গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন ফ্যাসিবাদ ও প্রান্তিকতার সংকট

 

ব্যাঙেরছাতা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান (?) বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক। দীর্ঘদিনের শোষণ, অত্যাচার এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সর্বস্তরের মানুষ সেদিন ঐক্যবদ্ধভাবে রাস্তায় নেমেছিল। সেই বিপ্লবের মূল সুর ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং সকলের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে, সেই স্বপ্ন আজ নতুন এক আশঙ্কায় ঢাকা পড়েছে। গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ সম্প্রতি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক কনভেনশনের সমাপনী সেশনে যে বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন, তা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের চরিত্র এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই সরকারের ওপর তিনটি দলের প্রভাব দৃশ্যমান, যার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল— জামায়াতে ইসলামীর— কর্তৃত্ব ও দাপট সবচেয়ে বেশি। আর এই দাপটেই নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এক ধরনের 'মব সন্ত্রাস' ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ, যা আগস্টের পরিবর্তনের মূল লক্ষ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের বিশ্লেষণ: ছদ্মবেশের আড়ালে প্রতারণা

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে ৫ আগস্টের পরিবর্তনের সুযোগে কিছু 'ছদ্মবেশী' গোষ্ঠী হঠাৎ করে আবির্ভূত হয়েছে। যারা আগে ভিন্ন পরিচয়ে ছিল, তারা এখন নতুন মোড়কে হাজির হয়েছে এবং প্রতারণার মাধ্যমে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে। এই গোষ্ঠীগুলি এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে ধর্মীয়, লৈঙ্গিক এবং জাতিগত পরিচয়ের কারণে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। তিনি এই পরিস্থিতিকে আওয়ামী লীগ আমলের ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, 'যারা আক্রমণ করছে, তাদের কথা হচ্ছে তাদের মতো করে ধর্ম পালন করতে হবে, তাদের মতো করে চিন্তা করতে হবে, তাদের রাজনীতিকে গ্রহণ করতে হবে। এটাকে ফ্যাসিবাদ বলে।' তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের সময়ের ফ্যাসিবাদেরই আরও 'ভয়ংকর চেহারা' এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। এর দ্বারা স্পষ্ট যে, ক্ষমতার পালাবদল হলেও ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিনাশ ঘটেনি, বরং তার রূপান্তর ঘটেছে।

জামায়াতের কর্তৃত্ব এবং মব সন্ত্রাসের বৈধতা

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মূল অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর জামায়াত-ই-ইসলামীর প্রভাব। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন যে, এই তিনটি প্রভাবশালী দলের মধ্যে জামায়াতের আওয়াজ ও কর্তৃত্ব বেশি। এই কর্তৃত্বের ফলস্বরূপ, সুফি-সাধক, মাজার ও দরবারে হামলা, নারীর চলাফেরায় আক্রমণ এবং ভিন্নমতের মানুষদের ওপর হামলাকারী 'মব সন্ত্রাসীরা' সরকারের নীরবতা পাচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, সরকার শুধু নীরব থাকছে না, আনু মুহাম্মদের অভিযোগ অনুযায়ী, তারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই মব সন্ত্রাসকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে কিংবা যারা এগুলো করছে, তাদের প্রশ্রয় দিচ্ছে। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব হওয়া উচিত সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব ধরনের উগ্রতাকে দমন করা। কিন্তু যখন সরকারের কণ্ঠস্বর এই সন্ত্রাস দমনে যথেষ্ট জোরালো হয় না, বরং দুর্বল মনে হয়, তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে পরিবর্তনের লক্ষ্য আসলে কী ছিল।

