জনশক্তি রপ্তানিতে নতুন দিগন্ত: সৌদি আরবে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগে জি-টু-জি ফ্রেমওয়ার্কের প্রস্তাবনা—সুযোগ, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

ব্যাঙেরছাতা

বহির্বিশ্বের শ্রমবাজার, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। সৌদি আরব বরাবরই বাংলাদেশের বৃহত্তম শ্রমবাজার, যেখানে প্রায় ৩০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। তবে এতদিন এই জনশক্তি রপ্তানির বড় অংশই ছিল সাধারণ ও স্বল্প-দক্ষ ক্যাটাগরির। এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। সৌদি আরবের 'ভিশন ২০৩০'-এর অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন এবং ‘হেলথ হোল্ডিং কোম্পানি’ (HHC)-এর মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া ঢেলে সাজানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা বাংলাদেশের জন্য উচ্চ-দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির এক বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে। সম্প্রতি সৌদি সরকার কর্তৃক বাংলাদেশি ডাক্তার, নার্স, কেয়ারগিভার, টেকনিশিয়ান ও সংশ্লিষ্ট কর্মী নিয়োগের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক জি-টু-জি (সরকারি পর্যায়ে) ফ্রেমওয়ার্কের প্রস্তাব—এই পরিবর্তনেরই স্পষ্ট ইঙ্গিত।

জি-টু-জি ফ্রেমওয়ার্ক: বিশেষায়িত কর্মী নিয়োগে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি

সৌদি আরবের এই প্রস্তাবটি বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি নিয়োগের সুযোগ নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি, নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসন নিশ্চিত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। জি-টু-জি পদ্ধতি মূলত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এবং কর্মীদের নিয়োগ ব্যয়কে ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনে, যা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে সহায়ক।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া এবং সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কন্ট্র্যাক্টিং ও বিদেশি অফিসবিষয়ক মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ বিন হাসান আল-দুগাইসারের মধ্যে রিয়াদে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের মূল আলোচনার কেন্দ্রে ছিল:

কৃতিত্বের স্বীকৃতি: ২০২৪-২৫ সালে ১,২০০ জন বাংলাদেশি গ্র্যাজুয়েট নার্স নিয়োগের সফলতাকে সৌদি পক্ষ প্রশংসা করে। এটি প্রমাণ করে যে, যথাযথ মানদণ্ড পূরণ করতে পারলে বাংলাদেশি স্বাস্থ্যকর্মীরা সৌদি আরবে সফল হতে পারেন।

কর্মীর মানোন্নয়ন: বাংলাদেশ পক্ষ নার্সদের কর্মদক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও সেবার মান নিয়ে সৌদি আরবের মতামত চায় এবং প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান ও সামগ্রিক প্রস্তুতি উন্নয়নে পরামর্শ কামনা করে।

সহযোগিতার ক্ষেত্র: মূল্যায়ন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করতে সৌদি কমিশন ফর হেলথ স্পেশালটিজের (SCFHS) সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো, সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর, যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন এবং পাঠ্যক্রম সমন্বয়ের প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ।

এই আলোচনাগুলো স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশ চাইছে উচ্চতর সরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও মসৃণ ও দ্রুত করতে।

মান নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন: প্রোমেট্রিক পরীক্ষা ও HHC-এর ভূমিকা

যদিও জি-টু-জি চুক্তিকে একটি সুখবর হিসেবে দেখা হচ্ছে, কিন্তু এর বাস্তবায়নে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ও শর্ত রয়েছে, যা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ দাবি করে। এই শর্তগুলো মূলত মান নিয়ন্ত্রণ ও পেশাগত যোগ্যতার আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার বিষয়ে সৌদি আরবের কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন।

প্রথমত, বাংলাদেশ নার্সদের বেসরকারি খাতে নিয়োগ সহজ করতে প্রোমেট্রিক পরীক্ষার ছাড় চাইলেও, সৌদি আরব স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই কিছু শর্ত বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে রয়েছে:

প্রোমেট্রিক পরীক্ষা (Prometric Exam): আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই পরীক্ষা নার্সদের জন্য বাধ্যতামূলক।

পেশাগত যোগ্যতা ও লাইসেন্স: সৌদি হেলথ কাউন্সিল কর্তৃক পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি এবং নার্স হিসেবে সৌদি লাইসেন্স অর্জন করা অপরিহার্য।

বীমা: চিকিৎসাগত ত্রুটি কাভার করার জন্য বীমা বাধ্যতামূলক।

এই শর্তগুলো নির্দেশ করে যে, সৌদি আরব কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়, বরং তারা চাইছে সর্বোচ্চ মানের স্বাস্থ্যসেবা কর্মী।

দ্বিতীয়ত, সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগের দায়িত্ব এখন হেলথ হোল্ডিং কোম্পানি (HHC)-এর হাতে চলে গেছে। এটি একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন। HHC হলো একটি সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি, যার লক্ষ্য স্বাস্থ্যসেবা খাতকে আরও বাণিজ্যিক ও গতিশীল করা। এর ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়িক দক্ষতা, দ্রুততা এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের নীতি যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে HHC-এর এই নতুন কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে জি-টু-জি চুক্তিকে সেভাবে সাজানো এখন জরুরি।

তৃতীয়ত, সৌদি আরবে বর্তমানে ক্রিটিক্যাল কেয়ার নার্সের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশি নার্সরা সাধারণত সাধারণ ওয়ার্ডে টেকনিক্যাল নার্স হিসেবে স্বাধীন নার্সের তত্ত্বাবধানে কাজ করছেন। এর মানে হলো, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানের হলেও, বিশেষায়িত দক্ষতার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।

