গভীর সংকটে দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ: লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান এখন ঝুঁকির মুখে!



দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য খাত বর্তমানে এক কঠিন এবং শ্বাসরুদ্ধকর সময় পার করছে। উচ্চ সুদের হার, লাগামহীন ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং জনগণের কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা—সব মিলিয়ে দেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা চরম উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বিনিয়োগ তো দূরের কথা, চলমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই যেন এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর ফলস্বরূপ, হাজার হাজার মানুষ কাজ হারাচ্ছেন এবং দেশে বেকারত্ব দিন দিন বাড়ছে।

অর্থনীতির মূল সমস্যাগুলি কী?

বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে একাধিক কারণকে দায়ী করা হচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়েছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে:

 * উচ্চ ব্যয় ও কম চাহিদা: উচ্চ সুদের হার এবং ডলারের চড়া দামের কারণে শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি কমে গেছে। অন্যদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পণ্যের চাহিদাও কমেছে।

 * আস্থাহীনতা: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।

 * বিনিয়োগে স্থবিরতা: উদ্যোক্তারা এখন নতুন ব্যবসা বা উদ্যোগে বিনিয়োগ করা তো দূরের কথা, ব্যবসা প্রসারের দিকেও মনোযোগ দিতে পারছেন না।

এই স্থবিরতার কারণে রাজস্ব আয়ে যেমন প্রভাব পড়ছে, তেমনি একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ায় লাখো মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছেন।

বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ: ২২ বছরের সর্বনিম্ন স্তর

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন দেশের অর্থনীতির নাজুক পরিস্থিতিকে সামনে এনেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী:

 * ২২ বছরের সর্বনিম্ন: বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি, উভয়ই গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে।

 * রেকর্ড খেলাপি ঋণ: ব্যাংকিং খাতে ঋণখেলাপির হার রেকর্ড ২৪.১ শতাংশে পৌঁছেছে।

 * রপ্তানি ও কর: রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারা থাকলেও গত দুই মাস ধরে তা কমছে। অন্যদিকে, কর-জিডিপি অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.৮ শতাংশে।

 * মূল কারণ: বিশ্বব্যাংক মনে করছে, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি হারানোর প্রধান কারণ।

উদ্যোক্তার চোখে বর্তমান পরিস্থিতি

দেশের ব্যবসায়ীরা ক্রমাগত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। অনেকে তাদের ব্যবসার বর্তমান অবস্থাকে 'আইসিইউতে থাকা রোগীর' সঙ্গে তুলনা করছেন—যে কোনোমতে টিকে আছে।

 * ৫০% সক্ষমতায় চলছে ব্যবসা: উদ্যোক্তারা বলছেন, তাঁরা চলমান ব্যবসারও অন্তত ৫০ শতাংশ কম সক্ষমতায় কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

 * সরকারের নীরবতা: ব্যবসায়ীদের প্রধান অভিযোগ, সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের সংকট নিয়ে কোনো আলোচনা বা সমাধানের আশ্বাস নেই। এমনকি সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তাঁদের সঙ্গে আলাপও করা হয়নি।

 * হয়রানি: অনেক ব্যবসায়ীকে হয়রানি করা হচ্ছে, শিল্প-কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে রাখার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বেতন-ভাতা দিতে পারছে না। অনেক উদ্যোক্তা মামলা-হামলার শিকার হয়ে অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন, যা তাঁদের বিদেশে বিনিয়োগ বৈঠকে অংশ নেওয়া থেকেও বিরত রাখছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুল হাই সরকারের মতে, নীতিনির্ধারকরা ব্যবসা-বাণিজ্যের বাস্তব সমস্যাগুলো বুঝতে পারছেন না, যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কেমন আছেন, সেই বিষয়টি দেখেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।

অন্যদিকে, নিট পোশাক রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তা ফজলুল হকের মতে, সরকার সম্ভবত এই সংকট নিয়ে বসাকে প্রয়োজন মনে করছে না এবং তাঁর আশঙ্কা নতুন সরকার না আসা পর্যন্ত এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের আর কোনো আশা নেই।

ভবিষ্যতের পথ কী?

অর্থনীতির এই 'আইসিইউ' অবস্থা থেকে বের হতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা জরুরি। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের দ্রুত কার্যকর আলোচনায় বসা প্রয়োজন, যাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়। অন্যথায়, এই অর্থনৈতিক স্থবিরতা হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর আরও বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

মন্তব্যসমূহ