ভূ-রাজনৈতিক দ্বৈরথে বাংলাদেশের সামনে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি

ব্যাঙেরছাতা

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বর্তমানে এক কঠিন সমীকরণের মুখে দাঁড়িয়ে। একদিকে দেশের সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়ন এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি করার তাগিদ, অন্যদিকে বিশ্বের দুই পরাশক্তি—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের—ভূ-রাজনৈতিক দ্বৈরথের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনে যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, তার জেরে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের মতো বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে ঢাকা। মার্কিন সিনেটে নিযুক্ত নতুন রাষ্ট্রদূত মনোনীত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের মন্তব্য এবং প্রস্তাবিত ‘থিঙ্ক টোয়াইস অ্যাক্ট-২০২৫’ আইনটির আলোচনা এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশের সামরিক ক্রয়নীতি এবং পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য রক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

‘থিঙ্ক টোয়াইস অ্যাক্ট-২০২৫’: আমেরিকার নতুন অস্ত্র

বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রির বাজারে চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য রোধ করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি নতুন কঠোর আইন প্রণয়নের পথে হাঁটছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘থিঙ্ক টোয়াইস অ্যাক্ট-২০২৫’। এই আইনের মূল লক্ষ্য হলো চীনা সমরাস্ত্র ক্রেতা দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা এবং অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের মাধ্যমে চীন থেকে অস্ত্র কিনতে নিরুৎসাহিত করা। ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক ১১০তম কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপিত এই বিলটি চীনকে মোকাবিলা করার জন্য ওয়াশিংটনের নতুন বৈশ্বিক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটি এরই মধ্যে কণ্ঠভোটে আইনটির প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে। আইনটি চূড়ান্ত হলে এটি শুধুমাত্র নতুন অস্ত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রেই নয়, বরং পুরোনো চীনা অস্ত্রের খুচরা যন্ত্রাংশ কেনাবেচার ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহে আগ্রহী দেশগুলোকে চীনা অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করবে এবং অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ প্রয়োগের মাধ্যমে একটি কার্যকর প্রতিরোধক গড়ে তুলতে চাইবে। আগামী জানুয়ারিতে যখন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, ধারণা করা হচ্ছে তখন এই নতুন আইনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠবে।

ওয়াশিংটনের উদ্বেগ: চীনের সমরাস্ত্র বিক্রির কৌশল

যুক্তরাষ্ট্রের মতে, চীনের ক্রমবর্ধমান সমরাস্ত্র বিক্রি বেইজিংয়ের সামরিক শক্তি এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবকে অপ্রত্যাশিতভাবে বাড়িয়ে তুলছে, যা ওয়াশিংটনের কাছে একটি হুমকি। অস্ত্রের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে চীন বেশ কয়েকটি কৌশলগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে বলে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা মনে করেন। এর মধ্যে প্রধান কিছু লক্ষ্য হলো:

০১. সামরিক ভাবমূর্তি গঠন: সমরাস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে নিজস্ব সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি তৈরি ও উন্নয়ন।

০২. অস্ত্রের কার্যকারিতা নির্ণয়: বিভিন্ন পরিবেশে তাদের অস্ত্রের ব্যবহারিক মান যাচাই করা, যা ভবিষ্যতে চীনা সেনাবাহিনী কাজে লাগাতে পারবে।

০৩. ভূ-কৌশলগত প্রভাব বিস্তার: নির্দিষ্ট কিছু দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এবং কূটনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব আরও সম্প্রসারণ করা।

০৪. অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা: অংশীদার সরকারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে নিজেদের বিনিয়োগ ও কর্মীদের সুরক্ষা দেওয়া।

০৫. যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারদের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি: যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত অংশীদারদের মধ্যে সন্দেহ ও উত্তেজনা সৃষ্টি করা।

যুক্তরাষ্ট্রের একজন কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে জানান, প্রযুক্তিগত দিক থেকে চীন অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়ে এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জন্য বিরল ধাতুর প্রাপ্যতা তাদের বেশি। দীর্ঘদিন ধরে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল (IPS), কোয়াড জোট গঠনসহ বিভিন্নভাবে চীনকে ঠেকাতে সচেষ্ট যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের অস্ত্রের বাজারকে টার্গেট করেছে।