প্রান্তিকতার সংজ্ঞাবদল: ধর্মীয় বিভাজন ও জাতিসত্তার অস্বীকৃতি

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন এবং সুফিবাদ গবেষণা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সুফি মোবারক হোসেন মুরাদের বক্তব্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংকটের একটি নতুন মাত্রা উন্মোচন করেছে। ক্বাফী রতন উল্লেখ করেছেন যে প্রান্তিকতা কেবল সম্পদ বা জাতিসত্তার ভিত্তিতে নয়, এখন নিজ ধর্মের মধ্যেও অনেকে প্রান্তিক হয়ে পড়ছেন। তিনি সরাসরি বলেছেন যে, 'এখন ওহাবি, মওদুদিবাদীদের শাসন চলছে', যার কারণে মুসলমানদের মধ্যে সুফি-সাধক, আধ্যাত্মিক ঘরানার মুসলমানরা আজ প্রান্তিক। শাহপরান (রহ.)-এর মাজার ভাঙার চেষ্টা, বা চিন্তার পার্থক্যের কারণে নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলি চরম ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং আধিপত্যবাদের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। সুফি মোবারক হোসেন মুরাদ প্রশ্ন তুলেছেন, ৫ আগস্টের পর ৬ আগস্ট থেকে কেন মাজার ভাঙা এবং ৭ তারিখ থেকে দরবার লুট শুরু হলো? যারা হাজার কোটি টাকা লুট করেছে, তাদের না ধরে কেন মানবতার কথা বলা সুফিদের ওপর আক্রমণ? এই ঘটনাগুলি পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয় যে, পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে সমাজের প্রগতিশীল ও সহনশীল অংশকে টার্গেট করা হচ্ছে।

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন আরও যুক্তিসঙ্গতভাবে প্রশ্ন তুলেছেন সংবিধানের অন্যান্য জাতিসত্তাকে অস্বীকার করার বিষয়টি নিয়ে। বাংলাদেশকে 'এক জাতির দেশ' বলা ভুল, কারণ সংখ্যা দিয়ে জাতি বিচার করা যায় না। রাষ্ট্র জাতিসত্তাগুলোকে রক্ষার দায়িত্ব পালন করছে না। বাংলাদেশ আদিবাসী ইউনিয়নের নেতা শ্রীকান্ত মাহাতোর বক্তব্য সেই সংকটকেই তুলে ধরে— আদিবাসীদের জমি, ভিটা দখলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান।

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ডাক

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক কনভেনশনটি এই গভীর সংকটের মুখে আশার আলো দেখিয়েছে। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এটিকে 'বাংলাদেশের জন্য একটি সত্যিকার অর্থে প্রতিনিধিত্বমূলক কনভেনশন' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই কনভেনশনে দেশের ৫৫টি জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছিলেন, যা গণতান্ত্রিক ঐক্যের এক শক্তিশালী প্রতীক।

আনু মুহাম্মদ যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা এই সময়ের জন্য অত্যন্ত জরুরি: এই বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সমাবেশকে আরও ঐক্যবদ্ধ করে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে, যেখানে 'প্রান্তিক জনগোষ্ঠী' বলে আলাদা কিছু থাকবে না। বাংলাদেশ সবার সমান সুযোগের দেশ হয়ে উঠবে। চা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের নেতা সবুজ তাঁতী এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের স্ব স্ব এলাকার সংগঠিত হওয়ার আহ্বান প্রমাণ করে যে, এই নতুন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকতে হলে রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

প্রতিশ্রুত গণতন্ত্রের পুনরূদ্ধার

আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান (?) মানুষের মনে যে বিশাল প্রত্যাশা জাগিয়েছিল, তা আজ নতুন শক্তির আধিপত্য, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার মুখে ম্লান হতে চলেছে। অন্তর্বর্তী সরকার যদি এই মব সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয় বা এর বিরুদ্ধে দুর্বল অবস্থান নেয়, তবে তা কেবল আগস্ট বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতাই নয়, দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই বিপন্ন করে তুলবে। এখন সময় এসেছে, সরকার তার অবস্থান পরিষ্কার করুক এবং সেই শক্তিকে রুখে দিক যারা একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদের মাধ্যমে দমন করতে চায়। সকল জাতি, ধর্ম ও মতের মানুষের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই পারে প্রতিশ্রুত গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে।

মন্তব্যসমূহ