ক্ষমতায় আসার আগেই “সরকার”! – এমন আত্মবিশ্বাসের “উৎস” কোথায়?

ব্যাঙেরছাতা

গতকাল (১০ নভেম্বর, ২০২৫) দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত একটি খবর বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে: "নারীরা ঘরে সময় দিলে, সম্মানিত করবে সরকার: জামায়াত আমির"। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের এই মন্তব্য শুধু একটি দলের নীতিগত বক্তব্য নয়, বরং এটি দেশের রাজনীতিতে এক গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষত, যে দলের ক্ষমতায় আসার কোনো 'নিশ্চিত' সম্ভাবনা আপাতত দৃশ্যমান নয়, সেই দলের প্রধান কীভাবে এত সহজে নিজেদেরকে 'সরকার' হিসেবে তুলে ধরছেন, এবং নারীদের কর্মসংস্থান ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এমন স্পষ্ট, যেন ক্ষমতা তাদের হাতেই – এমন দৃঢ় ঘোষণা দিচ্ছেন, সেই প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।

এই মন্তব্যটি আপাতদৃষ্টিতে নারীদের 'সম্মানিত' করার একটি প্রতিশ্রুতি মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে দুটি মৌলিক প্রশ্ন: প্রথমত, এই দলটির ক্ষমতার 'নিশ্চয়তা'র উৎস কী? এবং দ্বিতীয়ত, ক্ষমতায় আসার আগেই তাদের মানসিকতার স্বরূপ উন্মোচন কি হয়ে যাচ্ছে?

'সরকার' হিসেবে নিজেদেরকে তুলে ধরার স্পর্ধা: নিশ্চয়তার উৎস কোথায়?

জামায়াত আমীরের বক্তব্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো— "নারীরা ঘরে সময় দিলে, সরকার সেসব নারীকে সম্মানিত করবে।" একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান যখন তার সম্ভাব্য নির্বাচনী ইশতেহারের অংশ তুলে ধরেন, তখন তিনি সাধারণত বলেন, "আমরা ক্ষমতায় এলে..." বা "আমাদের দল নির্বাচিত হলে..."। কিন্তু এখানে সরাসরি 'সরকার' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এই ব্যবহারটি কেবল কথার ভুল বা অসতর্কতা হতে পারে না; এটি এক বিশেষ মানসিকতার প্রতিফলন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের ঘোষণা হয় অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের লক্ষণ, যা পর্দার আড়ালে কোনো বৃহত্তর রাজনৈতিক বোঝাপড়া বা 'ডিল' এর ইঙ্গিত দেয়; অথবা এটি নিছকই এক আকাশকুসুম কল্পনা, যা দলের কর্মী ও সমর্থকদের মনোবল চাঙ্গা রাখার একটি কৌশল।

রাজনৈতিক 'ডিল'-এর সম্ভাবনা: 

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, জামায়াতের মতো একটি বিতর্কিত দল কীভাবে মূলধারার রাজনীতিতে এতটা সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদি পর্দার অন্তরালে এমন কোনো 'অদৃশ্য সমঝোতা' থেকে থাকে, যেখানে ক্ষমতা ভাগাভাগির বা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, তবেই হয়তো আমীর এমন দৃঢ়তার সাথে নিজেকে 'সরকার' হিসেবে ঘোষণা করার স্পর্ধা পেতে পারেন। এই নিশ্চয়তাটি হতে পারে কোনো ভবিষ্যৎ জোটের বা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখা: 

অন্যদিকে, এটি হতে পারে বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থায় নিজেদের অস্তিত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণের একটি প্রচেষ্টা। 'আমরাই আসছি'—এমন বার্তা দিয়ে কর্মীদের উজ্জীবিত রাখা এবং ভোটারদের মনে একটি নিশ্চয়তা সৃষ্টি করার লক্ষ্য থাকতে পারে।