সাধারণ কর্মী নিয়োগের প্রেক্ষাপটে বিশেষায়িত চুক্তির গুরুত্ব

এই স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রস্তাবটি বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে স্বাক্ষরিত বৃহত্তর কর্মী নিয়োগ চুক্তির ধারাবাহিকতা বহন করে। গত কয়েক বছরে সাধারণ কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষা ও অভিবাসন প্রক্রিয়াকে দালালমুক্ত করা।

জি-টু-জি ফ্রেমওয়ার্কের মূল সুবিধাগুলো হলো:

স্বচ্ছতা ও সুরক্ষা: সরকার-থেকে-সরকার চুক্তি হওয়ায় নিয়োগকর্তা ও কর্মীর মধ্যে চুক্তির স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। কর্মীদের ইকামা (বসবাসের অনুমতিপত্র) নবায়নের দায়িত্ব নিয়োগকর্তার ওপর সুনির্দিষ্টভাবে বর্তায়, যা শ্রমিকদের হয়রানি থেকে রক্ষা করে।

কম অভিবাসন ব্যয়: এই পদ্ধতিতে অভিবাসন ব্যয় সর্বোচ্চ ৪৫,০০০ টাকার মধ্যে সীমিত রাখার বাধ্যবাধকতা থাকে, যা কর্মীদের ঋণগ্রস্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে।

দক্ষতার ওপর জোর: সাধারণ কর্মী নিয়োগের চুক্তি ও বর্তমান স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব—উভয়ই ইঙ্গিত দেয় যে, সৌদি শ্রমবাজার এখন "পরিমাণ"-এর চেয়ে "গুণগত মান"-এর দিকে মনোনিবেশ করছে।

অতীতে বাংলাদেশ থেকে যে বিপুল সংখ্যক কর্মী সৌদি আরবে গিয়েছেন, তাদের ৮০ শতাংশেরও বেশি অদক্ষ বা স্বল্প-দক্ষ ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে যখন সৌদি আরবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যখাতের মতো 'হট জব'-এ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য দক্ষ ও বিশেষায়িত কর্মী রপ্তানির এই সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত হবে না।

বাংলাদেশের করণীয়: দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞানের সমন্বয়

এই জি-টু-জি ফ্রেমওয়ার্ককে কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যা ৯০০+ শব্দের এই বিশ্লেষণের উপসংহার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে:

০১। প্রশিক্ষণে বিশেষীকরণ:

স্বাস্থ্যকর্মীদের সাধারণ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন ক্ষেত্রগুলোতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বিশেষ করে, ক্রিটিক্যাল কেয়ার নার্সিং (Critical Care Nursing), ডায়ালাইসিস টেকনিশিয়ান, বায়োমেডিক্যাল টেকনিশিয়ান ইত্যাদির ওপর দ্রুত কোর্স চালু করা আবশ্যক। এই কোর্সগুলোর কারিকুলাম অবশ্যই সৌদি কমিশন ফর হেলথ স্পেশালটিজের (SCFHS) সঙ্গে সমন্বয় করে ডিজাইন করতে হবে।

০২। ভাষাজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ:

চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য আরবি ভাষা ও ইংরেজি ভাষায় সাবলীল হওয়া অত্যাবশ্যক, কারণ স্বাস্থ্যসেবা একটি সরাসরি যোগাযোগের পেশা। নিয়োগের পূর্বে প্রমিত ভাষা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের যোগাযোগ দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।

০৩। মূল্যায়ন ও লাইসেন্সিং সহায়তা:

সরকারকে প্রোমেট্রিক পরীক্ষা, লাইসেন্সিং এবং সৌদি হেলথ কাউন্সিলের স্বীকৃতি প্রক্রিয়াকে সহজ করতে একটি জাতীয় 'স্কিল সার্টিফিকেশন অথরিটি'র মাধ্যমে সরাসরি সহায়তা দিতে হবে। SCFHS-এর সঙ্গে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ দ্রুত গঠন করে পাঠ্যক্রম সমন্বয় ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে মানসম্মত করতে হবে।

০৪। এইচএইচসি (HHC) কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্রুত চুক্তি:

সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তনের ফলে নিয়োগের দায়িত্ব এখন HHC-এর ওপর। তাই যত দ্রুত সম্ভব HHC কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সংশোধিত জি-টু-জি চুক্তি চূড়ান্ত করতে হবে, যা নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সৌদি আরবের স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের জন্য জি-টু-জি ফ্রেমওয়ার্ক প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য একটি স্বর্ণালী সুযোগ। এটি শুধু রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াবে না, বরং বাংলাদেশের জনশক্তির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করবে। অদক্ষ শ্রমিক নির্ভরতা কমিয়ে দক্ষ ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যকর্মী রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশ নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং উচ্চ বেতনের অভিবাসন নিশ্চিত করতে পারে। তবে এই সুযোগকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দ্রুত, কার্যকর এবং মানসম্মত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সৌদি আরবের কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের শর্তগুলো পূরণে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে হবে। এই প্রস্তুতির ওপরই নির্ভর করছে আগামীতে সৌদি স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা সুদৃঢ় হবে। জি-টু-জি ফ্রেমওয়ার্ককে সফল করতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদেরও এগিয়ে আসতে হবে।

এই বিষয়ে আপনার মতামত কী তা কমেন্টে লিখে জানান। কমেন্ট বক্স সকলের জন্য উন্মুক্ত।

মন্তব্যসমূহ