধান্ত মোহাম্মদ ইউনুস নিবেন বলে জানা গেছে। তবে, বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গণভোটের মতো একটি প্রক্রিয়া এই মুহূর্তে কতটা সাংবিধানিক এবং গণতান্ত্রিক—সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সাংবিধানিক বৈধতা ও গণভোটের বিলুপ্তি

বাংলাদেশের সংবিধানে একসময় গণভোটের বিধান থাকলেও, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে গণভোটের বিধান বাতিল করা হয়েছে। সংবিধানের এই পরিবর্তন দেশে জনগণের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদের সার্বভৌমত্বকে নিশ্চিত করে।

বর্তমান অসাংবিধানিক অবস্থান: গণভোটের বিধান বাতিল হওয়ার পর, এখন যেকোনো বিষয়ে গণভোট আয়োজন করতে গেলে, হয় সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করতে হবে, নয়তো সংবিধানকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে অসাংবিধানিক পন্থায় একটি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে হবে।

ব্যাঙেরছাতা
অস্থায়ী সরকারের এখতিয়ার: একটি অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার মূলত দৈনন্দিন কাজ পরিচালনা এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য সীমিত ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে থাকে। তাদের কোনোভাবেই সংবিধান সংস্কার বা মৌলিক সাংবিধানিক কাঠামো পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার থাকা উচিত নয়। সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন আনা কেবলমাত্র জনগণের সরাসরি নির্বাচিত জাতীয় সংসদের কাজ। অন্তর্বর্তী সরকারের “প্রধান উপদেষ্টা”র এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সাংবিধানিক শূন্যতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে দেখা যেতে পারে। 

গণভোটের অতীত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: বৈধতার সংকট

বাংলাদেশে গণভোটের অতীত খুব একটা উজ্জ্বল বা গণতান্ত্রিক ছিল না। সামরিক শাসনের সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (১৯৭৭) এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ (১৯৮৫) নিজেদের সামরিক শাসনের বৈধতা প্রমাণের জন্য গণভোটের আয়োজন করেছিলেন, যা ছিল মূলত প্রশাসনিক গণভোট।

অগণতান্ত্রিক হাতিয়ার: এই গণভোটগুলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ছিল না এবং এর মাধ্যমে কার্যত সামরিক শাসনের পক্ষে জনসমর্থনের নাটকীয়তা দেখানো হয়েছিল। এই ইতিহাস প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে গণভোট প্রায়শই অগণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

১৯৯১ সালের ব্যতিক্রম: একমাত্র ১৯৯১ সালে সংসদ কর্তৃক সংবিধান সংশোধনের পর রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার থেকে সংসদীয় সরকারে প্রত্যাবর্তন বিষয়ে একটি সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এটিই ছিল একমাত্র নজির যেখানে জনগণের সম্মতি চাওয়া হয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত সাংবিধানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে।

কীসের উপর এই গণভোট? প্রশ্নটিই জটিল

ব্যাঙেরছাতা

ঐকমত্য কমিশন মূলত 'জুলাই জাতীয় সনদ' বাস্তবায়নের বিষয়ে গণভোটের সুপারিশ করেছে, যার মধ্যে সংবিধানের মূলনীতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি, সংসদের উচ্চকক্ষসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার প্রস্তাব রয়েছে। এখানেই সবচেয়ে বড় সমস্যা:

একক প্রশ্নের অভাব: একটি আদর্শ গণভোট হয় একটিমাত্র প্রশ্নের উপর, যার উত্তর 'হ্যাঁ' বা 'না' হতে পারে (যেমন: সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চান কি না)। কিন্তু এই সনদে একাধিক বিতর্কিত ও জটিল বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একজন ভোটার হয়তো কোনো কোনো বিষয়ে একমত, আবার কোনো কোনো বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন। একাধিক ও ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের বিষয়কে একটি মাত্র 'হ্যাঁ/না' ভোটিং প্রক্রিয়ায় ফেলে দেওয়াটা সম্পূর্ণভাবে অগণতান্ত্রিক এবং গণমানুষের মতের ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করবে।

বিভাজনের ঝুঁকি: সংবিধানের মৌলিক কাঠামো নিয়ে জনগণের মধ্যে মত চাওয়া হলে, তা সমাজের মধ্যে ঐক্যের বদলে আরও বেশি বিভাজন ও অনৈক্য সৃষ্টি করতে পারে। মনগড়া সংস্কার প্রস্তাব জাতীয় জীবনে দীর্ঘমেয়াদী অকল্যাণ ডেকে আনতে পারে।

গণভোট: গণতন্ত্রের মোড়কে অগণতান্ত্রিকতা

গণভোটের মাধ্যমে জনগণকে দিয়ে সংবিধান পরিবর্তনের মতো মৌলিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটা আপাতদৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক মনে হলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি আসলে অগণতান্ত্রিকতার দিকেই ইঙ্গিত করে।

প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের বিরোধী: বাংলাদেশ একটি প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের দেশ, যেখানে জনগণ ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করে এবং সেই প্রতিনিধিরা সংসদে বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধন করে। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে, একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধানের একক সিদ্ধান্তে গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়াটা প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের মূল চেতনার পরিপন্থী।

রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি: জাতীয় নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট হলে তা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল ও বিতর্কিত করতে পারে। নির্বাচনের আগে গণভোট হলে তা রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়াতে পারে। এই ধরনের সিদ্ধান্ত ক্ষমতা হস্তান্তরের শান্তিপূর্ণ পথকে রুদ্ধ করে দিতে পারে।

ব্যাঙেরছাতা

মোহাম্মদ ইউনুসের গণভোটের সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। গণভোটকে 'জুলাই সনদ' বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে, তা বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিতে পারে। জনগণের প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন নিশ্চিত করতে হলে, একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদের হাতেই সংবিধান সংস্কারের ভার দেওয়া উচিত। এই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার একক সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে বলেই মনে করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল।

মন্তব্যসমূহ