তবে, যেভাবেই দেখা হোক না কেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিজেদেরকে ক্ষমতাধর হিসেবে ঘোষণা করার এই প্রবণতা এক গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন এবং এটি এক ধরনের আস্ফালন, যা জনগণের সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ক্ষমতায় আসার আগেই স্বরূপ উন্মোচন: নারীদের কর্মসংস্থান বনাম 'সম্মান'

এই ঘোষণার দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বিতর্কিত দিকটি হলো নারীদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তাদের নীতিগত অবস্থান। জামায়াত আমীর বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য আট ঘণ্টার বদলে পাঁচ ঘণ্টা কাজ করার বিধান করা হবে এবং কোনো কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকার তিন ঘণ্টার ভর্তুকি দেবে। এর থেকেও বড় বিষয়, কর্মক্ষেত্রে না গিয়ে নারীরা ঘরে সময় দিলে, সরকার তাদের 'সম্মানিত' করবে।

এই ঘোষণা নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের অবস্থানের ক্ষেত্রে এক পিছিয়ে পড়া মানসিকতার পরিচয় বহন করে।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করার ইঙ্গিত: 

একজন নারী যখন শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন, তখন তিনি কেবল অর্থ উপার্জনের জন্যই আসেন না; তিনি আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরশীলতা এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগ খোঁজেন। 'ঘরে থাকার জন্য সম্মান' বা 'পাঁচ ঘণ্টার কর্মঘণ্টা'র প্রস্তাবনাটি পরোক্ষভাবে এই অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে খর্ব করার একটি চেষ্টা। নারীকে 'ঘরের লক্ষ্মী' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে তাদের বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকা থেকে দূরে সরিয়ে রাখার একটি ইঙ্গিত এতে স্পষ্ট।

'সম্মান' বনাম অধিকার: 

'সম্মানিত করা'র এই ধারণাটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। আধুনিক রাষ্ট্র নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে সম্মান নিশ্চিত করে। কিন্তু এখানে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বা ভর্তুকিকে 'ঘরে থাকার পুরস্কার' হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যা নারীর অধিকারকে দয়ায় পরিণত করে। এর মাধ্যমে নারীর কর্মক্ষেত্রের উপস্থিতি এবং অর্জিত স্বাধীনতাকে এক প্রকার অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে।

সমাজের বিপরীতমুখী যাত্রা:

বিশ্ব যখন নারীর ক্ষমতায়ন এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের উপস্থিতি বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছে, তখন এই ধরনের বিবৃতি সমাজকে এক বিপরীতমুখী যাত্রার দিকে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর। এই দল ক্ষমতায় এলে কর্মজীবী নারীরা কতটা চাপের মুখে পড়বেন এবং তাদের পেশাগত জীবন কতটা সংকুচিত হবে, সেই আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে।

জামায়াত আমীরের মন্তব্যটি কেবল একটি রাজনৈতিক বিবৃতি নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং সমাজের অগ্রগতির দিকনির্দেশনা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে। নিজেদেরকে 'সরকার' হিসেবে ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে তাদের 'নিশ্চয়তার উৎস' নিয়ে যেমন জল্পনা তৈরি হয়েছে, তেমনি নারীর কর্মসংস্থান বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সেই দলের স্বরূপ উন্মোচন করেছে।

একটি দল ক্ষমতায় আসার আগেই যদি নিজেকে 'সরকার' মনে করে এমন দৃঢ়চেতা ঘোষণা দিতে পারে, তবে তারা যদি সত্যিই কোনোদিন ক্ষমতায় আসে, তখন জনগণের, বিশেষত নারীদের, স্বাধীনতা ও অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে – সেই প্রশ্নটি দেশের সচেতন নাগরিকদের মনে গভীরভাবে দাগ কেটে গেল। এটি কেবল নারীবাদের প্রশ্ন নয়, এটি একটি আধুনিক, প্রগতিশীল এবং গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক কাঠামোর প্রশ্ন।

এই বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী? কমেন্ট সেকশনে আপনার মতামত লিখে জানান।

মন্তব্যসমূহ