কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা: আফগানিস্তানে হেরোইন ঠেকাতে সিআইএ-র গোপন ‘পোস্ত অভিযান’

ব্যাঙেরছাতা

আফগানিস্তান—এই নামটি উচ্চারিত হলে যুদ্ধ, অস্থিরতা এবং আফিমের বিপুল ব্যবসার কথা মনে আসে। দীর্ঘ দুই দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তানে অবস্থান করেছিল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে। কিন্তু এই যুদ্ধের আবডালে গোপনে চলছিল আরেকটি যুদ্ধ— মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য: আফগানিস্তানের বিলিয়ন ডলারের হেরোইন ব্যবসাকে দুর্বল করতে সিআইএ (CIA) ক্ষেপণাস্ত্র বা বোমা নয়, ব্যবহার করেছিল পোস্ত দানা!

ওয়াশিংটন পোস্ট-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রায় এক দশকব্যাপী এই গোপন অভিযান চালিয়েছিল মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। আফগানিস্তানের আফিম ক্ষেতগুলোতে কোটি কোটি পরিবর্তিত পোস্ত বীজ ছড়িয়ে দিয়ে নেশার সাম্রাজ্যকে নীরবে পঙ্গু করে দেওয়ার এই পরিকল্পনাকে প্রাক্তন কর্মকর্তারা আখ্যা দিয়েছিলেন— "একটি গভীর সামরিক সমস্যার অসামরিক সমাধান" হিসেবে।

আফিম অর্থনীতি এবং তালিবানের অর্থভান্ডার

আফগানিস্তানে আফিম চাষের ইতিহাস সুদূরপ্রসারী হলেও, ২০০০ সালের গোড়ার দিকে এর বিস্তার বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। এই সময়ে আফগানিস্তান বিশ্বব্যাপী ৯০ শতাংশ হেরোইনের জোগান দিত। আর এই মাদক অর্থনীতিই ছিল তালিবানদের প্রধান আর্থিক মেরুদণ্ড।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ড্রাগ ব্যবসা এবং চোরাচালান থেকে তালিবান সংগঠনটির বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা (৩২০ মিলিয়ন ডলার)। এই বিপুল অর্থ তারা ব্যবহার করত সামরিক সরঞ্জাম কেনা, যোদ্ধাদের বেতন দেওয়া এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানোর জন্য। মাদকের টাকা এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে তা আফগান সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো এবং দুর্নীতিতেও প্রবেশ করেছিল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাই আফগানিস্তানে শান্তি ফেরানোর অর্থ ছিল এই মাদক অর্থনীতির কোমর ভেঙে দেওয়া। কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত তালিবানের কাছে অর্থের জোগান থাকবে, ততক্ষণ তারা যুদ্ধে টিকে থাকতে সক্ষম। কিন্তু সনাতন পদ্ধতিতে আফিম ক্ষেত ধ্বংস করা বা মাদক কারখানা গুঁড়িয়ে দেওয়া ছিল অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া বা বিকল্প শস্যের ব্যবস্থা করাও সফল হয়নি। এই পরিস্থিতিতেই সিআইএ সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেয়।

সিআইএ-র ‘পোস্ত বোমাবর্ষণ’: এক অভিনব কৌশল

২০০৪ সালের শেষ দিকে সিআইএ-র ‘ক্রাইম অ্যান্ড নারকোটিক্স সেন্টার’-এর তত্ত্বাবধানে এই গোপন অপারেশনটি শুরু হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও ধীরে ধীরে আফগানিস্তানের আফিমের গুণমান নষ্ট করে দেওয়া।

১. লক্ষ্যবস্তু ও পদ্ধতি: অভিযানের প্রধান লক্ষ্য ছিল আফগানিস্তানের দুটি প্রধান আফিমচাষের কেন্দ্র— হেলমান্দ (Helmand) এবং নাঙ্গারহার (Nangarhar) প্রদেশ। এই বীজগুলো ছড়ানোর জন্য রাতে ব্রিটিশ সি-১৩০ বিমান ব্যবহার করা হয়েছিল। রাতের অন্ধকারে আফিমের ক্ষেতগুলিতে কোটি কোটি বীজ ছড়িয়ে দেওয়া হতো।

২. পোস্ত বীজের বিশেষত্ব: সিআইএ যে বীজগুলো ব্যবহার করেছিল, সেগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের 'পরিবর্তিত' প্রকৃতি। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে বীজগুলোতে জিনগত পরিবর্তন (Genetically Modified/GMO) ঘটানো হয়নি। বরং, বহু বছর ধরে চয়ন করে প্রজনন (Selectively Bred) করা হয়েছিল, যাতে এই বীজ থেকে জন্ম নেওয়া পোস্ত গাছের ফল থেকে যে আফিম পাওয়া যাবে, তার মধ্যেকার ক্ষারীয় উপাদান (Alkaloid) বা মরফিন, যা হেরোইন তৈরির মূল রাসায়নিক, তার মাত্রা হবে প্রায় শূন্য।

