বিশ্বজুড়ে কমছে বাংলাদেশের পাসপোর্টের 'শক্তি': কারণ ও প্রভাব বিশ্লেষণ



সম্প্রতি প্রকাশিত গ্লোবাল পাসপোর্ট র‍্যাঙ্কিং (হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স, অক্টোবর ২০২৫-এর তথ্য অনুসারে) অনুযায়ী বাংলাদেশি পাসপোর্টের অবস্থানে অবনতি ঘটেছে, যা দেশের নাগরিকদের আন্তর্জাতিক চলাচলের স্বাধীনতার ওপর প্রশ্ন তুলেছে। একসময় কিছু দেশ যেখানে ভিসা ছাড়াই প্রবেশের সুযোগ দিত, সেখানেও এখন কঠোরতা বাড়ছে। এই ঘটনাটি শুধু একটি র‍্যাঙ্কিংয়ে স্থান পরিবর্তন নয়, বরং বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের ভাবমূর্তি এবং দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি প্রতিফলন।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশের পাসপোর্টের বর্তমান পরিস্থিতি নিম্নরূপ:

বিশ্ব র‍্যাঙ্কিং (সর্বশেষ)

১০০তম স্থানে অবস্থান করছে। (কিছু সূচকে ৯৭তম স্থান থেকে ৩ ধাপ অবনতি)

ভিসা-মুক্ত বা ভিসা-অন-অ্যারাইভাল গন্তব্যের সংখ্যা

প্রায় ৩৮ থেকে ৪০টি দেশে ভিসা-মুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল ভিসায় প্রবেশাধিকার।

যৌথ অবস্থান

এই র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ উত্তর কোরিয়া, লিবিয়া বা ফিলিস্তিনি অঞ্চলের মতো দেশগুলোর সাথে স্থান ভাগ করে নিয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতি

দক্ষিণ এশিয়ায় মালদ্বীপ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ভুটানের নিচে অবস্থান করলেও নেপাল ও পাকিস্তানের চেয়ে সামান্য এগিয়ে রয়েছে।

এই তথ্যগুলো থেকে স্পষ্ট যে, একজন বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ক্রমেই কঠিন হয়ে আসছে। এটি মূলত পাসপোর্টের ‘গতিশীলতার স্কোর’ (Mobility Score) হ্রাসের ফল, যা বিশ্বব্যাপী ভিসা ছাড়াই বা সহজে প্রবেশের সুযোগের ওপর নির্ভর করে।

বিশ্লেষণ: গ্রহণযোগ্যতা হ্রাসের মূল কারণ কী?

র‍্যাঙ্কিংয়ে এই অবনতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় দিকই রয়েছে। তবে মূল কারণ হিসেবে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, তা হলো:

১. ভিসার অপব্যবহার ও অবৈধ অভিবাসন:

 * এই বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি যে কারণটি তুলে ধরা হয়েছে, তা হলো ভ্রমণ ভিসার অপব্যবহার। অনেক বাংলাদেশি পর্যটন বা অন্য স্বল্পমেয়াদী ভিসায় বিদেশে গিয়ে অবৈধভাবে কাজ করতে শুরু করেন এবং অতিরিক্ত সময় অবস্থান করেন।

 * কেউ কেউ আবার ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ হিসেবে স্বল্প-ভিসার দেশ ব্যবহার করে অবৈধভাবে তৃতীয় কোনো দেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন।

 * এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের নাগরিকদের সামগ্রিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২. কঠোর ভিসা নীতি ও যাচাই-বাছাই:

 * পাসপোর্ট অপব্যবহারের ফলস্বরূপ, অনেক দেশ এখন বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ায় কঠোর যাচাই-বাছাই চালাচ্ছে।

 * যেসব দেশে একসময় সহজে ভিসা পাওয়া যেত, এমনকি ভিসা-মুক্ত প্রবেশের সুযোগ ছিল, সেসব দেশেও এখন ভিসা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

 * সংবাদ সূত্রে জানা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও বিমানবন্দরগুলোতে বাংলাদেশি যাত্রীদের অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশির মুখে পড়তে হচ্ছে।

৩. কূটনৈতিক সম্পর্কের দুর্বলতা:

 * পাসপোর্টের শক্তি একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অন্যান্য দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের গভীরতার ওপরও নির্ভর করে।

 * শক্তিশালী কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে ভিসা-মুক্ত চুক্তির সংখ্যা বৃদ্ধি করা সম্ভব, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নয় বলে প্রতীয়মান হয়।

আমাদের করণীয়: ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের পথ

বাংলাদেশের পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের জন্য জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

১. দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণ: বিদেশে ভ্রমণকারী প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের উচিত সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও ভিসার শর্তাবলী মেনে চলা। ভিসার অপব্যবহার বন্ধ করতে পারলে দেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা ফিরবে।

২. সরকারি উদ্যোগ: সরকারকে অবশ্যই পররাষ্ট্রনীতিতে গতি আনতে হবে। নতুন নতুন দেশের সাথে ভিসা সহজীকরণ বা ভিসা-মুক্ত প্রবেশের চুক্তি করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। একই সাথে, পাসপোর্ট অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৩. সচেতনতা বৃদ্ধি: সরকার ও সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর উচিত প্রবাসে ভ্রমণের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে দেশের নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা।

একটি পাসপোর্টের শক্তি কোনো দেশের **'সফট পাওয়ারে'**র একটি প্রতীক। বাংলাদেশি পাসপোর্টের এই অবনতি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে দেশের মর্যাদা ধরে রাখতে এবং নাগরিকদের জন্য বিশ্ব ভ্রমণের সুযোগ বাড়াতে সরকার ও সাধারণ নাগরিক—উভয়কেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কেবলমাত্র পাসপোর্টের র‍্যাঙ্কিং নয়, বরং আমাদের আচরণ ও নীতির মাধ্যমেই আমরা বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারি।

মন্তব্যসমূহ