পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- রোমান্টিক প্রেমের গল্প: প্রথম পরিচ্ছেদ



পুলিশ গার্লফ্রেন্ড

(রোমান্টিক প্রেমের গল্প)

প্রথম পরিচ্ছেদ

নওরোজ বিপুল

মোটরসাইকেলটা হঠাৎ বিগড়ে উঠলো। খকখক করে কয়েকবার কাশি দিয়ে, ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলো। গতি কিছুটা বেশিই ছিল। শেষ মুহূর্তে বাইকটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলো কারীব। অল্পের জন্য ব্রিজের রেলিঙের সাথে ধাক্কা খাওয়া থেকে, বাইকটাকে বাঁচাতে পারলো সে। রেলিঙের সাথে বাইকের ধাক্কা লাগলে, বাইকটা তো গুঁড়ো গুঁড়ো হতোই, ওর হাড্ডি-গুড্ডিও এতক্ষণে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে যেতো।
ব্রিজের রেলিঙের সাথে ফুটপাত। ফুটপাতের পাশে বাইক থামালো কারীব। হটাৎ বাইকটা এমন আচরণ করলো কেন, তা বুঝতে পারলো না সে। তেল তো শেষ হওয়ার কথা নয়। অবশ্য দীর্ঘ ভ্রমণে গিয়েছিল সে। ভ্রমণ দীর্ঘ হলেও তেল শেষ হওয়ার কথা নয়। ভ্রমণে বের হওয়ার আগে সে, ট্যাঙ্কি ফুল করে তেল তুলে নিয়েছিল। দূরত্ব অনুযায়ী সেই তেলে, গিয়ে আবার নির্বিঘ্নে ফিরে আসা সম্ভব। বাইকে বসেই ট্যাঙ্কের ঢাকনা খুললো কারীব। তেল চেক করলো। হ্যাঁ, যথেষ্ট তেল আছে এখনো। 
বাইক স্ট্যান্ড করলো কারীব। নামলো বাইক থেকে। হেলমেট খুললো। বাইকের হাতলের সাথে ঝুলিয়ে রাখলো। হাতে পরা ঘড়ির দিকে তাকালো। রাত প্রায় পৌনে বারোটা বাজে। এদিক ওদিক তাকালো সে। জনমানবহীন নির্জন রাস্তা। মাঝে মাঝে দুই একটা যাত্রীবাহী বাস আসছে। সাঁ করে বের হয়ে যাচ্ছে। কখনো আবার পণ্যবাহী বিশালদেহী ট্রাক আসছে। সাঁ করে বের হয়ে যাচ্ছে। একটা ট্রাকের পেছনে বসা, এক লোক তো চিৎকার করে বলল, ‘কী ভাই, বাইক নিয়া ব্রিজের উপ্রে খাড়াই রইছেন কীলিগা, মাল খুঁজতেছেননি?’
সাথের অন্যান্য লোকেরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। দ্রুত ট্রাকটা চলে গেলো। মাল খোঁজা বলতে ট্রাক শ্রমিক কী বোঝাতে চেয়েছে, তা বুঝতে কারীবের কোনো সমস্যা হলো না। সেটা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে গেলো না সে। বাইকটা কিভাবে স্টার্ট করা যা, তা ভাবতে থাকলো। আশে-পাশে কোনো মেকানিক পাওয়া যে যাবে না, সেটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নাই। আবার বাইকে উঠলো কারীব। সেল্ফ স্টার্ট বাটন চাপলো কয়েকবার। বাইক স্টার্ট হলো না। পা দিয়ে কিকের পর কিক মারতে থাকলো। বাইক স্টার্ট হলো না। বিরক্ত হয়ে বাইক থেকে আবার নেমে আসলো। 
পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করলো। কল করলো বন্ধু নাযীরকে। সে কল রিসিভ করে বলল, ‘এই শালা বাইনচোত, এতো রাইতে কল করছোত কীলিগা?’
জবাবে কারীব বলল, ‘আরে শুয়ার, তরে আমি কইলাম, আমার লগে আয়। আইলি না। আমার বাইক হঠাৎ বন্ধ হইগেছে। এখন আমি কী করতাম?’
