নারী ও নির্বাচন: ইসির সংলাপে ধ্বনিত হলো যে কঠিন প্রশ্নগুলি
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ধারাবাহিক সংলাপের দিকে এখন দেশের মনোযোগ। কিন্তু সম্প্রতি নারীনেত্রী ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ইসির সংলাপে যে বিষয়গুলি উঠে এসেছে, তা কেবল সুষ্ঠু নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক সমাজে নারীর অংশগ্রহণের গভীর সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে। এই সংলাপে উত্থাপিত দাবি ও পরামর্শগুলি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, আগামী নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে হলে ইসিকে কতটা কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে।
১। কেন প্রার্থী হতে পারবেন না নারীবিদ্বেষীরা?
সংলাপের সবচেয়ে জোরালো এবং তাৎপর্যপূর্ণ দাবিগুলির মধ্যে অন্যতম হলো, কোনো নারীবিদ্বেষী, সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীরা যাতে নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারেন, সেই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে সচেতন ভূমিকা নিতে হবে।
নারীনেত্রীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনের সময় 'মব ভায়োলেন্স' বা দলবদ্ধ সহিংসতা নারী ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে ভয় পাইয়ে দেয়। বেসরকারি সংস্থা 'নিজেরা করি'-এর সমন্বয়কারী খুশী কবিরের কথায়, ভোটকেন্দ্রে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করতে পারলে নারী ভোটাররা ভোট দিতে আসবেন না। মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের প্রতি বিদ্বেষী প্রচার-প্রচারণা এবং হুমকির বিষয়টিও তুলে ধরেন।
আসলে, নারীর প্রতি সহিংসতা বা বিদ্বেষকে শুধু সামাজিক সমস্যা হিসেবে না দেখে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করার এই দাবিটি ছিল ইসির প্রতি একটি সরাসরি চ্যালেঞ্জ।
২। কাঠামোগত পরিবর্তন: সংরক্ষিত আসন নয়, সরাসরি নির্বাচন চাই
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম কেবল নারীবিদ্বেষীদের প্রার্থী হতে না দেওয়ার দাবি তোলেননি, তিনি নারী প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের ক্ষেত্রেও সচেতনতার আহ্বান জানান।
তবে, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক নির্বাচনে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আরও বড় কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, জনসংখ্যার সঙ্গে সমন্বয় করে সংসদীয় আসন ৬০০টি করা হোক। এর মধ্যে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় যেন একটি সাধারণ আসন এবং নারীদের জন্য একটি সরাসরি নির্বাচিত সংরক্ষিত আসন থাকে। অর্থাৎ, তিনি সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নের বদলে সরাসরি নির্বাচনের দাবি জানান। একই সঙ্গে নির্বাচনী ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রার্থীরা অতিরিক্ত ব্যয় করলেও যেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেই বিষয়ে ইসিকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান।
৩। সিইসি’র অঙ্গীকার: শেষ সুযোগ এবং বার্তা পরিবর্তন
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন তাঁর বক্তব্যে আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য করাকে দেশের জন্য কিছু করতে পারার 'শেষ সুযোগ' হিসেবে উল্লেখ করেন। একটি 'বিশেষ ধরনের সরকারের অধীনে' নির্বাচনে যেতে হচ্ছে—এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে তিনি সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেন।
তবে, সিইসির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি ছিল নির্বাচনী কার্যক্রমে যুক্ত কর্মকর্তাদের জন্য। তিনি স্পষ্ট সতর্ক করে দেন যে, এখনকার বার্তা হলো: 'কারও পক্ষে কাজ করলে অ্যাকশন হবে'। অতীতে বার্তাটি ছিল উল্টো ('আমার পক্ষে কাজ না করলে অ্যাকশন হবে')। তবে, তিনি এ-ও স্বীকার করেন যে, প্রায় ১০ লাখ ভোট গ্রহণ কর্মকর্তার মধ্যে দলীয় সংশ্লিষ্টতার কারণে সবাইকে বাদ দিতে গেলে 'লোম বাছতে গিয়ে কম্বল উজাড়' হতে পারে। এরপরও তিনি 'জেন্ডার ফ্রেন্ডলি' নির্বাচন এবং নারী ভোটারদের নিরাপদ ভোট নিশ্চিত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
৪। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সতর্কবাণী: পেশীশক্তি ও আস্থার সংকট
নারীনেত্রীদের পাশাপাশি নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা ইসির সামনে কালোটাকা ও পেশীশক্তি ব্যবহারের চ্যালেঞ্জগুলি তুলে ধরেন:
* অবৈধ অস্ত্রের ভয়: সাবেক ইসি সচিব মো. জকরিয়া অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার এবং সীমান্ত পথে যেন অবৈধ অস্ত্র ও অর্থ প্রবেশ করতে না পারে, সেই বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
* কর্মকর্তা নিয়োগে সতর্কতা: তিনি ইসির বাইরের জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে দূরে রাখার পরামর্শ দেন।
* আস্থার অভাব: ইসির সাবেক কর্মকর্তা মেজবাহউদ্দিন আহমদ মনে করেন, জনগণ এখনো নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা আনতে পারছে না।
* ক্ষমতা বৃদ্ধি: আরেক সাবেক কর্মকর্তা মিহির সারোয়ার মোর্শেদ ভোটের দিন অনিয়মের ঘটনায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্বাচন কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
নির্বাচন কমিশনের সংলাপে নারীনেত্রী ও বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে যে কঠিন বাস্তবতা এবং সাহসী প্রস্তাবনাগুলি উঠে এলো, তা আগামী নির্বাচনের পথকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। কালোটাকা, পেশিশক্তি, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব এবং নারীবিদ্বেষ—এই চারটি প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করলে একটি 'জেন্ডার ফ্রেন্ডলি' বা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব নয়। এখন দেখার বিষয়, সিইসি তাঁর 'শেষ সুযোগ' কাজে লাগিয়ে সংলাপে প্রাপ্ত এই মূল্যবান পরামর্শগুলি কতটা বাস্তবে রূপ দিতে পারেন। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিতের জন্য এই সংস্কারগুলিই হতে পারে প্রথম ধাপ।

মন্তব্যসমূহ