জেন-জি’রা দেশে দেশে অপরিনাম ও চরম সর্বনাশ ডেকে নিয়ে আসছে



অতি সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলনে জেনারেশন-জেড (Gen-Z)-এর উত্থান এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নেপাল, কেনিয়া, মরক্কো এবং সর্বশেষ মাদাগাস্কারের মতো দেশগুলোতে তরুণদের এই আন্দোলন যেন এক বিশ্বজোড়া ‘ট্রেন্ড’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের একটি অংশ উচ্ছ্বসিত হলেও, গভীরভাবে দেখলে স্পষ্ট হয় যে এই তথাকথিত ‘বিপ্লব’ দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য চরম অপরিণাম ডেকে আনছে।

০১। অস্থিতিশীলতার বীজ: তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও অপরিনামদর্শী পদক্ষেপ

জেন-জি আন্দোলনগুলোর মূল সমস্যা হলো, এগুলি প্রায়শই সুনির্দিষ্ট, তাৎক্ষণিক কোনো ক্ষোভ বা সমস্যার (যেমন: বিদ্যুৎ-পানি সংকট, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যান) কারণে শুরু হলেও, দ্রুতই তা বৃহত্তর ও অস্পষ্ট সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয়। মাদাগাস্কারে সামান্য পানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন প্রেসিডেন্টকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। নেপালেও সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার জেরে সরকার পতন হয়েছে।

রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাহীন এই তরুণ প্রজন্মের কাছে সরকার পতনই যেন একমাত্র সমাধান। তারা ক্ষমতা কাঠামোর জটিলতা, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং একটি দেশকে পরিচালনার জন্য স্থিতিশীলতার গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ। ফলে, একটি সরকার পতনের পর তাদের হাতে কোনো সুচিন্তিত বিকল্প রাজনৈতিক কাঠামো বা পরিণামদর্শী নেতৃত্ব থাকে না। যা দেশকে গভীর রাজনৈতিক শূন্যতা ও অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেয়।

০২। ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মের বিপজ্জনক প্রভাব: অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার জন্ম

জেন-জিরা জন্মগতভাবেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বাসিন্দা। ফেসবুক, টিকটক, ডিসকর্ড, এবং টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার। এসব প্ল্যাটফর্মে তারা সহজেই একত্রিত হয়, কিন্তু এই একত্রীকরণের ভিত্তি অত্যন্ত ঠুনকো ও আবেগপ্রবণ।

সংগঠনহীনতা: এই আন্দোলনগুলো প্রায়শই নেতৃত্ববিহীন, যা আন্দোলনের শক্তি হলেও এর পরিণাম হয় ভয়াবহ। নেতার অনুপস্থিতিতে বিক্ষুব্ধ জনতা সহজেই বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে, যার ফলে সহিংসতা ও সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনা ঘটে। নেপালে বিক্ষোভের সময় সরকারি ভবন ও রাজনৈতিক নেতাদের বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা এর প্রমাণ।

আবেগ ও হুজুগ: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া তথ্য (অনেক সময় ভুল বা অর্ধ-সত্য) আবেগের পারদকে দ্রুত উপরে তোলে। এর ফলে, একটি ঠান্ডা মাথার আলোচনা বা গঠনমূলক সমালোচনার বদলে জন্ম নেয় হুজুগপূর্ণ অস্থিরতা, যা সমাজকে চরমপন্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

সীমিত লক্ষ্য: আন্দোলনকারীরা স্লোগান, মিম এবং সংক্ষিপ্ত হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে নিজেদের বার্তা প্রচার করে। কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত বার্তাগুলো দেশের জটিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলোর গভীরে পৌঁছাতে পারে না।

০৩। জীবনহানির ঝুঁকি ও সমাজের মেরুকরণ: চরম মূল্য

এই আন্দোলনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো প্রাণহানি। মাদাগাস্কারে সহিংসতায় কমপক্ষে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নেপালে এই সংখ্যা ছিল আরও বেশি, যেখানে ৭৬ জন প্রাণ হারান বলে জানা যায়। রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং সরকার পতনের মতো ঘটনা ঘটাতে গিয়ে নিরীহ মানুষের জীবন বলি হচ্ছে।

তরুণদের এই সরাসরি সহিংস পথ সমাজে দীর্ঘস্থায়ী মেরুকরণ সৃষ্টি করে। তারা পুরনো প্রবীণ রাজনৈতিক নেতাদের ‘দুর্নীতিবাজ’ বা ‘নেপো কিডস’-এর সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে সমাজে প্রজন্মগত বিভেদ আরও তীব্র হয়। পুরোনো কাঠামো রাতারাতি ভেঙে পড়ার ফলস্বরূপ যে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা পূরণ করতে কোনো শক্তিশালী স্বৈরাচারী শক্তি বা বিদেশি হস্তক্ষেপকারী সহজে সুযোগ পেয়ে যেতে পারে—যা গণতন্ত্রের জন্য আরও বড় বিপদ।

জেন-জি-এর এই বৈশ্বিক জাগরণ হয়তো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু এই পরিবর্তন গঠনমূলক না হয়ে বিধ্বংসী হওয়ার ঝুঁকিই বেশি। এই প্রজন্ম হয়তো প্রচলিত রাজনীতির ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, কিন্তু তারা যে পথ বেছে নিচ্ছে, তা কোনো সুস্থায়ী, শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের পথ নয়। সরকার পতনই যদি একমাত্র 'বিজয়' হয়, তবে সেই বিজয়ের পর দেশগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে? গণতন্ত্র, শান্তি ও স্থিতিশীলতার চরম অপরিণাম কি জেন-জি-এর কাঁধেই এসে পড়বে? এই প্রশ্নগুলোই আজ বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলছে।

মন্তব্যসমূহ