কারীব আর নাযীরের বন্ধুত্বটা এমনই। ওরা মোবাইল ফোনে কথা বলতে শুরু করলে, অশ্লীল শব্দ প্রয়োগে গালাগালি করে শুরু করে। নাযীর বাইক চালানোতে এক্সপার্ট। প্রাথমিক কোনো সমস্যা হলে তাৎক্ষণিকভাবে ঠিকও করে ফেলতে পারে। সে সাথে আসলে কারীবকে এখন সমস্যায় পড়তে হতো না। চোখের পলকে সে এই সমস্যা ঠিক করে ফেলতো।
নাযীর বলল, ‘বাইক বন্ধ হইগেছে মানে? কী হইছে বল দেখি।’
বিস্তারিত বলল কারীব। সবশুনে নাযীর বলল, ‘এইটা কোনো সমস্যা না। দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালাইছোস তাই প্লাগ জ্যাম করছে। প্লাগ খুইলা একটু মুইছা লাগাইদে। দেখ, স্টার্ট নিয়া নিবো।’
বন্ধুর সাথে কথা শেষ করলো কারীব। আবার একবার এদিক ওদিক তাকালো। দূরে একটা গাড়ি আসতে দেখা দেখতে পেলো। গাড়িটার অবয়ব দেখে মনে হলো, পুলিশের গাড়ি। কী সর্বনাশ! গাড়িটা যদি পুলিশের হয়, তাহলে তো কারীবকে একটা হেনস্তার শিকার হতে হয় কি না, কে জানে? কারীবের বাইকের সব ডকুমেন্টস অবশ্য সাথেই আছে, সবকিছু আপডেটও আছে। ডকুমেন্টস চেক করে পুলিশ ওর কোনো সমস্যা করতে পারবে না। কিন্তু ভোগান্তি কপালে থাকলে, একটা না একটা সোর্স বের করে, একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়বে। তেমন ঝামেলার সম্মুখীন হওয়ার অভিজ্ঞতাও আছে কারীবের।
গাড়িটাকে বেশি গুরুত্ব দিলো না কারীব। ইঞ্জিনের কাছে বসলো। টুল বক্স থেকে প্রয়োজনীয় টুলস বের করে নিলো। সেই গাড়িটা এসে রাস্তার বিপরীত পাশে দাঁড়ালো বলে মনে হলো। কারীব এবারো গুরুত্ব দিলো না। নিজের কাজ করে যেতে থাকলো। বন্ধুর পরামর্শ অনুযায়ী বাইকের প্লাগ খুলতে লাগলো। 
‘কী সমস্যা, বাইকের কি তেল শেষ?’
প্লাগ খোলা বন্ধ করলো কারীব। ভ্রু-কুঁচকালো। ওর পেছনে নারীকন্ঠ। কোনো কথা না বলে চুপচাপ দাঁড়ালো কারীব। সামনে দাঁড়িয়ে আছে সুন্দরী এক পুলিশ অফিসার। এমনিতেই পুলিশের ঝামেলা থেকে কারীব সব সময় দূরে থাকতে চেষ্টা করে, তার উপর এই অফিসার আবার মেয়ে। কী বিষয় নিয়ে কোন প্যাঁচ যে মারে, তা চিন্তাও করতে পারছে না কারীব। অবশ্য মেয়েটা কিন্তু সুন্দরী। বয়সে কারীবের চেয়ে ছোটই হতে পারে। কিংবা সম বয়সী হতে পারে। লম্বাচওড়া আর আকর্ষণীয় শারীরিক গঠন। আকর্ষণীয় গঠনের শরীরে পুলিশ ইউনিফর্ম চমৎকার মানিয়েছে। মেয়েটার শরীরের সাথে মানানসই সুডৌল স্তন যুগল, ইউনিফর্মটাকে বুকের উপর ফুলিয়ে রেখেছে। মেয়েটার বুকের দিকেই তাকালো কারীব। বুকের বাম ডান পাশে ছোট্ট ন্যামপ্লেট দেখলো। দুই অক্ষরের ছোট্ট একটা নাম- নূমা।
প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে, ছেলেটাকে বুকের দিকে তাকাতে দেখে, কিছুটা ইতস্তত করলো নূমা। ইউনিফর্মের সবচেয়ে উপরের বোতামটা খোলা। অজান্তেই সেখানে নূমার হাতটা চলে গেলো। কলারের দুই প্রান্ত টেনে এক জায়গায় নিয়ে আসার চেষ্টা করলো। 
