অর্থনীতির কঠিন সময়: তিন সংকটে জর্জরিত সরকার এবং উত্তরণের পথে চ্যালেঞ্জ

ব্যাঙেরছাতা

সম্প্রতি প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত সংবাদ ও তৎসংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিবেদন দেশের অর্থনীতির এক গভীর সংকটের চিত্র তুলে ধরেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক তীব্র আর্থিক সংকটের সম্মুখীন, যার মূল কারণ হিসেবে তিনটি বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে: রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া বিপুল ঋণের বোঝা পরিশোধের চাপ এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দৈনন্দিন ব্যয় বৃদ্ধি। এই ত্রিমুখী চাপ এতটাই প্রকট যে, সরকারের পরিকল্পিত চলতি ব্যয় মেটাতেও এখন ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আর্থিক ব্যবস্থাপনার এই নাজুক পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার একদিকে কৃচ্ছ্র সাধনের নীতি গ্রহণ করেছে, অন্যদিকে ঋণের বাজারে অভ্যন্তরীণ উৎসগুলোর ওপর নির্ভরতা ক্রমশ বাড়াচ্ছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এই প্রবণতার সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

ত্রিমুখী চাপ: রাজস্ব, ঋণ এবং মূল্যস্ফীতি

সরকারের অর্থ সংকটের প্রধানতম কারণ হলো রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারা। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস (জুলাই-আগস্ট) এর তথ্য অনুযায়ী, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬১ হাজার কোটি টাকারও বেশি, কিন্তু আদায় হয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ১১ শতাংশ। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক মন্দা, ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্থর গতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্ব বোর্ড ঘিরে সৃষ্ট আন্দোলনের মতো ঘটনা রাজস্ব আদায়ে বাধা সৃষ্টি করেছে।

এর পাশাপাশি, বিগত সরকারের নেওয়া স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি দেশি-বিদেশি ঋণের কিস্তি এবং সুদ পরিশোধের বিশাল চাপ বর্তমান সরকারের কাঁধে চেপেছে। দেশের মোট ঋণের স্থিতি প্রায় ১৯ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা ও দেশের সুনাম বজায় রাখতে এই ঋণ পরিশোধ অপরিহার্য হয়ে পড়ায় সরকারের অর্থ সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় চড়া দামে ডলার কিনতে হচ্ছে, যা রিজার্ভের ওপরও চাপ ফেলছে।

তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতির উচ্চহার (যা প্রায় তিন বছর ধরে ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে) পণ্য ও সেবার মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলস্বরূপ, সরকারকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়াতে হয়েছে এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও দৈনন্দিন প্রশাসনিক ব্যয়ও বেড়েছে। একদিকে আয় কম, অন্যদিকে ব্যয় বাড়ার এই সমীকরণে আর্থিক ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারের ঋণ গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি ও ঋণপ্রবাহের ভিন্ন গতিপথ

আর্থিক দুরবস্থা সামাল দিতে সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি গ্রহণ করেছে। অর্থ বিভাগ ইতোমধ্যে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাদ দেওয়া, প্রকল্পের সংখ্যা সীমিত রাখা এবং নতুন কোনো বরাদ্দ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়ে সংশোধিত বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় একেবারেই কমিয়ে আনা হয়েছে।

তবে এই সংকটের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সরকারের ঋণ বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নেতিবাচক ছিল (দশমিক ০৩ শতাংশ কম)। দেশের মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের ৭২ শতাংশ বেসরকারি খাতে গেলেও, রপ্তানি ও শিল্প খাতে মন্দার কারণে বেসরকারি ঋণপ্রবাহে গতি আসছে না। সরকারি ঋণ উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে মূলত চলতি ব্যয় মেটাতে ব্যবহৃত হওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা উৎপাদন বৃদ্ধিতে এর ভূমিকা নেই। এর বিপরীতে, বেসরকারি খাতের ঋণ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি আরও মন্থর হচ্ছে।

অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা এবং ঝুঁকির আশঙ্কা

বর্তমানে সরকারের কাছে সংকট উত্তরণের পথগুলো ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, এই মুহূর্তে রাজস্ব আয় বাড়ানোর সুযোগ কম। অন্যদিকে, বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, কারণ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে চুক্তি করার পক্ষপাতী। ফলে আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সরকারের সামনে প্রধানত অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পথই খোলা রয়েছে।

সরকার এখন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে বরং পরিশোধ করছে। এর পরিবর্তে, অপেক্ষাকৃত বেশি সুদের নন-ব্যাংকিং খাত (যেমন সঞ্চয়পত্র ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান) থেকে ঋণ নিচ্ছে। জুলাই-আগস্টে নন-ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে, যার সুদের হার ব্যাংক ঋণের চেয়ে বেশি (১১ থেকে পৌনে ১২ শতাংশ)। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উচ্চ সুদের এই ঋণ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হওয়ায় তা মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং ভবিষ্যতের সরকারের ওপর বিশাল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে।

কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা

দেশের অর্থনীতিতে একটি কঠিন সময় চলমান। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে সাময়িক কৃচ্ছ্রসাধনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারে মনোযোগী হতে হবে। কেবল ঋণের ওপর নির্ভর করে চলতি ব্যয় মেটানো দীর্ঘমেয়াদে কোনো সমাধান নয়। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে, রাজস্ব আদায়ে দক্ষতা বৃদ্ধি ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

মন্তব্যসমূহ