পুলিশ গার্লফ্রেন্ড- রোমান্টিক প্রেমের গল্প: তেরোতম পরিচ্ছেদ

ব্যাঙেরছাতা

পুলিশ গার্লফ্রেন্ড

(রোমান্টিক প্রেমের গল্প)

তেরোতম পরিচ্ছেদ

নওরোজ বিপুল

==============================
নূমার ঠিক করা ভেন্যু, বেইলি রোডে একটা কফি পার্লারে, নূমার আগেই পৌঁছেছে কারীব আর নাযীর। গতকাল রাতে ফোনে কথা বলার সময় পার্লারটার নাম বলে দিয়েছে নূমা। কারীবকে সাবধান করে দিয়েছে, ওখানে গিয়ে নূমাকে যেন কারীবের জন্য অপেক্ষা করতে না হয়। অপেক্ষার মুহুর্তগুলো নাকি নূমার জন্য চরম বিরক্তিকর। ওকে অপেক্ষা করাবে না বলেই, বন্ধুকে আগেভাগেই নিয়ে এসেছে নাযীর। আপাতত ওরা দুজন একটা টেবিলেই বসে আছে। এমন জায়গায় বসেছে, এখান থেকে পার্লারে কে কখন ঢুকছে, বের হচ্ছে তা দেখা যায়। টেবিলে মোট চারজনের বসার ব্যবস্থা আছে। পুরো টেবিলটায় ওরা রিজার্ভ করে নিয়েছে, যাতে অন্য কেউ বিরক্ত করতে না আসে। পাশের দুই চেয়ারে সামনা-সামনি বসেছে কারীব আর নাযীর। 
পাশাপাশি, কফি পার্লারে একটা ছোট্ট ক্যাবিন বুকিং করে রেখেছে নাযীর। নূমা যদি নিরিবিলিতে সময় কাটাতে চায়, তাহলে দুজনকে সে ক্যাবিনের মধ্যে পাঠিয়ে দেবে। 
দুজনেই মোবাইল ফোন টিপাটিপি করছে, পাশাপাশি একে অপরের সাথে কথা বলছে। কারীবকে পার্লারের দরজা দিক করে বসিয়ে দিয়েছে নাযীর। নূমা পার্লারে ঢুকলে যেন ওর দৃষ্টি সরাসরি কারীবের উপরেই পড়ে। সে নিজে বসেছে পার্লারের দরজার দরজার দিকে পিঠ ফিরিয়ে। ওর সামনের পুরো দেয়াল জুড়ে আয়না সেট করে আছে। আয়নাটার দিকে তাকালো নাযীর। দেখতে পেলো দরজা ঠেলে নূমা ভেতরে ঢুকছে। কারীবের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো নাযীর। বলল, 'দুস্ত, তোর মাল চইলা আসছে। দরজার দিকে তাকা!'
দরজার দিকে তাকালো কারীব। নূমা যেন সিনেমার স্লো মোশনের দৃশ্যের মতো করে এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। ওর দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলো কারীব। পরনে ইউনিফর্ম নাই। শাড়ি পরেছে। চুলগুলো খোলা। বাতাসে উড়ছে। সামনে চলে আসা অবাধ্য একগোছা চুল, হাত দিয়ে বারবার ঠিক করছে। শাড়ির সাথে ম্যাচ করা কানের দুল, ঠোঁটে গাঢ় লিপইস্টিক। মুখে হাসি ফুটিয়ে ওদের কাছে আসলো নূমা। ওর বুকের উপর শাড়ির এক ফর্দার আবরণ। শাড়ির নিচে ব্লাউজ, ব্লাউজের নিচ থেকে নূমার সুডৌল স্তন যুগল মাথা উঁচু করে ফুলে আছে। ওর বুকের দিকে কারীবের দৃষ্টি আকৃষ্ট হতেই যাচ্ছিলো। শেষ মুহূর্তে দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করলো কারীব। মাথা ঝাঁকিয়ে, বিষয়টাকে মাথা থেকে তাড়ানোর চেষ্টা করলো। আজো ব্যাপারটা নূমা লক্ষ্য করলো। মুখে হাসি লেগেই ছিল ওর। কারীবের ব্যাপারটা লক্ষ্য করে, ওর আরো হাসি পেলো। হাসিটা আটকানোর জন্য নিজের ঠোঁট, ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরলো নূমা। বলল, 'মানিকজোর যে একসাথে থাকবে, সেটাই তো ভেবেছিলাম।'
