দিল্লিতে তালিবানি ছায়া: নারী সাংবাদিক বর্জন বিতর্কে ভারত সরকারের নীরবতা



কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা নাকি নীতিগত পরাজয়? দিল্লিতে নারী সাংবাদিক বর্জনের ঘটনায় কেন নীরব মোদি সরকার?

সম্প্রতি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির একটি সংবাদ সম্মেলন ঘিরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ভারতের বিদেশনীতির দ্বিধা এবং নারী অধিকারের প্রশ্নে সরকারের অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে আফগান মন্ত্রী যখন প্রকাশ্যে নারী সাংবাদিকদের বর্জন করে একটি সংবাদ সম্মেলন করলেন, তখন নজিরবিহীনভাবে নীরব রইল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

যা ঘটেছিল সেদিন

ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর নয়াদিল্লির আফগান দূতাবাসে ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। খবর অনুযায়ী, সেখানে বেছে বেছে কেবল পুরুষ সাংবাদিকদেরই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সংবাদ সংগ্রহের জন্য যেসব নারী সাংবাদিক সেখানে পৌঁছেছিলেন, তাঁদের দূতাবাস প্রাঙ্গণে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। স্পষ্টতই, এটি ছিল তালেবানের সেই নারীবিদ্বেষী নীতির নির্লজ্জ অনুসরণ, যা আফগানিস্তানে নারীদের স্বাধীনতা ও পেশাগত জীবন কেড়ে নিয়েছে।

তালেবানের এই “নারীবর্জন নীতি” সরাসরি ভারতের মাটিতে প্রয়োগ করা হলো, যা দেশের নারী সাংবাদিকদের জন্য চরম অপমানজনক। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের জন্ম দেয় ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়া।

সাংবাদিকদের ক্ষোভ ও রাজনৈতিক আক্রমণ

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই ভারতের সাংবাদিক মহল এবং বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা তীব্র প্রতিবাদে সরব হন।

সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়া:

 * সুহাসিনী হায়দার (দ্য হিন্দু) এক্স (পূর্বে টুইটার)-এ সমালোচনা করে লেখেন, “তাঁরা ভারত সরকারের অতিথি, অথচ এ দেশে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তাঁদের জঘন্য বেআইনি নারীবৈষম্য নীতি প্রয়োগের অনুমতি দেওয়া হলো। তালেবান তাদের নারীবিদ্বেষ নীতি ভারতেও টেনে আনল। এটা বাস্তববাদিতা নয়, আত্মসমর্পণ।”

 * সাংবাদিক স্মিতা শর্মা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, যেখানে ভারত নারীদের সাফল্যে গর্ব বোধ করে, সেখানে মুত্তাকিকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে, অথচ আফগান নারীদের দুর্দশা নিয়ে যৌথ বিবৃতিতে একটি শব্দও নেই।

 * অনেক সাংবাদিক পুরুষ সহকর্মীদের ভূমিকারও সমালোচনা করেন। তাঁদের মতে, প্রতিবাদ হিসেবে পুরুষ সাংবাদিকদেরও ওই সংবাদ সম্মেলন বর্জন করা উচিত ছিল।

বিরোধী রাজনৈতিক দলের আক্রমণ:

বিরোধী দলগুলো সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের মেরুদণ্ডহীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

 * কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করতে চেয়েছেন। তিনি প্রশ্ন করেন, “আপনার নারী অধিকারের স্বীকৃতি সুবিধাজনকভাবে এক নির্বাচন থেকে আরেক নির্বাচন পর্যন্ত বিস্তৃত না হলে দেশের সবচেয়ে যোগ্য নারীদের এই অপমান কীভাবে ঘটতে দেওয়া হলো?”

 * তৃণমূল কংগ্রেসের মহুয়া মৈত্র কেন্দ্রকে “মেরুদণ্ডহীনতার” তকমা দিয়ে লেখেন, নারী-বর্জিত সংবাদ সম্মেলনের অনুমতি দিয়ে সরকার দেশের প্রত্যেক নারীর সম্মানহানি ঘটিয়েছে।

 * প্রবীণ কংগ্রেস নেতা পি চিদাম্বরম ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা স্বীকার করেও এই “আদিম রীতিনীতির প্রতি আত্মসমর্পণ”-এ হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, এর প্রতিবাদে পুরুষ সাংবাদিকদের সংবাদ সম্মেলন বর্জন করা উচিত ছিল।

সরকারের নীরবতা: কূটনীতির নামে আপস?

এই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীরবতা। ঘটনার পর সমালোচনার মুখে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুধু জানায় যে ওই সংবাদ সম্মেলনে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। কিন্তু তারা কেন আফগান সরকারের এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাল না বা নিন্দা করল না—এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দেয়নি।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারত এখনো তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও কাবুলে ভারতীয় দূতাবাস পুরোপুরি চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, আফগানিস্তানে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ বজায় রাখতে দিল্লি হয়তো তালেবানের নীতির বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো অবস্থান নিতে চাইছে না।

তবে এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা যখন দেশের মৌলিক মূল্যবোধ, বিশেষ করে নারী অধিকারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তখন মোদি সরকার কোনটিকে বেছে নিচ্ছে। একটি উদীয়মান বিশ্বশক্তি হিসেবে, যারা বিশ্ব মঞ্চে নারী অধিকার এবং গণতন্ত্রের কথা বলে, তাদের নিজেদের মাটিতে এমন বৈষম্যমূলক আচরণ মেনে নেওয়াটা নিঃসন্দেহে একটি নীতিগত পরাজয়।

এই ঘটনা কেবল কয়েকটি নারী সাংবাদিকের অসম্মান নয়, বরং এটি ভারতের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল মূল্যবোধের ওপর এক তালিবানি ছায়া। কূটনীতিতে স্বার্থসিদ্ধি জরুরি, কিন্তু মূল্যবোধের বিনিময়ে সেই স্বার্থ কতটুকু গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল।

মন্তব্যসমূহ