বাংলাদেশের ফুটবলে ‘নাম্বার নাইন’ সমস্যার সমাধান? লাল-সবুজের জার্সিতে খেলতে আগ্রহী ট্রেভর ইসলাম
প্রবাসীর পথ ধরে এক নতুন দিগন্ত
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের ফুটবলে এক নতুন প্রবণতা দেখা দিয়েছে—দেশের বংশোদ্ভূত প্রবাসী ফুটবলারদের জাতীয় দলে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ। হামজা চৌধুরীর পর শমিত সোম এবং জায়ান আহমেদের মতো ফুটবলাররা লাল-সবুজের জার্সি গায়ে তুলেছেন। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই নতুন করে আলোচনায় এসেছেন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ও যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা তারকা ফরোয়ার্ড ট্রেভর ইসলাম। সম্প্রতি Channel 24-এ প্রকাশিত সংবাদে তার জাতীয় দলের হয়ে খেলার আগ্রহের কথা নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে বিপুল উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। এই সংবাদটি কেবল একটি ব্যক্তিগত আগ্রহ নয়, বরং বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রেভর ইসলাম: কে এই ফরোয়ার্ড?
ট্রেভর ইসলাম, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড মেন'স সকার ক্লাবের হয়ে খেলছেন, মূলত একজন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ফুটবলার। তার বেড়ে ওঠা এবং ফুটবল প্রশিক্ষণ হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত পরিবেশে। কিন্তু তার শিকড় মিশে আছে বাংলাদেশের মাটিতে, যার সূত্র ধরেই তিনি দেশের প্রতি টান অনুভব করছেন।
ফুটবল মহলে তাকে নিয়ে আগ্রহের প্রধান কারণ হলো তার খেলার ধরন। ট্রেভর ইসলামকে একজন 'জেনুইন নাম্বার নাইন' (Genuine Number Nine) হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আধুনিক ফুটবলে আক্রমণভাগের এই পজিশনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং বাংলাদেশ জাতীয় দল দীর্ঘদিন ধরেই একজন নির্ভরযোগ্য, গোল-স্কোরিং স্ট্রাইকারের অভাবে ভুগছে। প্রায় প্রতিটি আন্তর্জাতিক ম্যাচেই ফিনিশিংয়ের অভাবটা প্রকট হয়ে ওঠে। ট্রেভরের খেলা যারা দেখেছেন, তাদের মতে—তার দুর্দান্ত ফিনিশিং ক্ষমতা, গোলমুখে সঠিক পজিশন নেওয়ার দক্ষতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা জাতীয় দলের এই দুর্বলতা দূর করতে পারে। অর্থাৎ, ট্রেভর ইসলাম কেবল একজন নতুন খেলোয়াড় নন, তিনি বাংলাদেশের ফুটবলের আক্রমণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষিত সমাধান হয়ে উঠতে পারেন।
নাগরিকত্বের জটিলতা এবং প্রক্রিয়ার গতি-প্রকৃতি
ট্রেভর ইসলামের জাতীয় দলের জার্সি পরিধান করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো নাগরিকত্বের প্রক্রিয়া। তার এজেন্ট আবিদ আনোয়ার গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে ট্রেভর নিজে বর্তমানে বৈধ বাংলাদেশি পাসপোর্টের অধিকারী নন। এই প্রক্রিয়ার জটিলতা অন্য প্রবাসী ফুটবলারদের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন।
এজেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ট্রেভর ইসলামের বাবা-দাদার হাতে লেখা পুরোনো বাংলাদেশি পাসপোর্ট রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর বর্তমানে কোনো বৈধতা নেই। নিয়ম অনুযায়ী, ট্রেভরের নিজের পাসপোর্ট পাওয়ার আগে তার বাবা-দাদার পুরোনো পাসপোর্টগুলোকে বৈধতা দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এই আইনি এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ।
