পরাশক্তির ঘূর্ণাবর্তে বাংলাদেশ: স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির সন্ধানে একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের সাক্ষী। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যদিকে চীনের উত্থান, এই দুই পরাশক্তির মধ্যেকার প্রতিযোগিতা এখন 'নতুন স্নায়ুযুদ্ধ' (New Cold War) নামে পরিচিত। এই জটিল প্রেক্ষাপটে, ভৌগোলিকভাবে কৌশলগত অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ আজ এক কঠিন পরীক্ষার মুখে। পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তার ও আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকিতে থাকার বিষয়টি সম্প্রতি ঢাকায় দক্ষিণ কোরিয়ার দূতাবাসের আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে বিশ্লেষকেরা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
মূলত, এই সেমিনারের নির্যাস এবং অন্যান্য বিশ্লেষণে একটি কথাই বারবার উঠে এসেছে—নিজের স্বার্থের নিরিখে বাংলাদেশকে এখন বাস্তবসম্মত প্রস্তুতি নিতে হবে এবং ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা অপরিহার্য। এই আর্টিকেল সেই ঝুঁকিগুলো বিশ্লেষণ করবে এবং বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা করবে।
পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের উত্থান
ঢাকায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেন—বাংলাদেশ বড় শক্তিগুলোর রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে পড়তে পারে এবং আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপড়েন নতুন কিছু নয়, কিন্তু এর স্বরূপ বদলে গেছে। এটি এখন কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শনে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও আদর্শের ক্ষেত্রেও প্রসারিত।
প্রথমত, বাণিজ্যের ওপর ভূ-রাজনীতির আঘাত:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী বহুপক্ষীয় নিয়মভিত্তিক বাণিজ্যব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে, যার প্রধান কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য বা শুল্কযুদ্ধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'শুল্কযুদ্ধ' বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ওলট-পালট করে দিয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা শুধু পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক দাম দিয়ে বাজারে টিকে থাকতে পারছেন না। এই অস্থিরতা বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন (Supply Chain) বিঘ্নিত করছে, কাঁচামালের দাম বাড়াচ্ছে এবং বাংলাদেশের মতো রফতানিনির্ভর অর্থনীতিকে দ্বিমুখী চাপে ফেলছে।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ:
হুমায়ূন কবিরের মতে, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের উত্থান হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত—সবাই এখন জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন করছে, যার প্রতিফলন দেখা যায় পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপে। বিশ্ববাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বহুপাক্ষিকতা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। এই প্রেক্ষাপটে, অর্থনীতিবিদরা বাংলাদেশের শিল্পকে সহজ পণ্য উৎপাদন থেকে সরে এসে জটিল ও উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনে জোর দিতে পরামর্শ দিয়েছেন।
কৌশলগত অবস্থান: আশীর্বাদ না অভিশাপ?
দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরের কেন্দ্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান একে বৈশ্বিক শক্তিসমূহের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এ কারণে, বাংলাদেশ এখন ২১ শতকের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কার্যত একটি অংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবস্থান একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দুয়ার খুলতে পারে (যেমন: আঞ্চলিক 'কানেক্টিভিটি হাব' হওয়া), তেমনি অন্যদিকে এটি আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি:
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বড় শক্তিগুলো প্রায়শই ছোট দেশগুলোকে বাগে আনতে তিনটি পরিস্থিতি তৈরি করে—১) নিরাপত্তা উদ্বেগ, ২) গণতান্ত্রিক পরিবেশের সংকট, এবং ৩) অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা। বাংলাদেশের মতো দেশ এখন সম্ভবত সেই পরিস্থিতির শিকার। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির যুক্তরাষ্ট্র–চীন শুল্কযুদ্ধের পাশাপাশি ভারত–পাকিস্তান ও পাকিস্তান–আফগানিস্তান সম্ভাব্য সংঘাতের মতো আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রসঙ্গ টেনেছেন।
প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা:
সেমিনারে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পারভেজ করিম আব্বাসী মার্কিন সিনেটে কণ্ঠভোটে পাস হওয়া 'থিংক টোয়াইস অ্যাক্ট' প্রসঙ্গে আলোচনা করেন। এই আইনের লক্ষ্য হলো তৃতীয় দেশগুলোকে চীন থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র কেনা থেকে নিরুৎসাহিত করা এবং মার্কিন অস্ত্রের বিক্রি বাড়ানো। এই প্রেক্ষাপটে, সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে একটি কঠিন পছন্দের মুখোমুখি হতে হবে। অধ্যাপক আব্বাসীর মতে, ঢাকা-সিউল সেমিকন্ডাক্টর এবং প্রতিরক্ষায় একসঙ্গে কাজ করে এই নতুন সমীকরণের জন্য কোরিয়াকে বিকল্প উৎস হিসেবে দেখতে পারে। এই সামরিক প্রতিযোগিতা আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা: জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তি
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দর কষাকষির সক্ষমতা নির্ভর করে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তির ওপর। সেমিনারে বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দেন যে, বিভাজনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দেশের স্থিতিশীলতা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হতে পারে। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবিরের জোর দিয়ে বলেন,
"সারা বিশ্ব বাংলাদেশের সংস্কারপ্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই চায়, বাংলাদেশ একটি উদার ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হোক। গণতান্ত্রিক রূপান্তর কতটা সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তার ওপর দেশের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে।"
অর্থাৎ, বহির্বিশ্বের চাপ মোকাবিলা করার জন্য বাংলাদেশকে তার অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী করতে হবে। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা বা রাজনৈতিক অস্থিরতা ভূ-রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোর অর্থনৈতিক সূচক, যেমন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, তারল্য সংকট এবং খেলাপি ঋণের বোঝা—এগুলো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করছে। এই অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলো দ্রুত সমাধান না হলে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হবে।
উত্তরণের পথে: ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বকেন্দ্রিক কূটনীতি
ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা যখন চরমে, তখন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো একটি স্বচ্ছ, স্বার্থসচেতন এবং সাহসী কূটনীতি পরিচালনা করা।
স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি (Multi-Vector Diplomacy):
কোনো একক শক্তি বা ব্লকের প্রতি অতি-নির্ভরশীল না হয়ে প্রতিটি সম্পর্ককে জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, মাতারবাড়ীর গভীর সমুদ্র বন্দরের মতো প্রকল্পে বহুজাতিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সংযোগের এক নিরপেক্ষ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ:
২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা (GSP) হারানোর যে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা মোকাবিলায় দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সাথে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (PTA) এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত করতে হবে। অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ এবং অ্যাডভান্সড টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, অ্যাগ্রো-প্রসেসিং, মেডিকেল ডিভাইস এবং আইটি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাই এখন জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
দক্ষিণ কোরিয়ার অংশীদারিত্বের গুরুত্ব:
দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ অংশীদার (দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করেছে)। কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত পার্ক ইয়ং-সিক বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন। চলমান CEPA (Comprehensive Economic Partnership Agreement) আলোচনা দুই দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের জন্য একটি মাইলফলক হতে পারে। এই অংশীদারিত্ব প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে (যেমন সেমিকন্ডাক্টর) বাংলাদেশের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করতে পারে।
পরাশক্তির প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য একটি অভিশাপ নয়, বরং এটি দূরদর্শী কূটনীতির মাধ্যমে আশীর্বাদে রূপান্তরিত হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন আবেগের পরিবর্তে বাস্তবতাভিত্তিক কৌশলগত স্বার্থ দ্বারা চালিত পররাষ্ট্রনীতি। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, সুশাসন এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি থেকেই মুক্ত থাকতে পারবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হবে। এই চ্যালেঞ্জের মুখে, বাংলাদেশের নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপই ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণ করবে।

মন্তব্যসমূহ