‘নেতৃত্বের খেলা’ এবং বাংলাদেশের রাজনীতি: নেপথ্যে বিদেশি শক্তি?

ব্যাঙেরছাতা

সজীব ওয়াজেদ জয়-এর বিস্ফোরক অভিযোগ ও পটভূমি বিশ্লেষণ

সম্প্রতি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এনেছেন। তিনি সরাসরি বলেছেন, বাংলাদেশের দুটি বড় দলেরই (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) নেতৃত্ব পরিবর্তনে ‘বিদেশ থেকে একটা খেলা চলছে’। তার এই মন্তব্যটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে এবং গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।

এই অভিযোগটি এমন এক সময়ে এলো, যখন গত আগস্ট মাসের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ গভীর সংকটে রয়েছে এবং দলটির ভবিষ্যত নেতৃত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনসহ দেশের ভেতরেও নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। একই সাথে, দেশের অপর প্রধান দল বিএনপি-এর চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের বাইরে। এই পরিস্থিতিতে জয়-এর মন্তব্য কেবল একটি অভিযোগ নয়, বরং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাবের দীর্ঘদিনের বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

অভিযোগের মূল বক্তব্য: ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ বনাম গণতন্ত্র

সজীব ওয়াজেদ জয় তার বক্তব্যে দুটি প্রধান বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন:

অগণতান্ত্রিক তৎপরতা: তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, দুটি প্রধান দলের নেতৃত্ব পরিবর্তনের যে চেষ্টা চলছে, তা ‘গণতান্ত্রিক না’। তার মতে, দলের নেতৃত্ব কে দেবে, তা দলই নির্ধারণ করবে এবং দেশের নেতৃত্ব দেবে জনগণ। কিন্তু এই মুহূর্তে 'বিদেশি কয়েকটা দেশ, বিদেশি কয়েকটা শক্তি আর আমাদের সুশীল সমাজের কয়েকজন মিলে' কে প্রধানমন্ত্রী হলে বা কে নেতা হলে 'রিফাইন্ড' হবে, তা নির্ধারণ করতে চাইছে।

‘রিফাইন্ড’ ধারণার প্রত্যাখ্যান: জয় এই 'খেলা'-র অংশ হিসেবে যে ‘রিফাইন্ড বা পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ’-এর ধারণাকে ইঙ্গিত করেছেন, তা তিনি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি এর সাথে ‘ওয়ান ইলেভেনের’ (২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কাল) পরিস্থিতির তুলনা করেছেন, যখন একইভাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়কেই 'সংস্কার' বা 'পরিশুদ্ধ' করার চেষ্টা হয়েছিল। তার মতে, বিদেশি শক্তির এই ‘রিফাইন্ড’ করার চেষ্টা গণতন্ত্র-বিরোধী।

তিনি আরও নিশ্চিত করেছেন যে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাদের পরিবারের কেউ সরাসরি দলের হাল ধরবে না। অর্থাৎ, তিনি বা তার পরিবারের অন্য কেউ দলের নেতৃত্বের জন্য উপর থেকে নির্দেশ দেবেন না; এই সিদ্ধান্ত নেবে দল এবং দলের গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।

যে পটভূমিতে অভিযোগটি এলো

সজীব ওয়াজেদ জয়ের এই মন্তব্যকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা সম্ভব নয়। এর পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রধান দলগুলোর নেতৃত্ব সংকট।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব সংকট

ক্ষমতাচ্যুতি ও আইনি জটিলতা: গত (তথাকথিত) গণঅভ্যুত্থানের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার পর তার রাজনৈতিক ভবিষ্যত অনিশ্চিত।

নেতৃত্বের শূন্যতা: দলের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত অধিকাংশ নেতাই আত্মগোপনে বা কারাগারে। এমন অবস্থায়, কার্যত শেখ হাসিনাই দূর থেকে দলের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে জল্পনা: শেখ হাসিনার অবর্তমানে কে দলের হাল ধরবেন—এটি এখন দলের অভ্যন্তরে এবং বাইরে সবচেয়ে বড় আলোচ্য বিষয়। ঠিক এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে যদি 'বিদেশি খেলা' শুরু হয়, তবে তা দলের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ। জয়-এর 'রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ' সংক্রান্ত বক্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, কিছু বিদেশি শক্তি এমন একটি দুর্বল বা বিকল্প নেতৃত্বকে চাপিয়ে দিতে চাইছে, যা তাদের অনুকূলে থাকবে।

বিএনপি-এর নেতৃত্ব পরিস্থিতি

বিএনপি-এর ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব বিদেশ-নির্ভর। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে নির্বাসিত। এই মুহূর্তে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক।

