দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে যুগান্তকারী উদ্ভাবন: নিউরালিংকের প্রতিদ্বন্দ্বীর ‘কৃত্রিম চোখ’!

আপনার চোখের সামনে থাকা বইটি বা প্রিয়জনের মুখ হঠাৎ ঝাপসা হয়ে এলে জীবনটা কেমন হতে পারে? ম্যাকুলার ডিজেনারেশন (Age-related Macular Degeneration - AMD)-এর মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের কাছে এটিই কঠিন বাস্তবতা। এই রোগ প্রবীণদের মধ্যে কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি হারানোর অন্যতম প্রধান কারণ এবং এর ফলে দৈনিক জীবনযাপন হয়ে ওঠে দুরূহ। কিন্তু এখন, সেই অন্ধকার জীবনে আলো ফেরার এক নতুন এবং যুগান্তকারী আশা দেখিয়েছে একটি বিশেষ প্রযুক্তি।

​এলন মাস্কের নিউরালিংক (Neuralink)-এর নাম আপনারা অনেকেই শুনেছেন, যারা সরাসরি মস্তিষ্কে চিপ ইমপ্ল্যান্ট করে মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো বা রোগ নিরাময়ের জন্য কাজ করছে। এবার তাদেরই এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী, 'সায়েন্স কর্পোরেশন' (Science Corporation) নামের একটি স্টার্টআপ দাবি করেছে, তারা এমন একটি ডিভাইস তৈরি করেছে যা কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি হারানো মানুষকে আবার সীমিত হলেও দেখতে সাহায্য করতে পারে। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে ‘আর্টিফিশিয়াল ভিশন’ বা কৃত্রিম দৃষ্টি

​AMD: কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি হারানোর নীরব ঘাতক

​Age-related Macular Degeneration বা AMD সাধারণত ৫৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে দৃষ্টিশক্তি হারানোর সবচেয়ে সাধারণ কারণ। এই রোগে রেটিনার কেন্দ্রে অবস্থিত সংবেদনশীল অংশ ম্যাকুলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ম্যাকুলা কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তির জন্য দায়ী, যা আমাদের সূক্ষ্ম কাজ (যেমন পড়া, সেলাই করা, মানুষের মুখ চেনা, গাড়ি চালানো) করার জন্য অপরিহার্য। এই রোগের মূলত দুটি প্রকারভেদ রয়েছে: শুষ্ক (Dry) AMD (যা ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি কমায়) এবং আর্দ্র (Wet) AMD (যা দ্রুত দৃষ্টিশক্তি হ্রাস করে)। ঐতিহ্যগতভাবে, চিকিৎসকরা এএমডি রোগকে কেবল ছড়িয়ে পড়া থেকে থামাতে পারতেন, কিন্তু একবার হারানো দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা অসম্ভব বলে মনে করা হতো। 'প্রিমা' প্রযুক্তি সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়েছে।

​'প্রিমা' প্রযুক্তিটি কীভাবে কাজ করে? (একটি ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেইস - BCI)

​সায়েন্স কর্পোরেশনের এই যুগান্তকারী উদ্ভাবনটি একটি জটিল প্রক্রিয়াকে খুব সহজভাবে সম্পন্ন করে। পুরো সিস্টেমটির নাম 'প্রিমা' (Prima), যা একটি ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেইস (BCI) হিসেবে কাজ করে। এই সিস্টেমে মূলত দুটি প্রধান ও অবিচ্ছেদ্য অংশ রয়েছে:

  1. ক্যামেরা-সহ বিশেষ চশমা: রোগী এক জোড়া বিশেষ চশমা পরেন, যাতে একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র ক্যামেরা লাগানো থাকে। এই ক্যামেরা বাইরের দৃশ্যটি ডিজিটাল ডেটা হিসেবে ধারণ করে। এটি এক অর্থে রোগীর জন্য নতুন চোখ হিসেবে কাজ করে।
  2. সাবরেটিনাল মাইক্রোচিপ ইমপ্ল্যান্ট: একটি অত্যন্ত ছোট, কয়েক মিলিমিটার আকারের চিপ রোগীর চোখের রেটিনার ঠিক নিচে অস্ত্রোপচার করে বসানো হয়। এই চিপটি রেটিনার ক্ষতিগ্রস্ত ম্যাকুলাকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সের সাথে যোগাযোগ স্থাপনে সাহায্য করে।