৩. দীর্ঘমেয়াদি কৌশল: কৌশলটি ছিল অত্যন্ত ধীরগতির। সিআইএ আশা করেছিল, এই নিম্ন-ক্ষমতাসম্পন্ন পোস্ত গাছগুলো যখন স্থানীয় আফিম গাছের সঙ্গে পর-পরাগায়ণ (Cross-pollination) ঘটাবে, তখন ধীরে ধীরে আফগানিস্তানের সামগ্রিক আফিম ফসলের গুণমান কমে যাবে। ফলে, বিশ্বের বাজারে আফগান হেরোইনের আকর্ষণ ও দাম কমে যাবে, এবং তালিবানদের আর্থিক ভিত দুর্বল হবে।

৪. গোপনীয়তা: অভিযানের গোপনীয়তা ছিল দুর্ভেদ্য। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের অনুমোদনক্রমে শুরু হলেও, পেন্টাগন (Pentagon) এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর (State Department)-এর অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও এই প্রকল্পের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। এমনকি, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র, তৎকালীন আফগান রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাই-এর সরকারকেও অন্ধকারে রাখা হয়েছিল।

অভিযানের ফলাফল: ব্যয়বহুল ব্যর্থতা নাকি সামান্য সাফল্য?

সিআইএ-র এই ‘পোস্ত অভিযান’ ছিল যেমন উচ্চাকাঙ্ক্ষী, তেমনই ব্যয়বহুল। অপারেশনটি চলন্ত থাকার সময়েই সাবেক কর্মকর্তারা এটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

মিশ্র ফলাফল: প্রাক্তন কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে এই প্রকল্পের ফলাফল ছিল ‘মিশ্র’ (Mixed Results)। কেউ কেউ কয়েক বছরের জন্য ‘কিছু সাফল্য’ দেখেছিলেন বলে দাবি করেন। তবে সামগ্রিকভাবে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ এবং কর্মকর্তারা মনে করেন, প্রকল্পটি ছিল ‘ভয়ঙ্কর ব্যয়বহুল’ (Tremendously Expensive) এবং আফগান মাদক অর্থনীতিতে এটি কোনও ‘উল্লেখযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব’ ফেলতে পারেনি।

অব্যাহত উৎপাদন: এই গোপন অভিযান চলা সত্ত্বেও আফগানিস্তান বিশ্বে আফিমের প্রধান উৎপাদক হিসাবে তার স্থান ধরে রেখেছিল। একজন কর্মকর্তা তাই অকপটে স্বীকার করেছিলেন, "The juice wasn't worth the squeeze"— অর্থাৎ, যে পরিমাণ চেষ্টা ও অর্থ এতে ব্যয় হয়েছে, সেই তুলনায় ফল লাভ হয়নি।

SIGAR-এর রিপোর্ট: মার্কিন বিশেষ পরিদর্শক জেনারেল ফর আফগানিস্তান রিকনস্ট্রাকশন (SIGAR)-এর ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদনেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, কোনও আমেরিকান কাউন্টার-ড্রাগ উদ্যোগই আফিম চাষের ক্ষেত্রে স্থায়ী হ্রাস আনতে সফল হয়নি।

আফিমের উপাখ্যানের আকস্মিক সমাপ্তি: তালিবান নিষেধাজ্ঞা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকা খরচ করে জৈব-রাসায়নিক আক্রমণের মাধ্যমে আফিমের উৎপাদন কমানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে, তখন সেই কাজটি সম্পূর্ণ অন্যভাবে সমাধান করল তালিবান।

২০২১ সালের অগস্টে দ্বিতীয়বার কাবুলে ক্ষমতা দখলের পর, তালিবান মুখপাত্র জবিউল্লা মুজাহিদ ঘোষণা করেন যে, তারা মাদক উৎপাদন এবং আফিম চাষে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। তাদের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলকে অবাক করে।

এই কঠোর নিষেধাজ্ঞার ফলে অভাবনীয় পরিবর্তন আসে। ২০২৩ সালের আন্তর্জাতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, আফিম চাষের পরিমাণ এক ধাক্কায় প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে যায়। ৬,২০০ টন থেকে উৎপাদন নেমে আসে মাত্র ৩৩৩ টনে। এটি আফগানিস্তানের মাদক ইতিহাসের একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। তবে এর ফলস্বরূপ লক্ষ লক্ষ আফগান কৃষক, যাদের একমাত্র জীবিকা ছিল পোস্ত চাষ, তারা রাতারাতি আর্থিক সঙ্কটের মুখে পড়েছেন, যা দেশে এক গুরুতর মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করেছে।

সিআইএ-র এই গোপন পোস্ত অভিযান আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার ইতিহাসে এক অদ্ভুত অধ্যায়। এটি প্রমাণ করে যে কোনও একটি দেশের অর্থনীতিতে আঘাত হানতে একটি শক্তি কতটা ভিন্ন ও অপ্রচলিত পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারে। এটি ছিল এক ধরনের 'ধীর গতির সাবোটেজ' (Slow-motion sabotage), যেখানে সরাসরি ধ্বংসের বদলে প্রকৃতির নিয়মকে ব্যবহার করে অর্থনীতিকে দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছিল।

কিন্তু আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সাফল্য এল সামরিক বা গোয়েন্দা কৌশল থেকে নয়, বরং একটি কঠোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। সিআইএ-র কোটি কোটি ডলারের গোপন প্রকল্প শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানের আফিম সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছিল। এই উপাখ্যানটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে কোনও জটিল সমস্যার সমাধান প্রযুক্তিনির্ভর কৌশলে নয়, বরং সেই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গভীর পরিবর্তনের মাধ্যমেই সম্ভব।

মন্তব্যসমূহ