বাংলাদেশ পুলিশের সংস্কার: চ্যালেঞ্জ, করণীয় ও 'আমার লোক' ব্যাধি

ব্যাঙেরছাতা

প্রথম আলো ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার কল্যাণ সমিতি কর্তৃক আয়োজিত 'বাংলাদেশ পুলিশের সংস্কার: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকটি ছিল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচনা, যা পুলিশ বাহিনীর দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি নিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে স্পষ্ট মতামত তুলে ধরেছে। রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বর্তমান ও সাবেক আইজিপি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা, টিআইবির নির্বাহী পরিচালকসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন। প্রকাশিত সংবাদগুলো বিশ্লেষণ করলে পুলিশের সংস্কারে মূল চ্যালেঞ্জ, করণীয় এবং এই বাহিনীর ওপর বহুকাল ধরে চেপে বসা 'রাজনৈতিকীকরণের' ব্যাধিটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

রাজনীতির চক্রব্যূহ ও আইজিপির স্বীকারোক্তি

গোলটেবিলের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল পুলিশের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের তীব্রতা। পুলিশ প্রধান (আইজিপি) বাহারুল আলম তাঁর এক বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে যে মন্তব্যটি করেছেন, তা একদিকে যেমন হতাশার, তেমনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পুলিশের অবস্থানের এক করুণ চিত্র: “আমাকে মাঝে মধ্যে শুনতে হয়, 'উনি কী আমাদের লোক?'”। আইজিপির মতো শীর্ষ পদে থাকা একজন কর্মকর্তার এমন স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে, পুলিশ এখনো একটি 'কার্যনির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত' স্বাধীন জায়গায় যেতে পারেনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি যে ঘৃণা ও ক্রোধ সঞ্চারিত হয়েছিল, যার কারণে পুলিশ সদস্যদের থানা ছেড়ে পালাতে হয়েছিল, আইজিপি সেটিকে অতীতের ১৫ বছরের 'অপব্যবহারের' ফল হিসেবে আত্ম-অনুসন্ধানের আহ্বান জানান।

সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা এই সমস্যাটিকে আরও গভীরে নিয়ে গিয়ে বলেন, 'আওয়ামী পুলিশ, বিএনপি পুলিশ'—এই ধরনের তকমা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তিনি তাঁর পেশাজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জানান, সৌজন্য সাক্ষাতে গেলেও তাঁকে শুনতে হয়েছে, 'এ কি আমাদের?'। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতিতে রাজনৈতিক বা আঞ্চলিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ধরনের মনোভাব থেকে বের হতে না পারলে পুলিশের পেশাদারি মনোভাব ফেরানো কঠিন।

'আমার লোক, তোমার লোক'—মূল ব্যাধি

ব্যাঙেরছাতা

বৈঠকের আলোচনায় অংশগ্রহণ করে আসিফ নজরুল এই সমস্যার নাম দিয়েছে—'আমার লোক, তোমার লোক' সংস্কৃতি। তার বক্তব্য, এই ব্যাধি শুধু আওয়ামী লীগের নয়, বিএনপি, জামায়াতসহ ছোট দলগুলোর মধ্যেও রয়েছে। সম্প্রতি দুই পুলিশ কর্মকর্তার বদলি নিয়ে প্রধান দুই দল থেকে তাঁর কাছে ফোন আসার উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, ক্ষমতায় যেই থাকুক না কেন, রাজনৈতিক দলগুলো পুলিশকে নিজেদের 'অঙ্গসংগঠন'-এর মতো ব্যবহার করতে চায়।

সে মনে করে, এই সংস্কৃতি বাংলাদেশে প্রথম আওয়ামী লীগ আমলেই শুরু হয়েছিল এবং বাকিরা তা শুধু অনুসরণ করেছে। পুলিশকে রাজনৈতিক দলের স্বার্থ পূরণে ব্যবহার করা বন্ধ করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি বৃহত্তর মতৈক্য তৈরি হওয়া জরুরি।

সংস্কারের পথে প্রধান অন্তরায় ও করণীয়

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিকের ওপর আলোকপাত করেন: গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংস্কার নিশ্চিত না হলে চলমান পুলিশ সংস্কার উদ্যোগ অর্জিত হবে না। তিনি বলেন, গোয়েন্দা সংস্থা, অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা এবং নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার ছাড়া কোনো ধরনের সংস্কারই সম্ভব নয়। তিনি নিয়োগ, পদোন্নতি, মামলা-বাণিজ্য, গ্রেপ্তার ও জামিন-বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রশাসনে চলমান দলীয় প্রভাব বিস্তারের সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

ব্যাঙেরছাতা

তবে কেবল রাজনৈতিক প্রভাবই নয়, পুলিশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাও সংস্কারের পথে বড় বাধা। ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, নতুন পোশাকের চেয়েও জরুরি হচ্ছে পুলিশের বাসস্থান ও কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ উন্নয়ন। মিরপুরের একটি পুলিশ ব্যারাকের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে ২০০ কর্মীর জন্য একটি বাথরুম এবং ৬০ স্কয়ার ফিটের একটি ঘরে ২০ জন ঘুমায়। এই অমানবিক পরিবেশে কর্মরত সদস্যদের কাছ থেকে পেশাদার আচরণ আশা করা যায় না।

এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কারের মূল দিকগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন: 

পুলিশের নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করার জন্য রাজনৈতিক মতৈক্যের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন বা স্বায়ত্তশাসিত পুলিশ কমিশন প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করণ: 

পুলিশকে রাজনৈতিক ও কার্যনির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত করে একটি স্বাধীন কাঠামোয় নিয়ে যাওয়া।

পেশাগত পরিবেশের উন্নয়ন: 

পুলিশ সদস্যদের বাসস্থান, কর্মপরিবেশ ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা।

গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কার: 

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

মানসিকতার পরিবর্তন: 

কেবল কাঠামোগত পরিবর্তন নয়, পুলিশ সদস্যদের মানসিক পরিবর্তনও জরুরি, যাতে তাঁরা ক্ষমতার অপব্যবহার না করে জনগণের বন্ধু হতে পারেন।

আশার আলো: আচরণের পরিবর্তন

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুলিশের আচরণের যে পরিবর্তন দেখেছেন, তা আশার সঞ্চার করে। তিনি বলেন, "অন্ততপক্ষে গত এক বছরে পুলিশকে দেখছি আমরা অনেক কমফোর্টেবল একটা জায়গা থেকে। আমাদের রেসপেক্ট হচ্ছে।" ফ্রিলি কমপ্লেন দিতে পারার এই সুযোগ প্রমাণ করে, রাজনৈতিক চাপমুক্ত থাকলে পুলিশ তার পেশাদারিত্বের পথে ফিরতে পারে।

ব্যাঙেরছাতা

পুলিশ সংস্কার কেবল একটি প্রশাসনিক বা আইনি বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যতক্ষণ না পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলো পুলিশকে নিজেদের দলীয় লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহারের মানসিকতা পরিহার করবে এবং একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশনের অধীনে তাদের কাজের স্বাধীনতা দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সত্যিকারের পেশাদার পুলিশ বাহিনী গঠন করা সম্ভব হবে না। এই গোলটেবিল বৈঠক একটি অত্যন্ত জরুরি আলোচনার সূত্রপাত করেছে, যেখানে দেশের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা একমত হয়েছেন যে, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন পুলিশই কেবল পারে জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে।

মন্তব্যসমূহ