কারীব বলল, ‘কোনো সমস্যা, নূমা ম্যাম?’
ওহ্ আচ্ছা, ছেলেটা তাহলে বুকের দিকে তাকিয়ে ছিল, নামটা জানার জন্য। নাম জানার উদ্দেশ্যে ছেলেটা আসলে যে, নূমার বুকের সৌন্দর্য্যও দেখতে তাকিয়ে ছিল, তা নূমা ভালো করেই জানে। ব্যাপারটা নূমাও আর গুরুত্ব দিতে গেলো না। ওর প্রশ্নের জবাবে, ছেলেটাকে পালটা প্রশ্ন করতে শুনে, নূমা বলল, ‘প্রশ্নটা কিন্তু আমিই করেছি- কী সমস্যা, বাইকের তেল শেষ?’
‘তেল আছে, ম্যাম…’
কারীবকে কথা শেষ করতে দিলো না নূমা। বলল, ‘ম্যাম নয়, স্যার।’
‘ওহ্ স্যরি, স্যার।’ বলল কারীব, ‘তেল শেষ নয়। প্লাগ জ্যাম করেছে।’
‘লাইসেন্স দেখি।’
‘প্লাগের আবার লাইসেন্স কোথায় পাবো, ম্যাম… স্যরি… স্যার?’
ছেলেটার কথা শুনে প্রায় হেঁসেই ফেলেছিল নূমা। শেষ মুহূর্তে হাসিটাকে আটকালো সে। কীসের লাইসেন্স সে দেখতে চেয়েছে, ছেলেটা তা ভালোভাবেই বুঝেছে। আসলে মেয়ে অফিসার পেয়ে ত্যাঁদড়ামি করছে। নূমা বলল, ‘ফাইজলামি হচ্ছে? পুলিশের সাথে ফাইজলামি করলে একেবারে…’ বাক্যটা শেষ করলো না নূমা। সেটা ছেড়ে দিলো। বলল, ‘প্লাগের না, আমি আপনার লাইসেন্স দেখতে চেয়েছি।’
‘সেটা প্রথমে বললেই হতো।’ পকেট থেকে ওয়ালেট বের করলো কারীব। ওয়ালেট থেকে নিজের ড্রাইভিং লাইসেন্স বের করলো। বাড়ালো নূমার দিকে। বলল, ‘এমনভাবে লাইসেন্স দেখতে চাইলেন, আমি তো ভেবেছি- আপনি বোধহয় প্লাগের লাইসেন্স দেখতে চাইছেন।’
‘অপ্রয়োজনীয় কথা বলার প্রয়োজন দেখছি না।’ কারীবের হাত থেকে লাইসেন্সটা নিলো। উল্টিপাল্টিয়ে দেখলো। লাইসেন্স ঠিকই আছে। ফেরৎ দিলো। বলল, ‘বাইকের অন্যান্য ডকুমেন্টস বের করেন।’
সব ডকুমেন্টস দেখালো কারীব। সবকিছুই ঠিক আছে। কোনো ফল্টই খুঁজে পেলো না নূমা। বলল, ‘এতো রাতে ব্রিজের উপর কী করছেন আপনি?’
‘ঐ তো, প্লাগ জ্যাম করেছে, সেটা ঠিকঠাক করার চেষ্টা করছি।’
‘আবার ফাইজলামি হচ্ছে!’ বলল নূমা, ‘বাসা কোথায় আপনার?’
‘শান্তিনগর।’
‘কোথায়?’
‘শান্তিনগর।’
‘কোথায় শান্তিনগর আর কোথায় আমীন বাজার- আপনি এতরাতে এখানে কী করছেন?’
‘ব্যাক্তিগত কাজে, আজ আমি ঢাকার বাহিরে গিয়েছিলাম, ম্যাম… স্যরি… স্যার।’
‘ঢাকার বাহিরে কোথায়?’
‘আমার গ্রামের বাড়ি।’
‘গ্রামের বাড়ি কোথায়?’
গ্রামের বাড়ি কোথায়, গ্রামের নাম কি- সব বলল কারীব। 
নূমা বলল, ‘গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরতে এতো রাত হলো কেন?’
‘বাড়িতে কাজে গিয়েছিলাম, কাজ শেষ করে ফিরতে রাত হয়ে গেছে।’
এবার কারীবকে আপাদমস্তক দেখলো নূমা। দেখতে ছেলেটা বেশ সুদর্শন। নূমা নিজেই অনেক লম্বা একটা মেয়ে। নিজেকে তবু ছেলেটার কাঁধ পর্যন্ত লম্বা মনে হলো। পরনের টি-শার্ট, জিন্স বেশ মানিয়েছে। বয়স অনুমান করে নূমা বুঝতে পারলো, ছেলেটা ওর সমবয়সী হবে, অথবা দুই এক বছরের বড় হতে পারে। এক নজর দেখে নিয়ে নূমা বলল, ‘বাইকে কি সত্যিই সমস্যা?’
