ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় শেখ হাসিনা: অভিযোগগুলো কি কেবলই হাস্যকর রাজনৈতিক মঞ্চনাটক?

ব্যাঙেরছাতা

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ফলে ক্ষমতাচ্যুত সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) মামলার রায় ঘোষণা নিয়ে দেশের রাজনীতি ও বিচার বিভাগে যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়। এটি যেন এক দ্রুত মঞ্চায়িত নাটক, যার প্রতিটি দৃশ্য রাজনৈতিক প্রতিশোধের পুরোনো চিত্রনাট্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যে ট্রাইব্যুনালটি ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, রাতারাতি তার মূল লক্ষ্য পাল্টে গিয়ে মাত্র কয়েক মাসের পুরোনো একটি অভ্যুত্থানের বিচার করতে শুরু করেছে—তাও আবার ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে আসামি করে। প্রথম আলোর মতো সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য গণমাধ্যমের খবর বিশ্লেষণ করলে এমন একটি প্রশ্নই মনে জাগে: দ্রুততা ও পারিপার্শ্বিকতার কারণে এই গুরুতর অভিযোগগুলো কি কেমন যেন 'হাস্যকর' বা 'রাজনৈতিক প্রহসন' হয়ে গেলো না?

দ্রুততম ট্রায়াল ও আদালতের পুনর্বাসন:

যে বিষয়টি এই পুরো বিচার প্রক্রিয়াকে প্রথম দৃষ্টিতেই কৌতূহলোদ্দীপক বা হাস্যকর করে তুলেছে, তা হলো এর অস্বাভাবিক গতি। ১৯৭১ সালের সুদূর অতীতের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু করতে যেখানে দীর্ঘ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, তদন্তে লেগেছে বছরের পর বছর, সেখানে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের ঘটনা, যা এখনো রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ, তার বিচারকাজ শুরু, তদন্ত এবং রায় ঘোষণার পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাল মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে। ট্রাইব্যুনালের পুনর্গঠন এবং নতুন প্রসিকিউশন টিমের এই তৎপরতা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে, কিন্তু এই 'আলোর গতি'র বিচার কি ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ছাড়িয়ে গিয়ে রাজনৈতিক তাগিদের প্রতিফলন হয়ে ওঠেনি?

সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছেছে যে, রাষ্ট্রযন্ত্র ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গেই তার নিরপেক্ষতা হারায় এবং পূর্বের শত্রুকে শায়েস্তা করার জন্য সর্বোচ্চ আইনি কাঠামোকেও দ্রুততম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এক সরকারের সময় যারা ছিল 'দেশপ্রেমিক', আরেক সরকারের সময় তারাই হয়ে যায় 'মানবতাবিরোধী অপরাধী'। বিচারের এই ধরনের নাটকীয় রাজনৈতিক দিকবদল বিচার প্রক্রিয়ার গাম্ভীর্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, আর অভিযোগের গুরুত্বকে হ্রাস করে। যে কোনো নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের কাছে এই দ্রুততা আদালতের পবিত্রতার চেয়ে ক্ষমতার পালাবদলের চিত্রকেই বেশি প্রকট করে তোলে।

রাজসাক্ষী: আনুগত্যের সুবিধাজনক পালাবদল:

এই মামলার অন্যতম প্রধান এবং সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো সাবেক পুলিশ প্রধান (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের 'রাজসাক্ষী' (অ্যাপ্রুভার) হয়ে যাওয়া। গণ-অভ্যুত্থানের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তা, যিনি কিনা হত্যাকাণ্ড পরিচালনার নির্দেশ পালনে সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ, তিনি হঠাৎ করে দোষ স্বীকার করে নেন এবং তার সমস্ত অপরাধের দায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর চাপিয়ে দেন।

এই পরিস্থিতিটিই সবচেয়ে বেশি হাস্যরস ও সন্দেহের জন্ম দেয়। এটি যেন সিনেমার চিত্রনাট্য—একজন সহ-অভিযুক্ত নিজের জীবন ও স্বাধীনতা বাঁচাতে তার রাজনৈতিক প্রভুর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছেন। সাধারণ যুক্তিতে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রধানের পক্ষে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গণ-অভ্যুত্থান দমনে অংশ নেওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু যখন তিনি নিজের দোষ স্বীকার করে সমস্ত দায়ভার 'মাস্টারমাইন্ড' হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেন, তখন এটি আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি গুরুতর মামলার প্রমাণ নয়, বরং ক্ষমতার নতুন ভারসাম্যের সামনে নত হওয়া এক রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ বলেই প্রতীয়মান হয়।