নূমা এসে ওদের কাছে দাঁড়ালে, ওরা দুজনেই দাঁড়িয়ে পড়েছিল। নিজের ছেড়ে দেয়া সীটটা দেখালো নাযীর। নূমাকে বসার জন্য ইঙ্গিত করলো। বলল, 'ম্যাম, প্লিজ।'
'আরে না না, আপনি বসেন।'
'আমি বসলে তো হবে না, ম্যাম। আমাদের বাইক ঠিকটাক জায়গায় পার্ক করা হয়নি।' বলল নাযীর। বন্ধুর দিকে তাকালো, 'দুস্ত, তোরা কথা বল। আমি বাইক পার্ক করে আসছি।'
পার্লার থেকে বের হয়ে গেলো। কারীবের ইশারা পেয়ে বসলো নূমা। কারীব বসলো ওর বিপরীত পাশের চেয়ারটাতে। বলল, 'শাড়ি পরে খুব সুন্দর লাগছে! সুন্দর, গর্জিয়াস, স্পাইসি!'
কারীবের স্পাইসি শব্দটা নূমাকে বেশ পুলকিত করে তুললো। মনে হলো, ওর ভেতরে একটা শিহরণ বুলিয়ে গেলো। নারীর রূপের প্রশংসা করতে কোনো ছেলে যে, স্পাইসি শব্দটা ব্যবহার করে, নূমার অন্তত তা জানা ছিল না। আপাতত জানার চেষ্টা করতেও গেলো না। বলল, 'শাড়ি পরার সুযোগ তেমন একটা হয় না। তুমি পছন্দ করো, তোমার পছন্দের অনারে আজ শাড়িই পরেছি।'
'আমি সত্যিই অত্যন্ত সম্মানিত।' বলল কারীব, 'শাড়িতে অনেক অনেক অনেক সুন্দর লাগছে!'
'হয়েছে, আমি পটেই গেছি! এতো পাম্প দিয়ে আর ফুলাতে হবে না!' বলল নূমা। আশের চেয়ারে রেখেছে হ্যান্ডব্যাগ। হ্যান্ডব্যাগটা সে টেনে নিলো। ব্যাগের ভেতর থেকে র‍্যাপিং পেপারে মোড়ানো একটা ছোট প্যাকেট বের করলো। বাড়ালো কারীবের দিকে। বলল, 'আমাদের রিলেশন হওয়ার পর আজ ফার্স্ট মিট, তাই এই ছোট্ট একটা গিফট।'
প্যাকেটটা নিলো কারীব। বলল, 'কী এইটা?'
'মোবাইল ফোন।'
'মোবাইল ফোন?'
'হ্যাঁ, তুমি যে মোবাইল ফোনটা ইউজ করো সেটা লেটেস্ট না, অনেক পুরনো। এখন থেকে এটা ইউজ করবে।'
ব্যপারটা এই প্রথম খেয়াল করলো কারীব। ওর মোবাইল ফোনটা সত্যিই অনেক পুরনো। কিনেছিল কয়েক বছর আগে। শুধু ফেসবুক ইউজ আর মেসেঞ্জার চ্যাটিং ছাড়া, মোবাইল ফোন দিয়ে কারীব অন্য কোনো কাজ করে না, ফলে নতুন ফোন কেনার প্রতি তেমন একটা আগ্রহ দেখায়নি। কিন্তু নূমা ওর হাতের মোবাইল ফোনটা পর্যন্ত লক্ষ্য করেছে। বড় সাংঘাতিক মেয়ে। আরো কী কী যে লক্ষ্য করেছে তা কে জানে।
'আসলে…'
নূমাকে হাত তুলতে দেখে কারীব থেমে গেলো। নূমা বলল, 'আসলে কেনা হয়ে উঠেনি, কিনবো কিনবো করেও কেনা হয়নি- এইসব কথা বলার দরকার নেই, ওকে? এখন থেকে এটা ব্যবহার করো।'
নূমার জন্য কেনা গিফটের প্যাকেটটা নিজের পাশের চেয়ারে রেখেছে কারীব। ওটা কেনার পর নাযীর সাথে করে নিয়ে গিয়েছিল। আজ আসার সময় কোনো এক গিফটের দোকান থেকে, সুন্দর ভাবে প্যাকেট করে এনেছে। প্যাকেটের উপরে আবার একটা গোলাপ ফুলও আটকিয়ে দিয়েছে। এখন গিফটটা নূমাকে দেয়া যায়। পাশের সিট থেকে প্যাকেটটা হাতে নিলো কারীব। বাড়ালো নূমার দিকে। বলল, 'একই কারণে এটা তোমার জন্য।'
প্রথমে প্যাকেটটার দিকে তাকালো নূমা। তারপর তাকালো কারীবের দিকে। জানতে চাইলো, 'কী?'
'তুমি বলেছো, আমি বলবো না।' বলল কারীব, 'বাসায় গিয়ে খুলে দেখবে।'
'ওহ্, শিউর!' বলল নূমা। কারীবের হাত থেকে প্যাকেটটা নিলো। হ্যান্ডব্যাগের পাশে রেখে দিলো। 
'পছন্দ হয় কি না, সেটা কিন্তু অবশ্যই আমাকে জানাবে।' বলল কারীব, 'পছন্দ হলে তো হলোই। না হলেও, আমাকে খুশি করার জন্য, পছন্দ হয়েছে বলতে পারবে না কিন্তু।'
