শিক্ষকদের কর্মসূচিতে এভাবে আক্রমণ কেন? একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে রাষ্ট্র ও সমাজ

ব্যাঙেরছাতা

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দূরীকরণসহ তিন দফা দাবিতে চলমান আন্দোলন এবং সেই কর্মসূচিতে পুলিশের অমানবিক আক্রমণ একটি গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। শিক্ষক সমাজের ওপর পুলিশের লাঠিপেটা, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের মতো ঘটনা কেবল আন্দোলন দমনের চিত্রই তুলে ধরেনি, বরং রাষ্ট্রের শিক্ষা এবং শিক্ষকদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির এক করুণ প্রতিচ্ছবিও দেখিয়েছে। অন্যদিকে, শিক্ষকদের পাঠদান থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিরত থাকার ঘোষণা এবং বিপরীতে শিক্ষা উপদেষ্টার ‘কঠোর ব্যবস্থা’ গ্রহণের হুমকি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে। সংবাদপত্রের পাতা উল্টালে এই পুরো ঘটনাপ্রবাহের যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও প্রশ্নবিদ্ধ।

আক্রমণের প্রেক্ষাপট: দাবি ও বঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাস

আন্দোলনরত প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের মূল দাবিগুলো ছিল সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ফসল:

দশম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ: সরকারি গাড়িচালক বা অন্যান্য বিভাগের সমমানের কর্মচারীরা যেখানে দশম/দ্বাদশ গ্রেডে বেতন পান, সেখানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষকরা এখনো ১৩তম গ্রেডে আটকে আছেন। এই বেতন বৈষম্য তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করছে।

উচ্চতর গ্রেড সমস্যার সমাধান: ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তিতে বিদ্যমান জটিলতা নিরসন।

শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি: সহকারী শিক্ষকদের জন্য শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির নিশ্চয়তা।

শিক্ষকরা বহুবার আলোচনার টেবিলে বসেছেন, কিন্তু বারবারই ফলপ্রসূ সমাধান না পেয়ে তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন শেষে তারা যখন শাহবাগ অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন, তখনই ঘটে পুলিশের নৃশংস আক্রমণ।

অমানবিক আক্রমণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন

গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায়, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পদযাত্রায় বাধা দিতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে, জলকামান ব্যবহার করেছে এবং ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে লাঠিপেটাও করেছে। এতে বহু শিক্ষক আহত হয়েছেন, কেউ কেউ রাবার বুলেটবিদ্ধও হয়েছেন।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন ওঠে: শিক্ষকদের মতো একটি সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ পেশাজীবী গোষ্ঠীর ওপর এমন বর্বর আক্রমণ কেন?

শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার: বিশ্বের প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ ও প্রতিবাদ করার অধিকার মৌলিক। শিক্ষকরা তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে রাস্তায় নেমেছিলেন, যা কোনোভাবেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা জনজীবনে সরাসরি হুমকি ছিল না।

আনুপাতিক বলপ্রয়োগের নীতি লঙ্ঘন: পুলিশ আন্দোলন দমনে যে পরিমাণ শক্তি (জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড) ব্যবহার করেছে, তা ছিল আনুপাতিক বলপ্রয়োগের নীতির (Principle of Proportionality) চরম লঙ্ঘন। ইট-পাটকেল ছোড়ার মতো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও, নিরস্ত্র শিক্ষকদের ওপর এমন ব্যাপক শক্তি প্রয়োগের কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। শিক্ষকরা জাতির নির্মাতা, তাদের ওপর এমন আক্রমণ রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকেই ক্ষুণ্ন করে।

সংকটের সমাধান নাকি দমন: সরকারের উচিত ছিল আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সংকট নিরসন করা। কিন্তু আলোচনার পথ রুদ্ধ করে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলন দমন করার কৌশল মূলত সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।

উপদেষ্টার হুমকি ও শিক্ষকদের কর্মবিরতি: সংঘাতের পথে শিক্ষা

এই ঘটনার পরপরই শিক্ষা উপদেষ্টার পক্ষ থেকে যে বক্তব্য এসেছে, তা আগুনে ঘি ঢেলেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার মন্তব্য করেছেন, শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডের দাবি ‘যৌক্তিক নয়’ এবং আন্দোলনের নামে পড়ালেখা বিঘ্নিত হলে ‘সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, পুলিশের হামলার প্রতিবাদ এবং দাবি আদায়ের লক্ষ্যে শিক্ষকরা অনির্দিষ্টকালের জন্য শ্রেণিকক্ষে পাঠদান থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।

এই দ্বিমুখী অবস্থান একটি সংঘাতের ইঙ্গিত দেয়:

শিক্ষকের মর্যাদা বনাম সরকারি কঠোরতা 

বেতন-বৈষম্যের কারণে শিক্ষকরা নিজেদের অসম্মানিত মনে করছেন (যেমন, সরকারি গাড়িচালকের চেয়েও নিম্ন গ্রেডে বেতন পাওয়া)। এমতাবস্থায়, উপদেষ্টার এমন মন্তব্য শিক্ষকদের আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত হেনেছে। উপদেষ্টার উচিত ছিল আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা, কঠোর ব্যবস্থার হুমকি নয়।

শিক্ষার ভবিষ্যৎ বনাম অহমিকা

শিক্ষকদের কর্মবিরতি দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেবে। এই দায়ভার কেবল শিক্ষকদের নয়, বরং যারা আলোচনার পথ বন্ধ করে দমন-পীড়নের মাধ্যমে সংকটকে দীর্ঘায়িত করেছেন, তাদেরও।

শিক্ষার মেরুদণ্ড ভেঙে কি উন্নয়ন সম্ভব?

শিক্ষকরা রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলোর মধ্যে অন্যতম। যে জাতি শিক্ষকের মর্যাদা দিতে জানে না, সে জাতি কখনো উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে না।

প্রাথমিক শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবিকে দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলিয়ে রাখা, তাদের রাজপথে নামতে বাধ্য করা এবং এরপর তাদের ওপর পুলিশের অমানবিক আক্রমণ—এই পুরো ঘটনাটি প্রশ্ন তোলে: শিক্ষকেরাই যদি রাষ্ট্রের বৈষম্য ও দমনের শিকার হন, তবে তারা কীভাবে আগামী প্রজন্মকে নৈতিকতা, ন্যায় ও সুনাগরিকতার শিক্ষা দেবেন?

শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সংস্কৃতিকে সম্মান জানানো এবং শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে দ্রুত ন্যায্য দাবিগুলো মেনে নেওয়াতেই রাষ্ট্রের কল্যাণ নিহিত। অন্যথায়, শুধুমাত্র কঠোরতা দেখিয়ে শিক্ষার মেরুদণ্ডকে দুর্বল করা হলে, তার ফল দেশের ভবিষ্যৎকেই ভোগ করতে হবে। এই সংঘাতের দ্রুত অবসান হোক, শিক্ষক ফিরে যাক শ্রেণিকক্ষে, আর রাষ্ট্র তাদের প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত করুক—এটাই এখন আমাদের সমাজের একমাত্র প্রত্যাশা।

মন্তব্যসমূহ