বাংলাদেশের সামরিক সম্পর্ক: সুনির্দিষ্ট উদাহরণ ও ঝুঁকি

মার্কিন সিনেটে শুনানির সময় নেব্রাস্কা থেকে নির্বাচিত রিপাবলিকান সিনেটর পিট রিকেটস সরাসরি বাংলাদেশ ও চীনের সামরিক সহযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি উল্লেখ করেন, সামরিক পরিসরে এই সহযোগিতা ক্রমাগত বাড়ছে। সুনির্দিষ্টভাবে তিনি দুটি বিষয় তুলে ধরেন:

০১. সাবমেরিন ঘাঁটি সংস্কার: সম্প্রতি চীন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বাংলাদেশি সাবমেরিন ঘাঁটি সংস্কার করেছে, যা যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন উভয়ের জন্যই ব্যবহার উপযোগী।

০২. জে-১০ যুদ্ধবিমান ক্রয়: বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার চীন নির্মিত সর্বোচ্চ ২০টি জে-১০ যুদ্ধবিমান, নতুন সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল এবং দূরপাল্লার রাডার কেনার পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে।

সিনেটর রিকেটস জোর দিয়ে বলেন, এসব সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলাদেশ চীনা প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে "আর্থিক ও কৌশলগতভাবে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক" স্থাপন করছে। এই প্রেক্ষাপটেই তিনি রাষ্ট্রদূত-মনোনীত ক্রিস্টেনসেনকে প্রশ্ন করেন যে, কীভাবে তিনি বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করবেন যাতে তারা চীনা সমরাস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে প্রতিরক্ষা ক্রয়ে স্বচ্ছতা বাড়াতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহী হয়।

ঢাকার কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন তার জবাবে সিনেটরকে আশ্বস্ত করে বলেন যে, তার মনোনয়ন নিশ্চিত হলে তিনি সরাসরি বাংলাদেশ সরকার ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কথা বলবেন। তিনি চীনের সামরিক সম্পৃক্ততা, সামুদ্রিক এলাকায় তাদের কার্যক্রম এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে তাদের ভূমিকার ঝুঁকিগুলো "স্পষ্টভাবে তুলে ধরবেন।" একই সাথে, তিনি দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে আরও নিবিড় সহযোগিতাসহ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্বের সুযোগ ও সুফলগুলোও তুলে ধরবেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, চীন থেকে সমরাস্ত্র সংগ্রহ নিরুৎসাহিত করার বিষয়টি বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি শুল্কের বিষয়ে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টেও (NDA) ছিল। তবে 'থিঙ্ক টোয়াইস অ্যাক্ট' কার্যকর হলে, আলাদা করে চুক্তিপত্রে এই শর্ত রাখার আর প্রয়োজন হবে না।

ভারসাম্যের সূক্ষ্ম পথে বাংলাদেশ

এই পুরো পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য এক কঠিন পরীক্ষার সৃষ্টি করেছে। সামরিক আধুনিকায়ন প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিজস্ব সিদ্ধান্ত, কিন্তু বিশ্ব যখন দুই মেরুতে বিভক্ত, তখন যেকোনো সামরিক ক্রয় বা কৌশলগত অংশীদারিত্বের সিদ্ধান্তই ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। একদিকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য চীনের দেওয়া সাশ্রয়ী ও কার্যকর সামরিক সরঞ্জাম বা অবকাঠামো উন্নয়ন সুবিধা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও পশ্চিমা সহযোগিতা হারানোর ঝুঁকি।

বাংলাদেশকে এখন তার জাতীয় প্রতিরক্ষা চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মধ্যে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হবে। ঢাকার সামনে চ্যালেঞ্জ হলো—এমন একটি কৌশল নির্ধারণ করা, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরক্ষার প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের স্থায়িত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়। এই পরিস্থিতিতে, প্রতিরক্ষা ক্রয় প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা আনা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে দুই পরাশক্তির উদ্বেগ প্রশমন করাই হবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য। দেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি বিচক্ষণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তই কেবল এই কঠিন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে পারে।

মন্তব্যসমূহ