বিদেশ থেকে দল পরিচালনা: তারেক রহমান দেশের বাইরে থেকে দল পরিচালনা করছেন

বিদেশি তৎপরতা: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে সরকারের বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়ে আসছিল। এই কারণেই পশ্চিমা কূটনীতিকদের সাথে দলটির নিবিড় যোগাযোগ ছিল, যা অনেক সময় কূটনৈতিক তৎপরতাকে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিয়েছে। জয়-এর অভিযোগ দুটি দলকেই ইঙ্গিত করলেও, চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং বিএনপির নেতৃত্বের দুর্বলতাও এই ‘খেলা’র অংশ হতে পারে।

‘বিদেশি খেলা’ কী নতুন? ইতিহাসের পাতা উল্টালে

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ নতুন নয়। বস্তুত, দেশের দুটি প্রধান দলের মধ্যে তীব্র রেষারেষি এবং সমঝোতার অভাবই আন্তর্জাতিক শক্তিকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর সুযোগ করে দেয়।

ওয়ান-ইলেভেন (২০০৭): সজীব ওয়াজেদ জয় নিজেই ২০০৭-০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উদাহরণ টেনেছেন। সেই সময় তৎকালীন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের নেত্রীদের রাজনীতি থেকে মাইনাস করার এবং দুই দলকেই ‘সংস্কারের’ চেষ্টা করা হয়েছিল। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই প্রচেষ্টার নেপথ্যেও ছিল পশ্চিমা কূটনীতিকদের সক্রিয় ভূমিকা, যাদের উইকিলিকসে প্রকাশিত তারবার্তায় ‘কফি গ্রুপ’ বৈঠক করার মতো ঘটনাও উঠে এসেছে।

সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা: গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরেও পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতিকরা অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। নির্বাচনকালীন সরকার, মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের বিষয় নিয়ে তাদের বক্তব্য-বিবৃতি অনেক সময় বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানানোও তখন বেশ আলোচিত হয়।

এই প্রেক্ষাপটে, জয়-এর অভিযোগ সেই ঐতিহাসিক এবং চলমান বিতর্কেরই পুনরাবৃত্তি। তবে এবারের অভিযোগের লক্ষ্য হলো সরাসরি দুই প্রধান দলের নেতৃত্বের পরিবর্তন।

গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

সজীব ওয়াজেদ জয়-এর মন্তব্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং দলীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। এটি একদিকে যেমন রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর বিদেশি চাপের অভিযোগ, তেমনি অন্যদিকে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও নেতৃত্বের শূন্যতাকে প্রকাশ করেছে।

মূল বিশ্লেষণমূলক দিকগুলো হলো:

রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্বলতা: 

যদি দলগুলো নিজেদের নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া অভ্যন্তরীণভাবে স্বচ্ছ ও সুসংগঠিত রাখতে পারত, তবে বিদেশি শক্তির ‘খেলতে’ আসার সুযোগ কম থাকত। প্রধান দলগুলোর মধ্যেই পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সমঝোতার অভাব বিদেশিদের হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিচ্ছে।

গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা: 

জয়-এর বক্তব্য গণতন্ত্রের প্রতি তার আস্থার কথা বললেও, বাস্তবতা হলো গণঅভ্যুত্থানের ফলে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি এখনও সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

জনগণের ভূমিকা: 

এই পুরো ‘খেলা’য় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দেশের জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা কোথায়? জনগণ কী বিদেশি মোড়লদের চাপানো নেতৃত্ব চায়, নাকি নিজেরা গণতান্ত্রিক উপায়ে নেতৃত্ব নির্বাচন করতে চায়? জয় সেই প্রশ্নই তুলেছেন।

সর্বোপরি, বাংলাদেশের আজকের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধানে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করা এবং বিদেশি প্রভাবকে কঠোরভাবে প্রতিহত করা। দুই প্রধান দলের নেতৃত্বের ভবিষ্যত নিয়ে 'বিদেশ থেকে খেলা' চলুক বা না চলুক, দেশের গণতন্ত্রের সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন দলগুলোর মেরুদণ্ড সোজা করে জনগণের প্রতি আস্থা রাখা এবং নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেরাই করা। অন্যথায়, বিদেশি মোড়লগিরি কেবল বাড়তেই থাকবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে তাদের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক এবং দেশীয় প্রেক্ষাপটভিত্তিক করে তোলা, যাতে কোনো বিদেশি শক্তি বা ‘সুশীল সমাজ’ তাদের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করতে না পারে। কারণ, দেশের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষমতা কেবল এ দেশের জনগণের হাতেই থাকা উচিত।

এই কঠিন সময়ে, সজীব ওয়াজেদ জয়-এর অভিযোগ একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এই বার্তাকে আমলে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের সার্বভৌমত্বকে সমুন্নত রাখা এবং নিজেদের নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে বিদেশি প্রভাবমুক্ত করা। অন্যথায়, এই 'খেলা' চলতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের গণতন্ত্রই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মন্তব্যসমূহ