যোগাযোগ প্রক্রিয়া:

​চশমার ক্যামেরা বাইরের দৃশ্যটিকে ডিজিটাল সংকেতে রূপান্তরিত করে। এরপর সেই সংকেতগুলো ওয়্যারলেস বা তারবিহীন উপায়ে (সম্ভবত রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে) সরাসরি রেটিনার নিচে বসানো চিপটিতে পাঠানো হয়। চিপটি তখন সেই অপটিক্যাল সংকেতগুলোকে স্নায়ু সংকেতে রূপান্তর করে মস্তিষ্কে পাঠিয়ে দেয়। এর ফলে রোগী আংশিকভাবে হলেও কৃত্রিম দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান। সহজ কথায়, এই প্রযুক্তি ক্ষতিগ্রস্ত রেটিনাকে পাশ কাটিয়ে কৃত্রিমভাবে চোখ ও মস্তিষ্কের মধ্যে একটি নতুন এবং কার্যকরী যোগাযোগ স্থাপন করে দেয়।

​পরীক্ষার ফল ও অভূতপূর্ব সাফল্য

​ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদন এবং 'নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন' (New England Journal of Medicine)-এ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, এই প্রযুক্তির ক্লিনিকাল ট্রায়াল অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে।

​১২ মাস ধরে মোট ৩৮ জন এএমডি রোগীর ওপর এই ক্লিনিকাল ট্রায়াল চালানো হয়। এই পরীক্ষায় দেখা গেছে, ব্যবহারকারীদের ৮০ শতাংশেরও বেশি রোগী 'ক্লিনিক্যালি মিনিংফুল ইমপ্রুভমেন্ট' বা অর্থপূর্ণ উন্নতি পেয়েছেন। এই রোগীরা কেবল লেখা পড়তেই নয়, ক্রসওয়ার্ডের মতো কঠিন ধাঁধাও সমাধান করতে সক্ষম হয়েছেন। এই উন্নতি তাদের দৈনন্দিন জীবনে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন এনেছে, যা জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করেছে।

​'সায়েন্স কর্পোরেশন'-এর সিইও ম্যাক হোডাক এই সাফল্যকে 'যুগান্তকারী' বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, এটি অসহায় রোগীদের মধ্যে আশা জাগায় এবং তাদের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বদলে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।

​নৈতিক প্রশ্ন ও দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ

​যদিও এই উদ্ভাবন একটি বিশাল সাফল্য, তবুও কিছু নৈতিক ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ থেকে যায়। প্রথমত, চিপ ইমপ্ল্যান্টের সার্জিক্যাল প্রক্রিয়া ঝুঁকিমুক্ত নয়। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন। কৃত্রিম দৃষ্টি সম্পূর্ণরূপে স্বাভাবিক দৃষ্টির মতো নয়; এটি মূলত পিক্সেলযুক্ত চিত্র তৈরি করে, যা রোগীকে আলোর প্যাটার্ন এবং বস্তুর রূপরেখা চিনতে সাহায্য করে। তবুও, যারা সম্পূর্ণরূপে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, তাদের জন্য এই সামান্য কৃত্রিম দৃষ্টিও জীবন বদলে দিতে পারে।

​দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে এই অর্জন নিঃসন্দেহে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল এবং এটি প্রমাণ করে যে মানুষের মস্তিষ্কের সক্ষমতা এবং প্রযুক্তির সীমাহীন সম্ভাবনা এখনও আবিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছে।

এই বিষয়ট নিয়ে আপনার মতামত কিংবা চিন্তাভাবনা কমেন্টে লিখে জানান।

মন্তব্যসমূহ