'পছন্দ না হলে অবশ্যই বলবো।' বলল নূমা, 'আশেপাশের টেবিলের ছেলেগুলো আমার দিকে কেমন করে তাকাচ্ছে। আমার অস্বস্তি লাগছে। আমরা কি আরেকটু নিরিবিলিতে বসতে পারি না?'
'সমস্যা কি, তুমি তো চাও-ই ছেলেরা তোমার দিকে তাকাক।'
'না, সব ছেলে আমার দিকে তাকাক তা চাই না। আমি যাকে পছন্দ করবো, আমি চাই শুধু সে আমার দিকে তাকাক।'
'তুমি তাহলে একটা কাজ করো।'
'কী কাজ?'
'পুলিশের চেহারায় ফিরে এসো। দেখো, সব বাপ বাপ করে পালাবে!'
কথা শেষ করে কারীব হাসতে শুরু করলো। ওর হাসি শুনে নূমা বলল, 'ইউনিফর্ম পরে না থাকলেও, আমি কিন্তু অন ডিউটিতেই আছি। কিন্তু এখন আমি পুলিশের চেহারায় ফিরতে চাই না। তুমি আরেকটু নিরিবিলিতে বসার ব্যবস্থা করো।'
'ব্যবস্থা করছি, চিন্তা করো না। নাযীর একটা ক্যাবিনও বুক করে রেখেছে।' হাত তুলে একজন ওয়েটারকে ডাকলো কারীব। ওয়েটার আসলে বলল, 'আমাদের বুকিং করা ক্যাবিনটা খুলে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। আমরা ভেতরে বসবো।'
'ক্যাবিন খোলা আছে, স্যার।' বলল ওয়েটার, 'আপনি ইচ্ছে করলেই ভেতরে গিয়ে বসতে পারেন।'
ওয়েটারকে ধন্যবাদ দিলো কারীব। নূমাকে নিয়ে বুকিং করে রাখা ক্যাবিনের ভেতরে আসলো। ক্যাবিনটা খুব বেশি বড় নয়। টেবিলের দুই পাশে চারটা চেয়ার পাতা আছে। কারীব ভেতরের চেয়ারটাতে বসলো। দেয়ালের সাথে হেলান দিলো। দরজা টেনে দিয়ে, কারীবের বিপরীত পাশের চেয়ারটাতে বসলো নূমা। সে দেয়ালে হেলান দিলো না। হাত দুটো টেবিলের উপর রাখলো। সে চাইছে, নিরিবিলিতে এসে কারীব ওর হাত দুটো ধরুক। কিন্তু ওর হাত ধরার প্রতি, গর্ধভটার কোনো আগ্রহ আছে বলে মনে হলো না। এমন একটা জায়গায়, সুন্দরী একটা মেয়েকে নিয়ে এসে, তার হাত ধরার সুযোগ কেউ এভাবে হাতছাড়া করে?
নূমা আসার আগেই অনেক কিছু অর্ডার করেছিল কারীব। অর্ডার অনুযায়ী সবকিছু প্রস্তুত করা হয়ে গেছে। সেগুলো নিয়ে এসে দরজায় নক করলো ওয়েটার। ওয়েটারকে ভেতরে আসতে বললো নূমা। ওয়েটার এসে অর্ডার অনুযায়ী সবকিছু পরিবেশন করে গেলো। নূমা বলল, 'আমি কিন্তু শুধু কফি খেতেই এসেছিলাম। এতো কিছু অর্ডার করতে কে বলেছে?'
'কেউ বলেনি। আমিই করেছি।' বলল কারীব, 'আজ আমাদের ফার্স্ট মিট, শুধু কফি খেয়ে চলে গেলে, আমার ভেতর অতৃপ্তি থেকে যেতো।'
'বুঝেছি, তুমি অতি উচ্চমানের একটা খাদক।' বলল নূমা, 'তোমার ফ্রেন্ডকে ডাকো।'
'ঐ শালা কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে কে জানে। ওকে ডাকার দরকার নাই।'
'দরকার আছে, খাওয়ার সময় সবাই একসাথে খাবো। তোমার ফোনটা দাও।' প্রায় জোর করেই কারীবের হাত থেকে মোবাইল ফোনটা নিলো নূমা। কল করলো নাযীরের নম্বরে। 
দুইবার রিঙ হতেই নাযীর কল রিসিভ করলো। বলল, 'কী রে হালার পুত, কল করছোত কীলিগা, কিছু ঘটাইছোত নি?'
নাযীরের কথা শুনে কারীবের দিকে একবার তাকালো নূমা। নাযীর কিছু ঘটাইছোত নি বলতে যা বুঝিয়েছে, তা বোঝার মতো যথেষ্ট ম্যাচিউরিটি আছে নূমার মধ্যে।

মন্তব্যসমূহ