বিদেশে কর্মী প্রেরণ: অশনিসংকেত না কি নতুন পথের সন্ধান?
রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক কর্মীর বৈদেশিক কর্মসংস্থান দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। দেশের প্রধান প্রধান শ্রমবাজারগুলোতে কর্মী পাঠানো উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় অভিবাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দ্রুত সঠিক পদক্ষেপ না নিলে জনশক্তি রপ্তানি খাতে ধস নামতে পারে। কালের কণ্ঠে প্রকাশিত সংবাদটির গভীর বিশ্লেষণ এবং এর বহুমাত্রিক তাৎপর্য নিয়েই এই আলোচনা।
শ্রমবাজারে অশনিসংকেত: পরিসংখ্যান কী বলছে?
বিদেশের শ্রমবাজার সঙ্কুচিত হওয়ার যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা পরিসংখ্যানে স্পষ্ট। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (BMET) তথ্য অনুসারে, চলতি বছর (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর) ৯ মাসে বিদেশে বাংলাদেশি কর্মী গেছেন মোট ৮ লাখ ১৩ হাজার ৬৪ জন। আপাতদৃষ্টিতে এই সংখ্যা বিশাল মনে হলেও, এটি কিন্তু অতীতের রেকর্ড ভেঙে দেওয়া বছরগুলোর তুলনায় কম।
০১। ২০২৩ সালের একই সময়ে কর্মী গিয়েছিলেন ৯ লাখ ৮৯ হাজার ৬৮৫ জন। অর্থাৎ, চলতি বছর কর্মী রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৭.৮৫ শতাংশ।
০২। ২০২২ সালের একই সময়ে কর্মী গিয়েছিলেন ৮ লাখ ৭৪ হাজার ৭৩৯ জন। সেই তুলনায়ও এ বছর কর্মী পাঠানো কমেছে ৭.৫ শতাংশ।
এই পতন স্পষ্টতই জানান দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাজার ক্রমাগত সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা, বিভিন্ন দেশে সৃষ্ট জটিলতা এবং অভ্যন্তরীণ কিছু দুর্বলতা এই পতনের জন্য দায়ী। অভিবাসন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে রেমিট্যান্স প্রবাহেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বন্ধ দরজা এবং নির্ভরতার বোঝা
বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চারটি শ্রমবাজারের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), মালয়েশিয়া ও ওমান। এর মধ্যে বর্তমানে সৌদি আরব ছাড়া অন্য তিনটি দেশে কর্মী পাঠানো সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরেরও বেশি সময়েও এই বন্ধ থাকা বাজারগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি। এই বিশাল সংখ্যক বাজার বন্ধ থাকায় স্বাভাবিকভাবেই কর্মী পাঠানোর হার কমে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সমস্ত নির্ভরতা এখন গিয়ে পড়েছে সৌদি আরবের ওপর। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে যে ৮ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন, তার মধ্যে প্রায় ৬৭.৭ শতাংশ বা ৫ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৭ জন গেছেন শুধুমাত্র সৌদি আরবে। একক বাজারের ওপর এমন অতি-নির্ভরতা ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
সৌদিতে 'তাকামুল' জটিলতা: সুযোগ নাকি ভোগান্তি?
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবেও নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে সব পেশার কর্মীর জন্য একটি দক্ষতা পরীক্ষা পাসের সনদ, যার নাম 'তাকামুল', বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই সনদ ছাড়া কর্মীরা এখন সৌদি আরবে যেতে পারছেন না।
যদিও দক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ প্রশংসনীয়, কিন্তু সাধারণ কর্মী বা ক্লিনারদের জন্যও এই সনদ বাধ্যতামূলক করায় ভোগান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। কর্মীদের এই পরীক্ষার জন্য অতিরিক্ত ৫০ ডলার (প্রায় ৬,১০০ টাকা) ব্যয় করতে হচ্ছে। পাশাপাশি অ্যাপয়েন্টমেন্টসহ দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, যা তাদের জন্য আর্থিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। জনশক্তি রপ্তানিকারকরা বলছেন, এই নিয়ম কেবল দক্ষ কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট করে বাকিদের জন্য সহজ করা উচিত। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অবশ্য এটিকে পুরোপুরি সৌদি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেছেন।
এছাড়া, কর্মীরা সৌদি আরবে গিয়েও আকামা (রেসিডেন্সি পারমিট), চাকরি এবং বেতন সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় পড়ছেন বলে অভিযোগ করেছেন। এই চ্যালেঞ্জগুলো প্রমাণ করে, শুধুমাত্র ভিসা পেলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, বরং কর্মীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
সংকট থেকে উত্তরণের পথ: প্রয়োজন কূটনৈতিক তৎপরতা
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতের এই দুরবস্থার জন্য অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার, আইন লঙ্ঘন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দক্ষ কর্মীর অভাব—এই কারণগুলোকেই দায়ী করছেন অভিবাসনসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের মতে, শ্রমবাজারকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে ডেডিকেটেড লোক দিয়ে:
১. গবেষণা: কোথায় কোথায় নতুন শ্রমবাজার খোলা যাবে, তা নিয়ে গবেষণা করা জরুরি।
২. কূটনৈতিক তৎপরতা: বন্ধ থাকা দেশগুলোর (যেমন: ইউএই, মালয়েশিয়া) সঙ্গে দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে বাজারগুলো উন্মুক্ত করা প্রয়োজন।
৩. উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ: এই জাতীয় সংকটে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
এছাড়া, আগামী পাঁচ বছরে জাপানে এক লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে গঠিত 'জাপান সেল'-এর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ইউরোপের বাজারে দূতাবাস না থাকার কারণে যে সমস্যাগুলো সৃষ্টি হচ্ছে, সেদিকেও মনোযোগ দেওয়া আবশ্যক।
পরিবর্তনের আহ্বান
বৈদেশিক শ্রমবাজারের এই 'অশনিসংকেত' একটি সতর্কবার্তা। এটি কেবল কর্মী কম যাওয়ার পরিসংখ্যান নয়, এটি দেশের অর্থনীতিতে নেমে আসা একটি ছায়া। এই মুহূর্তে সরকারের উচিত শুধুমাত্র পুরনো বাজারগুলো পুনরায় চালু করার দিকে নজর না দিয়ে, বরং দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরির ওপর জোর দেওয়া। সৌদি আরবের 'তাকামুল' সনদকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে না দেখে বরং একে একটি গুণগত পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে। দক্ষতা বৃদ্ধি পেলে কর্মীপ্রতি আয় বাড়বে এবং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ আরো শক্তিশালী হবে। নীতিনির্ধারকদের দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপই পারে এই সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে এবং বাংলাদেশের জনশক্তি খাতকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যেতে।

মন্তব্যসমূহ