আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ: প্রশংসনীয় উদ্যোগ, তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমুক্তির প্রত্যাশা



সম্প্রতি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে দেশের তরুণ-তরুণীদের আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি ও জনসাধারণের আত্মরক্ষার দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে মোট ৮,৮৫০ জনকে জুডো, কারাতে, তায়কোয়ানডো এবং শুটিং (প্রথমে ‘আগ্নেয়াস্ত্র’ হিসেবে উল্লিখিত হলেও পরে ‘শুটিং’-এ সংশোধিত) বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়েছে। তরুণ সমাজকে আত্মবিশ্বাসী ও সক্ষম করে তোলার ক্ষেত্রে এটি একটি সময়োপযোগী ভাবনা। তবে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই মহৎ উদ্যোগের আড়ালে যেন কোনোভাবে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য লুকিয়ে না থাকে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা অত্যন্ত জরুরি।

উদ্যোগের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

দেশের যুব সমাজকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম করে তোলার জন্য এই ধরনের প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আত্মরক্ষার কৌশল শেখার পাশাপাশি শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা এবং আত্মনির্ভরশীলতার মানসিকতা তৈরি হয়। বিশেষ করে, বর্তমান সময়ে নারী ও পুরুষের জন্য আত্মরক্ষার মৌলিক জ্ঞান থাকা জরুরি। ১৫ দিনব্যাপী এই প্রশিক্ষণে থাকা-খাওয়া, পোশাক ও ভাতা দেওয়ার ঘোষণা একে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপ প্রশংসার দাবি রাখে, যা তরুণদের ইতিবাচক পথে চালিত করতে পারে।

উদ্বেগের দিক: উদ্দেশ্য যেন পথ না হারায়

তবে, ঠিক এই সময়ে যখন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজমান এবং দ্রুত একটি নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে, তখন এই ধরনের প্রশিক্ষণে ‘শ্যুটিং’ বা পূর্বের ‘আগ্নেয়াস্ত্র’-এর মৌলিক প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি কিছুটা উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে একে 'জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার'-এর অংশ বলা হলেও, যুবকদের হাতে আত্মরক্ষার নামে প্রশিক্ষিত ‘শক্তি’ তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক।

আমাদের স্মরণ রাখা প্রয়োজন:

১. রাজনৈতিক ব্যবহার: অতীতে বিভিন্ন সময়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রশিক্ষিত যুবকদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে বা নির্বাচনী সহিংসতায় ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এই ৮,৮৫০ জন প্রশিক্ষণার্থী যেন কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের 'ক্যাডার বাহিনী' বা ‘যুব শক্তি’ হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য কেবল আত্মরক্ষা ও শৃঙ্খলা হওয়া বাঞ্ছনীয়, কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন নয়।

২. স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা: প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়া যেন শতভাগ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়। মেধা, শারীরিক সক্ষমতা ও আগ্রহই যেন একমাত্র মাপকাঠি হয়, কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় বা সুপারিশ নয়। পুরো প্রক্রিয়াটি জনগণের সামনে উন্মুক্ত থাকা দরকার।

৩. প্রশিক্ষণের মান ও লক্ষ্য: প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু যেন কঠোরভাবে আত্মরক্ষা এবং দেশাত্মবোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ‘শ্যুটিং’ প্রশিক্ষণের নামে যেন কোনোভাবেই তাদের মধ্যে উগ্রতা বা আগ্রাসী মনোভাব তৈরি না হয়। লক্ষ্য রাখতে হবে, এই প্রশিক্ষণ যেন সমাজের নিরাপত্তা জোরদার করে, দুর্বল না করে।

প্রত্যাশা ও করণীয়

এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি একটি চমৎকার সুযোগ হতে পারে দেশের যুব সমাজকে ইতিবাচক দিকে চালিত করার। আমরা প্রত্যাশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের ঘোষিত উদ্দেশ্য – অর্থাৎ, ‘আত্মরক্ষা’ ও ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা’ – অর্জনের ক্ষেত্রে শতভাগ অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে।

সরকারকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে, এই প্রশিক্ষণ একটি জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে স্বীকৃত হবে, কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যম নয়। সচেতন নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে এই প্রক্রিয়ার ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে, যাতে এই মহৎ উদ্যোগ কোনো রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের হাতিয়ারে পরিণত না হয়।

মূল কথা হলো: আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ একটি মৌলিক অধিকার এবং যুবকদের ক্ষমতায়নের প্রতীক। এই প্রতীক যেন কোনো রাজনৈতিক রঙে কলঙ্কিত না হয়, সে বিষয়ে সরকারকেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে। দেশের তরুণদের হাতে যেন কেবল আত্মরক্ষার কৌশল নয়, বরং একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ গড়ার দায়িত্ববোধও তুলে দেওয়া হয়।

মন্তব্যসমূহ