আইজিপি আল-মামুন এখন বিচারের হাত থেকে মুক্তি পাবেন, কিন্তু এই মুক্তির বিনিময়ে তিনি যে 'সাক্ষ্য' দিয়েছেন, তা কি রাজনৈতিক সুবিধাভোগের চূড়ান্ত উদাহরণ নয়? এই ধরনের 'সাক্ষ্য' যখন একটি এত বড় মামলার মূল ভিত্তি হয়, তখন অভিযোগগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে ঠেকে যায়, এবং পুরো ব্যাপারটিই 'হাস্যকর' রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মতো দেখায়।

‘পলাতক’ সরকারপ্রধান ও আইনি প্রহসন:

শেখ হাসিনাকে 'পলাতক' ঘোষণা করে তার অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ চালিয়ে যাওয়া এবং রায় ঘোষণার প্রক্রিয়াও চরমভাবে সমালোচিত। একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, যিনি প্রায় দেড় দশক ধরে দেশ শাসন করেছেন, তাকে ভারতের মতো অন্য একটি দেশে 'পলাতক' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আইনগতভাবে পলাতক থাকাকালীন আপিলের সুযোগ না থাকার শর্তটি অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু যে রাজনৈতিক পরিবেশে তিনি ক্ষমতা হারিয়েছেন এবং দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, সেই প্রেক্ষাপটে তার এই 'পলাতক' পরিচয় কি কেবল একটি আইনি শব্দ, নাকি রাজনৈতিক প্রতিশোধের একটি কৌশল?

রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও, আসামির অনুপস্থিতিতে পরিচালিত এই বিচার প্রক্রিয়া একতরফা বলেই মনে হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের জোর দাবি এই ধারণা দেয় যে, বিচারকাজ শুরু হওয়ার আগেই যেন ফল নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল।

অভিযোগগুলো নিঃসন্দেহে মারাত্মক—হত্যা, গণহত্যার নির্দেশ ও উসকানিমূলক বক্তব্য। কিন্তু যখন ক্ষমতাধর ব্যক্তি ক্ষমতা হারানোর পরপরই পলাতক ঘোষিত হন, এবং তার অনুগতরাই রাতারাতি রাজসাক্ষী হয়ে সমস্ত দোষ তার ওপর চাপিয়ে দেন, তখন জনমনে এই সংশয় তৈরি হয় যে, এই বিচার কি জুলাই-হত্যাকাণ্ডের শিকারদের জন্য প্রকৃত ন্যায়বিচারের পথ প্রশস্ত করছে, নাকি এটি কেবলই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ?

 ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি প্রকৃত বিচার?

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলো ছিল গভীর বেদনাদায়ক ও জাতির জন্য এক চরম ট্র্যাজেডি, যার বিচার হওয়া অত্যাবশ্যক। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই মামলার দ্রুত বিচার ও রায় ঘোষণার প্রক্রিয়াটি এক নতুন ধরণের আইনি হাতিয়ারের জন্ম দিয়েছে, যা কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের উদাহরণ তৈরি করতে পারে।

যখন ন্যায়বিচারের পবিত্র মঞ্চে একজন প্রধান সহযোগী সুবিধাজনকভাবে রাজসাক্ষী হন, একজন প্রাক্তন সরকারপ্রধানকে অনুপস্থিতিতেই সর্বোচ্চ দণ্ড দেওয়া হয়, এবং পুরো প্রক্রিয়াটি লাইভ সম্প্রচার করে রাজনৈতিক মহলের তৃষ্ণা মেটানো হয়, তখন গুরুতর অভিযোগগুলোও তার গাম্ভীর্য হারায়। এটি আর ন্যায়বিচারের উদাহরণ থাকে না; হয়ে ওঠে এক হাস্যকর রাজনৈতিক মঞ্চনাটক, যেখানে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে আইন ও বিচার কেবল ক্ষমতার নতুন প্রভুদের ইচ্ছাপূরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই প্রক্রিয়াটি বিচার বিভাগকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, এবং দুর্ভাগ্যবশত, এত গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগাচ্ছে: "অভিযোগগুলো কি কেমন যেন হাস্যকর হয়ে গেলো না?"

এই বিষয়ে আপনার মতামত কী, তা কমেন্টে লিখে জানান। 

মন্তব্যসমূহ