নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগে প্রচার: বৈধতা এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ

ব্যাঙেরছাতা

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ বা স্থানীয় সরকার নির্বাচন এলেই দেখা যায়, তফসিল ঘোষণার আগেই প্রার্থীরা নানাভাবে নিজেদের জানান দিতে শুরু করেন। 'অমুক মার্কায় ভোট দিন', 'তমুক মার্কায় ভোট দিন'—এই ধরনের পোস্টার, ব্যানার, এবং বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা প্রায় দেশের সব জায়গাতেই চোখে পড়ে। প্রশ্ন ওঠে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে প্রার্থীরা কি আইনগতভাবে নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারেন? গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (RPO) এই বিষয়ে কী বলে এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনাগুলো কী ইঙ্গিত দেয়? এই প্রবন্ধে আমরা এই জটিল আইনি দিকটি বিশ্লেষণ করব।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO) কী বলে?

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (The Representation of the People Order, 1972) বাংলাদেশের নির্বাচন পরিচালনার মূল আইন। এই আইনের ধারা ৭৮ (Section 78) নির্বাচনী প্রচারণার সময়কাল নির্ধারণ করে, যা এই আলোচনার মূল ভিত্তি।

RPO'র মূল বিধান: প্রচারণার সময়কাল

RPO'র ধারা ৭৮(১) অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই ধারা স্পষ্ট করে যে, কোনো প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো নির্বাচনী সভা, শোভাযাত্রা বা প্রচারণার কাজ নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার তারিখের আগে শুরু করা যাবে না। প্রচারণার এই সময়কাল শুরু হয় তফসিল ঘোষণার পর থেকে এবং তা ভোটগ্রহণের পূর্ববর্তী ৪৮ ঘণ্টা আগে (অর্থাৎ, নির্বাচনের দিনসহ) শেষ হয়।

ধারা ৭৮(১) অনুসারে: "নির্বাচনের প্রচার সংক্রান্ত কোনো কার্য বা কার্যকলাপ নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পূর্বে শুরু করা যাইবে না এবং ভোটগ্রহণের তারিখের পূর্ববর্তী ৪৮ ঘণ্টা সময়েও উহা করা যাইবে না।"

এর অর্থ দাঁড়ায়:

প্রচার শুরুর সময়: নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সরকারি গেজেটে নির্বাচনের তফসিল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার দিন থেকে।

প্রচার শেষ হওয়ার সময়: ভোটগ্রহণের দিনটি বাদ দিয়ে তার আগের ৪৮ ঘণ্টা আগে।

আইনি বিশ্লেষণ: RPO'র এই বিধান অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার আগে "অমুক মার্কায় ভোট দিন" বা "তমুক মার্কায় ভোট দিন" লিখে সরাসরি ভোট চাওয়া বা প্রার্থীর পক্ষে সুস্পষ্ট নির্বাচনী প্রতীক উল্লেখ করে প্রচার চালানো আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

তফসিল-পূর্ব প্রচারণার বাস্তব চিত্র ও আইনি ধূম্রজাল

বাস্তবে দেখা যায়, তফসিল ঘোষণার আগেই বড় বড় বিলবোর্ড, পোস্টার, এবং ব্যানারে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের ছবি ও নাম ব্যবহার করে নানা ধরনের বার্তা প্রচার করেন। এগুলোর প্রকৃতি দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:

ক. সরাসরি নির্বাচনী প্রচার (যা অবৈধ):

যখন কোনো বিলবোর্ড বা পোস্টারে সরাসরি ভোটের প্রতীক (যেমন: নৌকা, ধানের শীষ, লাঙ্গল) ব্যবহার করা হয়, কিংবা "অমুক মার্কায় ভোট দিন" বা "আপনাকে জয়ী করুন"-এর মতো সরাসরি নির্বাচনী আবেদন থাকে, তখন তা RPO'র ধারা ৭৮ এর লঙ্ঘন। কারণ, তফসিল ঘোষণার আগেই একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নিজেকে প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

খ. প্রাক-নির্বাচনী বা জনহিতকর প্রচার (যেখানে ধূম্রজাল):

অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীরা সরাসরি ভোট না চেয়ে ভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নেন। যেমন:

"ঈদ মোবারক", "নববর্ষের শুভেচ্ছা", "অমুক নেতার জন্মবার্ষিকীর শুভেচ্ছা" জ্ঞাপন করা।

এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বা জনহিতকর কাজের বার্তা দেওয়া।

"এলাকার সেবক হিসেবে আমাকে সমর্থন দিন" বা "আগামীতে আপনাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার"– এমন সাধারণ অঙ্গীকার প্রকাশ করা।

নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা: নির্বাচন কমিশন (ইসি) সাধারণত এই ধরনের প্রচারণাকে 'প্রাক-নির্বাচনী বা প্রাক-পছন্দকালীন প্রচার (Pre-Election or Pre-Preference Campaign)' হিসেবে গণ্য করে। যদিও RPO'তে এই ধরনের প্রচারণার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা বা নিষেধাজ্ঞা নেই, ইসি মনে করে, তফসিল ঘোষণার আগে প্রতীকবিহীন এই ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীরা ভোটারদের উপর প্রভাব বিস্তার করে ভোটের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারেন, যা নির্বাচনে 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' বা সমান সুযোগ নষ্ট করে।

নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা: ইসি প্রায়শই একটি কঠোর অবস্থান নেয়। তারা বিভিন্ন সময়ে সার্কুলার জারি করে জানিয়েছে যে, তফসিল ঘোষণার আগে প্রার্থীরা যেন নাম, ছবি, পদবি বা সম্ভাব্য প্রতীক ব্যবহার করে কোনো প্রকার ব্যানার, পোস্টার, দেয়াল লিখন, বিলবোর্ড বা তোরণ নির্মাণ না করেন। এ ধরনের প্রচারকে 'অদৃশ্য প্রচারণা' (Invisible Campaign) হিসেবে চিহ্নিত করে ইসি এগুলো অপসারণের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়। এই নির্দেশনাগুলো সাধারণত নির্বাচনী আচরণ বিধিমালার অধীনে জারি করা হয়।

নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা ও প্রচারণার ব্যয়ের হিসাব

নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে কেবল RPO নয়, নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা (Conduct of Election Rules)-ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই বিধিমালায় প্রচারণার ধরন, আকার, এবং ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়।

ক. প্রচারণার ব্যয়:

তফসিল ঘোষণার আগে করা প্রচারণার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রার্থীকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নির্বাচনী খরচ করতে হয় এবং তার বিস্তারিত হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়।

যদি কোনো ব্যক্তি তফসিল ঘোষণার আগে শুভেচ্ছা বা জনহিতকর কার্যক্রমের নাম করে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করে প্রচারণা চালান, তবে এই খরচ নির্বাচনী ব্যয় হিসেবে গণ্য হবে কি না?

আইন অনুসারে, নির্বাচনী ব্যয় তফসিল ঘোষণার পর শুরু হয়। কিন্তু এই প্রাক-প্রচারণাগুলো প্রার্থীর পরিচিতি এবং জনসমর্থনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে এই খরচকে ব্যয়ের হিসাবে আনা না হলে, প্রার্থীরা আইনের ফাঁক ব্যবহার করে ব্যয়সীমা লঙ্ঘন করতে পারেন।

খ. অপসারণের ক্ষমতা:

নির্বাচন কমিশন এই ধরনের প্রচারণাকে 'আচরণ বিধির লঙ্ঘন' হিসেবে দেখে তা অপসারণের জন্য নির্দেশ দিতে পারে। নির্বাচন কমিশনকে এই ক্ষমতা দেয় মূলত RPO এবং এর অধীনে প্রণীত আচরণ বিধিমালা। যদিও প্রাক-নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা প্রয়োগ নিয়ে মাঝে মাঝে আইনি প্রশ্ন ওঠে, তবে ইসির মূল লক্ষ্য থাকে নির্বাচনী পরিবেশকে নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত রাখা।

আইনের শাসন বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা

তফসিল ঘোষণার আগে নির্বাচনী প্রচারণার বিষয়টি আইনি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি সংঘাতপূর্ণ ক্ষেত্র।

আইনের দৃষ্টিতে: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ধারা ৭৮ অনুযায়ী সুস্পষ্ট নির্বাচনী প্রচার (যেখানে প্রতীক ও ভোট চাওয়া হয়) তফসিল ঘোষণার আগে সম্পূর্ণভাবে অবৈধ। এই ধরনের কার্যকলাপ বন্ধ করতে নির্বাচন কমিশনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

বাস্তবতার নিরিখে: প্রার্থীরা শুভেচ্ছাবার্তা বা জনসেবার আড়ালে যে প্রাক-নির্বাচনী প্রচারণা চালান, তা RPO'র সরাসরি লঙ্ঘন না হলেও, নির্বাচনী আচরণ বিধিমালার চেতনার পরিপন্থী। এটি 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' নষ্ট করে এবং দরিদ্র বা নতুন প্রার্থীদের জন্য একটি বৈষম্যমূলক পরিবেশ তৈরি করে।

একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য, কেবল তফসিল ঘোষণার পরের সময়ের উপর নজর রাখলেই হবে না, বরং তফসিল-পূর্ববর্তী প্রচারণাকেও একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা আবশ্যক। নির্বাচন কমিশনের উচিত, RPO-তে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে অথবা শক্তিশালী আচরণ বিধিমালা প্রয়োগের মাধ্যমে প্রাক-নির্বাচনী প্রচারণার সুস্পষ্ট সংজ্ঞা এবং নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্র তৈরি করা। এই পদক্ষেপই একটি সত্যিকারের অংশগ্রহণমূলক এবং ন্যায়সঙ্গত নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করবে।

যা এতদিন ধরে বাংলাদেশের সাধারণ গণমানুষ কখনো দেখেনি, তা অস্বাভাবিক এক “মহাজনি” সরকারের আমলে দেখছে। এই বিষয়ে আপনার মতামত কী, তা কমেন্টে লিখে জানান। 

মন্তব্যসমূহ