আবিদ আনোয়ার এই বিষয়ে আশাবাদী হলেও বাস্তবতা হলো, এই ধরনের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হওয়া কঠিন। ফুটবলপ্রেমীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করলেও, এজেন্ট নিশ্চিত করেছেন যে চলতি বছরে ট্রেভর ইসলামকে লাল-সবুজের জার্সিতে মাঠে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে, আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের শুরুতে তাকে পাওয়ার বিষয়ে তারা আশাবাদী। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে (বাফুফে) কিউবার মতো জটিল প্রক্রিয়াতেও সফল হওয়ার যে প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রবাসী ফুটবলারদের ঢেউ: ফুটবলের নতুন আশা
ট্রেভর ইসলামের জাতীয় দলের প্রতি আগ্রহের বিষয়টি আসলে একটি বৃহত্তর ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশ। এই ধারা শুরু হয়েছে ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগে খেলা হামজা চৌধুরীর মাধ্যমে। হামজা চৌধুরীর বাংলাদেশে এসে খেলা এবং দলের প্রতি তার অঙ্গীকার অন্য প্রবাসী ফুটবলারদের অনুপ্রাণিত করেছে। এরপর কানাডিয়ান লিগে খেলা শমিত সোম এসেছেন, এবং ইতোমধ্যে জায়ান আহমেদও জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন।
ট্রেভর ইসলামের আগমনের খবরে এই বিষয়টি পরিষ্কার যে, বাংলাদেশের শিকড় রয়েছে এমন প্রতিভাবান ফুটবলাররা নিজ দেশের হয়ে খেলার জন্য প্রস্তুত। তারা উন্নত বিশ্বের ফুটবল অবকাঠামোতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং তাদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলের তুলনায় অনেক বেশি সমৃদ্ধ। যদি এই প্রবাসী ফুটবলারদের সফলভাবে জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তবে তা শুধু প্রথম একাদশের শক্তিই বাড়াবে না, বরং দেশের স্থানীয় ফুটবলারদের মধ্যেও পেশাদারিত্ব ও মানোন্নয়নের জন্য একটি নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করবে।
ট্রেভর ইসলামের পাশাপাশি আরেকজন প্রবাসী ফরোয়ার্ড জায়ান হাকিমেরও পাসপোর্ট তৈরির কাজ চলছে বলে জানা গেছে। ফরোয়ার্ড পজিশনে একসঙ্গে একাধিক মানসম্পন্ন প্রবাসী ফুটবলারকে পাওয়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎকে আরও উজ্জ্বল করে তুলছে।
আশাবাদী অপেক্ষার পালা
ট্রেভর ইসলামের বাংলাদেশের হয়ে খেলার আগ্রহ একটি দারুণ খবর। তার মতো একজন দক্ষ ফরোয়ার্ডকে যদি সত্যিই জাতীয় দল পায়, তবে নিঃসন্দেহে গোল করার সমস্যা অনেকাংশে দূর হবে। এটি বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের একটি 'টার্নিং পয়েন্ট' হতে পারে, যেখানে হামজা চৌধুরীর হাত ধরে শুরু হওয়া প্রবাসী ফুটবলারদের পথ, ট্রেভর ইসলামের আগমনে পূর্ণতা পাবে।
তবে, ফুটবলের মাঠে নামার আগে অপেক্ষা করতে হবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সমাপ্তির জন্য। আপাতত, আমাদের প্রত্যাশা থাকবে যে বাফুফে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই প্রক্রিয়াটি দ্রুত এবং সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করবে। সকল জটিলতা পেরিয়ে ট্রেভর ইসলাম লাল-সবুজের জার্সি গায়ে বাংলাদেশের হয়ে গোল করে জনসমুদ্রকে উল্লাসে ভাসাবেন—এই আশাতেই বুক বাঁধছে দেশের ফুটবলপ্রেমীরা। তার জন্য আমাদের এই আশাবাদী অপেক্ষার পালা চলতেই থাকবে।




মন্তব্যসমূহ