কানাডার ভিসা নীতিতে বড় মোড়: গণহারে ভিসা বাতিলের ক্ষমতা, নেপথ্যে ভারত ও বাংলাদেশের জালিয়াতি
কানাডা, বিশ্বের অন্যতম অভিবাসন-বান্ধব দেশ হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর হাজার হাজার স্বপ্ন নিয়ে মানুষ পাড়ি জমান এই দেশটিতে—বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া থেকে। কিন্তু সম্প্রতি অটোয়া সরকার যে নতুন ক্ষমতা হাতে নেওয়ার জন্য তৎপরতা শুরু করেছে, তাতে সেই স্বপ্নে বড়সড় ধাক্কা লাগার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কানাডা সরকার বিদেশিদের গণহারে ভিসা বাতিলের ক্ষমতা পাওয়ার চেষ্টা করছে, যার মূল কারণ হিসেবে অভিযোগ তোলা হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশ থেকে আসা ভিসা আবেদনে জালিয়াতির ঊর্ধ্বগতি।
সিবিসি নিউজসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে আসা অভ্যন্তরীণ নথিতে কানাডার অভিবাসন, শরণার্থী এবং নাগরিকত্ব বিভাগ (IRCC) ও কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি (CBSA)-এর গভীর উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে। এই নথিতে স্পষ্টভাবেই ভারত ও বাংলাদেশকে 'নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জিং দেশ' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এই দেশগুলো থেকে আসা জাল আবেদনগুলো চিহ্নিত ও বাতিলের ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। অভিবাসন ব্যবস্থার অখণ্ডতা রক্ষা করতে কানাডা সরকার বর্তমানে যে ‘দৃঢ় পদক্ষেপ’ নিতে চাইছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে এই গণ-বাতিলের ক্ষমতা।
বিল সি–১২: একচ্ছত্র ক্ষমতা এবং জনস্বার্থের আড়ালে কী?
কানাডার সরকার বিল সি–১২ (Bill C-12) নামে একটি প্রস্তাব পার্লামেন্টে তুলেছে, যা পাস হলে কর্তৃপক্ষ গণহারে ভিসা বাতিলের একচ্ছত্র ক্ষমতা লাভ করবে। প্রকাশ্যে ইমিগ্রেশনমন্ত্রী এই ক্ষমতা চাওয়ার কারণ হিসেবে মহামারি, যুদ্ধ বা অন্যান্য জরুরি অবস্থার মতো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিকে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ফাঁস হওয়া অভ্যন্তরীণ সরকারি নথিতে দেখা যায়, ক্ষমতাটি ব্যবহারের তালিকায় 'নির্দিষ্ট দেশের ভিসাধারীদের' কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিল সি-১২ কার্যকর হলে এটি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদেরকে 'জনস্বার্থের' (Public Interest) ভিত্তিতে ভিসা, স্টাডি পারমিট বা ওয়ার্ক পারমিট বাতিল বা স্থগিত করার ব্যাপক ক্ষমতা দেবে। সমালোচকরা বলছেন, 'জনস্বার্থ' হলো একটি অস্পষ্ট শব্দবন্ধ, যা সরকারের কাছে গণ-বহিষ্কারের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এটি বৈধভাবে আসা অভিবাসীদের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য এক গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সুশীল সমাজের ৩০টিরও বেশি সংগঠন, মাইগ্র্যান্ট রাইটস নেটওয়ার্ক-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই আইনের বিরুদ্ধে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের শঙ্কা—এই ক্ষমতা আবেদনকারীদের আপিলের সুযোগ বা যথাযথ প্রক্রিয়াজাতকরণ (Due Process) ছাড়াই তাদের স্ট্যাটাস কেড়ে নিতে পারে।
জালিয়াতির কঙ্কাল: ভারতীয় শিক্ষার্থীদের করুণ পরিণতি