‘সত্যই সমস্যা, ম্যাম… স্যরি… স্যার।’
নিজের গাড়ির দিকে তাকালো নূমা। ড্রাইভারকে ডাকলো, ‘মতিন!’
‘আসছি, স্যার!’
গাড়ি থেকে নেমে, নূমার পাশে এসে দাঁড়ালো ড্রাইভার মতিন। নূমা বলল, ‘বাইকটা চেক করো তো, কী সমস্যা?’
মতিন গিয়ে বাইকে বসলো। সেল্ফ স্টার্ট বাটন চাপলো কয়েকবার। বাইক স্টার্ট নিলো না। পা দিয়ে কিক মারলো কয়েকবার। এবারো বাইক স্টার্ট নিলো না। নেমে আসলো বাইক থেকে। বলল, ‘সমস্যা, স্যার।’
‘এখন কি ঠিক করা যাবে?’
‘মনে হয় না, স্যার। আপনি বললে, আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি।’
‘দেখো।’
মতিন অনেক ভাবেই চেষ্টা করলো। প্লাগ খুললো। মোছামুছি করলো। আবার লাগালো। বাইক স্টার্ট করার চেষ্টা করলো। কিছুতেই বাইক স্টার্ট নিলো না। অন্যান্য খুটখাট, টুকটাক করলো। কিছুতেই কিছু হলো না। ফিরে আসলো। বলল, ‘এখানে হবে না, স্যার।’
‘ঠিক আছে, এক কাজ করো। বাইকটা আমাদের পিকআপ ভ্যানের সাথে বাঁধো।‘ কারীবের দিকে তাকালো নূমা, ‘আপনি আমাদের পিকআপ ভ্যানে উঠুন।’
‘ধন্যবাদ, ম্যাম… স্যরি… স্যার।’ বলল কারীব, ‘লিফট দিতে হবে না। দেখি, সিএনজি পাই কি না। কিংবা বাইক নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো ভ্যান পাই কি না।’
‘এক্সকিউজ মি, আপনাকে আমি লিফট দিচ্ছি না,হ্যাঁ? আপনাকে আমি থানায় নিয়ে যাচ্ছি।’
এই ভয়টায় পাচ্ছিলো কারীব। এই মেয়ে ওকে একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে। সে বলল, ‘কেন ঝামেলা করছেন, বলেন তো? থানায় আবার কেন যেতে হবে?’
‘থানায় নিয়ে আপনাকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করবো।’ বলল নূমা, ‘যদি সন্তোষজনক জবাব পাই, ছেড়ে দেবো। অন্যথায় কোর্টে চালান করবো যান ভ্যানে উঠুন।’
ড্রাইভার মতিন অন্য একজন কনস্টেবলের সহযোগিতায় ততক্ষণে, কারীবের বাইক পিকআপ ভ্যানের সাথে বেঁধেছে। কারীবের আর কোনো কথায় শুনলো না নূমা। ওকে পিকআপ ভ্যানে তুলেই ছাড়লো। চুপচাপ গিয়ে পিকআপ ভ্যানে উঠে বসলো কারীব। ওর বাইক কন্ট্রোল করতে থাকলো একজন কনস্টেবল। পিকআপ চলতে শুরু করলো। কেউ খেয়াল করলো না, নূমা মাথা নিচু করে, মিটমিট করে হাসছে।
বাইক আর কারীবকে নিয়ে নূমা একেবারে নিজের থানায় চলে আসলো। কারীব আশ্চর্য্য না হয়ে পারলো না। সেই আমীনবাজার থেকে নূমা ওকে নিজের থানায় কেন নিয়ে আসলো? সে তো ওকে লোকাল থানায় হ্যান্ড ওভার করতে পারতো। নূমার পিছুপিছু থানায় প্রবেশ করে, কারীব বুঝতে পারলো, নূমা এই থানার অফিসার-ইন-চার্জ। কারীবকে সে আমীন বাজার থেকে তুলে এনেছে। আমীন বাজার তো ওর থানার আওতাধীন নয়। ব্যাপারটা এখনো বোধগম্য হচ্ছে না কারীবের।

পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন.......

মন্তব্যসমূহ