গাজার যুদ্ধবিরতি কি সত্যিই টিকবে? মূল বাধা কি হামাসের অস্ত্রভান্ডার?



গাজায় দুই বছরের ভয়াবহ সংঘাতের পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত যুদ্ধবিরতির আলো দেখা দিয়েছে। ইসরায়েল এবং গাজার শাসক গোষ্ঠী হামাস চুক্তির প্রাথমিক ধাপে রাজি হয়েছে, যা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে বহু মানুষ। কিন্তু শান্তি আলোচনা টেবিলে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই সামনে চলে এসেছে সেই কঠিন প্রশ্নটি, যা এই পুরো প্রচেষ্টাকে ভেস্তে দিতে পারে: হামাস কি তাদের অস্ত্র সমর্পণ করতে রাজি হবে?

এই মুহূর্তে ইসরায়েলের মূল দাবি হলো, গাজায় যুদ্ধ থামাতে হলে হামাসকে কেবল যুদ্ধ থামিয়ে বসলেই চলবে না—তাদের সব অস্ত্র জমা দিতে হবে, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে হবে এবং নিজেদের একটি সংগঠন হিসেবে পুরোপুরি বিলুপ্ত করতে হবে। এক কথায়, ইসরায়েল চায় হামাসের সামরিক ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের সম্পূর্ণ অবসান।

প্রকাশ্যে 'না', গোপনে আলোচনা

স্বাভাবিকভাবেই, হামাস প্রকাশ্যে এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু পর্দার আড়ালে ছবিটা একটু অন্যরকম। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (ECFR) বিশেষজ্ঞ হিউ লোভ্যাটের মতো বিশ্লেষকেরা বলছেন, হামাসের অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে।

হামাসের কর্মকর্তারা গোপনে মধ্যস্থতাকারীদের জানিয়েছেন যে তাঁরা হয়তো কিছু আক্রমণাত্মক অস্ত্র ছাড়ার প্রক্রিয়ায় রাজি হতে পারেন।

তবে এই ছাড়ের মানে কখনোই ছোট ও হালকা অস্ত্রের সম্পূর্ণ সমর্পণ নয়। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের (ICG) গবেষক আজমি কেশাওয়ীর মতে, হামাস কেবল তখনই তাদের ছোট অস্ত্র ছাড়বে, যখন ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসান হবে এবং একটি নতুন ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেবে। এর আগে নয়। আর দশকের পর দশক ধরে তৈরি হওয়া টানেল নেটওয়ার্কের মানচিত্র হস্তান্তরের তো প্রশ্নই আসে না।

অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রশ্ন এবং ক্ষমতার শূন্যতা

এই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গাজার মানুষের নিরাপত্তা উদ্বেগ।

গাজার অনেক ফিলিস্তিনি মনে করেন, হামাসের হাতে কিছু সামরিক ক্ষমতা থাকতেই হবে। কেন? কারণ, যুদ্ধের ফলে যদি গাজায় ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, তবে কিছু কুখ্যাত গ্যাং আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। ইসরায়েল-ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশ্লেষক তাগরিদ খোদারি এই বিষয়ে জোর দিয়ে বলেছেন যে ইসরায়েলই অতীতে কিছু গ্যাংকে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছে। তাঁর মতে, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য হামাসের সামরিক দক্ষতা গাজার মানুষের কাছে অপরিহার্য।

আসলে, শান্তি আলোচনায় হামাসের অস্ত্রভান্ডার নিয়ে মতৈক্য না হলে যুদ্ধবিরতি যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে। বিশ্লেষকদের ভয়, এমন পরিস্থিতিতে গাজায় আবারও ইসরায়েলের বড় আকারের অভিযান শুরু হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

হামাস নিছক সংগঠন নয়, একটি 'ধারণা'

ইসরায়েল হয়তো দাবি করে যে তাদের যুদ্ধের লক্ষ্য হামাসকে ধ্বংস করা। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই লক্ষ্য পূরণ অসম্ভব।

আইসিজির গবেষক কেশাওয়ী বলেন, হামাসকে পুরোপুরি পরাজিত করা যাবে না। তাঁর মতে, এটি নিছক একটি সংগঠন নয়, বরং প্রতিরোধের প্রতীকী রূপ—এটি একটি 'ধারণা'। আগামী বছরগুলোতে প্রতিশোধপরায়ণ হাজার হাজার তরুণ এই ধারণার প্রতি আকৃষ্ট হবে।

এই সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণতি তাই নির্ভর করছে পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবং অন্যান্য পশ্চিমা নেতারা ইসরায়েলকে কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন এবং ইসরায়েলি দাবিগুলোকে কতটা সীমিত করে আনতে পারেন।

যদি পশ্চিমা বিশ্ব ইসরায়েলের এই দাবিতে সায় দেয় যে দখলদারিত্ব অবসানের আগেই হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করতে হবে, তবে তা অসলো চুক্তির মতো আরও একটি ব্যর্থতার অজুহাত তৈরি করবে। আপাতত, এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্বের জন্য আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে আলোচনার টেবিলে হামাসের অস্ত্রভান্ডার নিয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে তার দিকে।

মন্তব্যসমূহ