গণহারে ভিসা বাতিলের এই উদ্যোগের পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো স্টাডি পারমিট (শিক্ষার্থী ভিসা) জালিয়াতি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত থেকে আগত শিক্ষার্থীদের মধ্যে জালিয়াতির ঘটনা রেকর্ড সংখ্যক বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় ১,৫৫০টি জাল ভর্তি স্বীকৃতিপত্র (Letter of Acceptance - LOA) ধরা পড়ে। নতুন যাচাইকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে গত বছর আরও ১৪ হাজারের বেশি জাল নথি শনাক্ত হয়েছে।
এই জালিয়াতির ফলস্বরূপ, ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হারে রেকর্ড বৃদ্ধি দেখা গেছে। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৩-এ যেখানে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিলের হার ছিল ৩২ শতাংশ, সেখানে ২০২৫ সালের আগস্টে তা প্রায় ৭৪ শতাংশে পৌঁছেছে—অর্থাৎ প্রতি চারজন আবেদনকারীর মধ্যে তিনজনই প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর নতুন বিধিনিষেধ এবং কঠোর আর্থিক প্রয়োজনীয়তা আরোপের ফলেও এই হার বেড়েছে। একসময় কানাডায় ভারতীয় শিক্ষার্থীদের আবেদন ছিল শীর্ষে, কিন্তু এই প্রত্যাখ্যানের কারণে আবেদনকারীর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে ২০ হাজার ৯০০ থেকে ৪ হাজার ৫১৫-তে নেমে এসেছে। এটি স্পষ্ট করে যে, জালিয়াতির রাশ টানতে গিয়ে কানাডা প্রশাসন এখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি ও অভিবাসন আইনজীবীদের উদ্বেগ
বাংলাদেশকেও 'নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জিং দেশ' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভারতের মতো সরাসরি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি, তবে সম্প্রতি এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, একটি আন্তর্জাতিক চক্র পার্শ্ববর্তী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় কানাডা, ইতালি ও অন্যান্য দেশের জাল ভিসা তৈরি করে বাংলাদেশে সরবরাহ করছে। এই নিখুঁত জাল ভিসাগুলো বৈধ কর্মসংস্থানের সন্ধানে থাকা বাংলাদেশি কর্মীদের ঠকাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করছে। ফলে কানাডার এই নতুন ক্ষমতা কেবল জালিয়াতদের বিরুদ্ধেই নয়, বরং নিরীহ ও সৎ আবেদনকারীদের জন্যও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিবাসন আইনজীবীরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, সরকার কেবল জালিয়াতি দমন নয়, বরং বহু বছরের জমে থাকা আবেদন জট (backlogs) কমাতেও এই গণ-বাতিলের ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। যদি এটি শুধুমাত্র প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয়, তবে এটি অভিবাসন আইনের মূল নীতির পরিপন্থী হবে। আইআরসিসি যদিও দাবি করেছে যে, নতুন প্রস্তাব কোনো 'নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা পরিস্থিতি' মাথায় রেখে তৈরি করা হয়নি, অভ্যন্তরীণ নথিতে ভারত ও বাংলাদেশের নাম আসায় সেই দাবি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সবমিলিয়ে, বিল সি-১২-এর মাধ্যমে কানাডার অভিবাসন নীতিতে এক নতুন, কঠোর অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। সরকার তার সীমান্ত এবং অভিবাসন ব্যবস্থার অখণ্ডতা রক্ষা করতে চাইলেও, এই গণ-বাতিলের ক্ষমতা ব্যক্তিগত অধিকার ও ন্যায়বিচারকে কতটুকু সুরক্ষিত রাখবে, সেটাই এখন দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা লক্ষ লক্ষ ভিসাপ্রত্যাশীদের প্রধান উদ্বেগ। এই আইনের চূড়ান্ত পরিণতি এবং এর প্রয়োগের ওপর নির্ভর করবে কানাডার অভিবাসন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।

মন্তব্যসমূহ