বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গনে 'যৌন হয়রানি': জাহানারা আলমের অভিযোগ ও তোলপাড়

ব্যাঙেরছাতা

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে সম্প্রতি যে ঘটনাটি সবচেয়ে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তা হলো জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও তারকা পেসার জাহানারা আলমের বিস্ফোরক অভিযোগ। যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে মানসিক নিপীড়ন ও ক্যারিয়ার নষ্ট করার মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ এনেছেন তিনি, যার ফলে পুরো দেশের ক্রীড়া সমাজ নড়েচড়ে বসেছে। এই ঘটনা শুধু নারী ক্রিকেটের ভেতরের অন্ধকার দিকটি উন্মোচন করেনি, বরং দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা এবং সম্মানজনক পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

অভিযোগের সূত্রপাত: কিসের ভিত্তিতে এত আলোড়ন?

জাহানারা আলম প্রায় এক বছর ধরে জাতীয় দল থেকে বাইরে। অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত এই ক্রিকেটার সম্প্রতি একটি অনলাইন সাক্ষাৎকারে ২০২২ সালের নারী ক্রিকেট বিশ্বকাপ চলাকালীন ঘটে যাওয়া 'জঘন্যতম ঘটনা' প্রকাশ করেন। তার অভিযোগের তীর সরাসরি সাবেক নির্বাচক ও টিম ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু এবং নারী বিভাগের সাবেক ইনচার্জ প্রয়াত তৌহিদ মাহমুদসহ বোর্ডের কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার দিকে।

জাহানারার অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে:

যৌন হয়রানি ও অশ্লীল প্রস্তাব: 

মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু নাকি খেলোয়াড়দের সঙ্গে ব্যক্তিগত শারীরিক বিষয় নিয়ে অশালীন মন্তব্য করতেন। জাহানারা একটি সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন, মঞ্জুরুল তার কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে পিরিয়ডের সময়কাল সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন এবং পিরিয়ড শেষ হলে দেখা করার ইঙ্গিত দেন।

অশোভন শারীরিক স্পর্শ: 

বিশ্বকাপের সময় মঞ্জুরুল হ্যান্ডশেকের পরিবর্তে মেয়েদের "উৎসাহ দেওয়ার নামে" জড়িয়ে ধরতেন বা বুকে টেনে নিতেন বলে অভিযোগ করেছেন জাহানারা। এই ধরনের 'মন্দ স্পর্শ' নারী ক্রিকেটারদের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর ছিল।

বিসিবির নিষ্ক্রিয়তা: 

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, জাহানারা বারবার লিখিতভাবে বিসিবিকে এই বিষয়ে জানালেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অভিযোগ জানানোর পর তার ওপর অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।

বিসিবি'র প্রতিক্রিয়া ও তদন্ত কমিটি গঠন

প্রথম দিকে জাহানারা যখন বর্তমান অধিনায়কের বিরুদ্ধে গ্রুপিং এবং জুনিয়রদের নিগ্রহের অভিযোগ তোলেন, তখন বিসিবি এক বিবৃতিতে তা 'ভিত্তিহীন ও মনগড়া' বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু যখন যৌন হয়রানির মতো স্পর্শকাতর বিষয়টি জনসম্মুখে আসে, তখন চাপের মুখে নড়েচড়ে বসে বোর্ড।

গণমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হওয়ার পর বিসিবি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং অভিযোগগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়। বিবৃতিতে বোর্ড জানায়, তারা খেলোয়াড় ও সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য 'নিরাপদ, সম্মানজনক এবং পেশাদার পরিবেশ' নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তদন্ত কমিটিকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন ও সুপারিশ জমা দিতে বলা হয়েছে।

তবে, অভিযুক্ত মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু, যিনি বর্তমানে চীনে কোচিং করাচ্ছেন, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগকে 'ভিত্তিহীন ও মিথ্যা' বলে দাবি করেছেন। তিনি যেকোনো তদন্তের মুখোমুখি হতে দেশে ফিরে আসতে প্রস্তুত বলেও জানান।

ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের কণ্ঠস্বর: বিচারের দাবি

জাহানারা আলমের এই সাহসী পদক্ষেপের পর দেশের ক্রিকেটাঙ্গনের বড় নামগুলোও সোচ্চার হয়েছেন।

তামিম ইকবাল ও মাশরাফি বিন মর্তুজা: সাবেক দুই সফল অধিনায়কই জাহানারার পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি তুলেছেন, যেখানে বিসিবি সংশ্লিষ্ট কেউ থাকবেন না। তাদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

মুশফিকুর রহিম: তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, পৃথিবীতে কোনো ধরনের হয়রানির স্থান নেই এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষীদের যথাযথ শাস্তি দাবি করেছেন।

কোয়াব (ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ): কোয়াবও জাহানারার প্রতি সংহতি প্রকাশ করে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।

জাতীয় দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদের এই সমর্থন নিঃসন্দেহে নারী ক্রিকেটারদের মধ্যে সাহস যোগাবে এবং একটি বার্তা দেবে যে, এই অন্যায় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

একটি নিরাপদ ক্রীড়াঙ্গনের প্রত্যাশা

জাহানারা আলমের অভিযোগ বাংলাদেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে এক গভীর ক্ষত উন্মোচন করেছে। এটি কেবল ব্যক্তিগত একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নারী ক্রীড়াবিদদের প্রতি সমাজের এবং ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। এতদিন ধরে যে অসদাচরণ ও হয়রানির বিষয়গুলো চাপা ছিল, তা আজ প্রকাশ্যে এসেছে।

বিসিবি'র এই তদন্ত প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই তদন্ত যদি পক্ষপাতহীন ও স্বচ্ছ হয় এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তবে তা দেশের নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। অন্যথায়, এই ঘটনা অন্যান্য ভুক্তভোগীদের মুখ খোলার সাহস যোগানোর পরিবর্তে নীরব থাকার কারণ হতে পারে।

একটি নিরাপদ ক্রীড়াঙ্গন নিশ্চিত করার জন্য এখন আর শুধু বিসিবি বা কোনো সংস্থার অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। সরকারি পর্যায়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন এবং হয়রানি বন্ধে জিরো-টলারেন্স নীতি কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি। এই ঘটনা যেন কেবল একটি সংবাদ হয়ে হারিয়ে না যায়, বরং বাংলাদেশে নারী ক্রীড়ার ইতিহাসে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয় – এই প্রত্যাশাই রাখছে পুরো দেশের ক্রীড়াপ্রেমীরা।

মন্তব্যসমূহ