রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট: হাতছাড়া হচ্ছে পোশাকের কার্যাদেশ, গভীর সংকটে অর্থনীতির মেরুদণ্ড

ব্যাঙেরছাতা

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো তৈরি পোশাক শিল্প (RMG)। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং জিডিপির ১০ শতাংশের বেশি অবদান রাখা এই খাতটি বর্তমানে এক নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ৩ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ এবং অন্যান্য জাতীয় দৈনিকে সংশ্লিষ্ট খবরগুলোর বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে নতুন পোশাক কার্যাদেশগুলো দ্রুত প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে। দেশের ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের এই প্রধান উৎসটি এখন অস্তিত্বের সংকটে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে, তা কেবল রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকেই বাধাগ্রস্ত করবে না, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সংকটের মূলে: অস্থিতিশীলতা ও জ্বালানি ঘাটতি

বাংলাদেশ গার্মেন্টস বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশন (বিজিবিএ) কর্তৃক আয়োজিত ‘বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারের চিত্রটি বাংলাদেশের পোশাক খাতের বর্তমান দুরবস্থার প্রতিচ্ছবি। সেখানে বক্তারা উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বারবার অবরোধের ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাসের স্বল্প সরবরাহ এবং প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং। টেক্সটাইল ও ডাইং প্রক্রিয়ার জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ অত্যাবশ্যক। কিন্তু এই নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অভাবে কারখানাগুলো সময়মতো উৎপাদন শেষ করতে পারছে না।

ব্যাঙেরছাতা

সময়মতো পণ্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিতে না পারার ফলস্বরূপ, রপ্তানিকারকরা বাধ্য হচ্ছেন অনেক বেশি ব্যয়বহুল বিমানপথে পণ্য পাঠাতে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের কারখানাগুলো আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সহসভাপতি মোহাম্মদ রাশেদ বলেন, দেশের সার্বিক অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নতুন অর্ডার দিতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছেন, এবং দ্রুত সমাধান না হলে এই সংকট আরও গভীর হবে।

প্রতিযোগিতামূলক বাজার হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা

বাংলাদেশের এই অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার সরাসরি সুবিধা নিচ্ছে প্রতিযোগী দেশগুলো। সংবাদ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ভারত, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো সুযোগ বুঝে তাদের রপ্তানিকারকদের জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়াচ্ছে এবং বাংলাদেশের হাতছাড়া হওয়া কার্যাদেশগুলো লুফে নিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নতুন করে ৫৪ মিলিয়ন ডলারের অর্ডার পাওয়ার খবর জানা গেছে।

বিজিএমইএ এবং অন্যান্য খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্রয়াদেশ হ্রাস এবং কাঁচামাল আমদানির জটিলতার কারণে ১৪০ থেকে ১৮২টির মতো পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে প্রায় ৯৪ হাজার কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। অনেক কারখানায়ই অর্ডার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এই অস্থিরতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বিদেশি ক্রেতারা চিরতরে অন্য দেশমুখী হতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।

অন্যান্য প্রশাসনিক ও নীতিগত জটিলতা

ব্যাঙেরছাতা

জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি অন্যান্য প্রশাসনিক ও নীতিগত জটিলতাও পোশাক খাতকে ঘিরে ধরেছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল আক্ষেপ করে বলেন, জাতীয় রপ্তানির ৮৫ শতাংশের বেশি অবদান রাখা সত্ত্বেও তারা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ পাচ্ছেন না, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা বাড়াচ্ছে। তিনি ঢাকা বিমানবন্দরের সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে বলেও উল্লেখ করেন, যা নতুন অর্ডারের প্রবাহে ধীরগতি সৃষ্টি করেছে।

পোশাক শিল্প মালিকরা আমলাতান্ত্রিক বাধা, ডলার সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খুলতে জটিলতার মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন। এসব বাধা সব মিলিয়ে গার্মেন্টস খাতকে একটি ‘সংকট ব্যবস্থাপনার খাতে’ পরিণত করেছে। এমনকি শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে সরকারি সিদ্ধান্তের সমালোচনাও এই সেমিনারে উঠে এসেছে। অন্যদিকে, বিরোধী দল বিএনপি’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, তারা ক্ষমতায় এলে এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়াতে কাজ করবে এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের জন্য ‘ফিল গুড’ পরিবেশ ফিরিয়ে আনবে।

উত্তরণের পথ ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

ব্যাঙেরছাতা

পোশাক খাত শুধু একটি শিল্প নয়; এটি দেশের স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রতীক। এই খাতে চলমান অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে শুধু রপ্তানি আয় নয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, নারী কর্মসংস্থান এবং দেশের সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।

খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি স্পষ্ট: 

সরকারের কাছে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির লক্ষ্য অর্জনে একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হোক। এর জন্য জরুরি ভিত্তিতে যা করা প্রয়োজন:

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: সবার আগে একটি আস্থাশীল ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।

জ্বালানি সরবরাহ: শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। প্রয়োজনে এই খাতে জরুরি ভর্তুকি বা বিশেষ ব্যবস্থা চালু করা।

নীতি সংস্কার: আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে ব্যবসাবান্ধব নীতি ও প্রশাসনিক সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করা।

যোগাযোগ ও অবকাঠামো: বিমানবন্দর ও বন্দরের কার্যক্রমে দক্ষতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা।

পোশাক শিল্পের বর্তমান সংকট শুধু ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিতবাহী। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এবং ক্রেতাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকল অংশীদারদের অবিলম্বে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে এই শিল্পকে রক্ষা করা না গেলে, দেশের অর্থনীতি অদূর ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে।

মন্তব্যসমূহ