প্রশাসনিক “পেশিশক্তি”র ছত্রছায়ায় গড়ে উঠা তারুণ্যের রাজনীতি বাংলাদেশে কতটুকু সফলতা পাবে?

ব্যাঙেরছাতা


সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি নতুন ধারার উত্থান চোখে পড়ছে: তারুণ্যনির্ভর রাজনৈতিক শক্তির আত্মপ্রকাশ। তত্ত্বগতভাবে, দেশের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ যখন তরুণ, তখন এই শক্তির উত্থানকে একটি জাতির জন্য শুভলক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত ছিল। তারুণ্য মানে নতুনত্ব, আদর্শ, সাহসিকতা এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। বাংলাদেশের অভ্যুদয় থেকে শুরু করে প্রতিটি ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনে তরুণরাই অগ্রভাগে ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই তারুণ্যের রাজনীতির প্রকৃতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে একটি প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে আসে—এই উত্থান কতটুকু স্বতঃস্ফূর্ত এবং এর ভিত্তি কতটা আদর্শিক? বিশেষ করে যখন এই শক্তি প্রশাসনিক পেশিশক্তি এবং বিদ্যমান ক্ষমতার আনুকূল্যে বেড়ে ওঠে, তখন এর দীর্ঘমেয়াদী সফলতা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক।

তারুণ্যের রাজনীতির ঐতিহাসিক পটভূমি: আদর্শ থেকে সুবিধাবাদ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছাত্রদের ভূমিকা চিরকালই স্বর্ণাক্ষরে লেখা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসমাজ ছিল পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। সে সময়ের ছাত্র রাজনীতি ছিল মূলত নীতি-আদর্শভিত্তিক এবং জনকল্যাণমুখী। ছাত্র নেতারা নিজেদের অধিকার ও জাতীয় স্বার্থরক্ষায় নির্দ্বিধায় জীবন উৎসর্গ করেছেন।

কিন্তু স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ছাত্র রাজনীতি ক্রমশ মূল রাজনৈতিক দলগুলোর 'লেজুড়বৃত্তি’-তে পরিণত হতে শুরু করে। বিশেষত, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলো প্রশাসনের অলিখিত 'পেশিশক্তি' হিসেবে কাজ করতে শুরু করে, যা শিক্ষাঙ্গনে এবং পরে সামগ্রিক রাজনীতিতে এক ধরনের সহিংস সংস্কৃতি সৃষ্টি করে। এর ফলস্বরূপ, নীতিনিষ্ঠ মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশ রাজনীতি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

সাম্প্রতিক যে তারুণ্যের রাজনীতির উত্থান, তার শেকড় এই দীর্ঘদিনের ক্ষমতার রাজনীতির মধ্যেই নিহিত। এই নতুন শক্তি “ফ্রেশার” (রাজনীতিতে নবাগত) তরুণদের সমন্বয়ে গঠিত নয়। বরং এরা বিভিন্ন সময়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থেকে, সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে অথবা ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে, “প্রতিহিংসাপরায়ণ” এক নতুন ধারার রাজনীতি সৃষ্টি করেছে। এই রাজনীতি আদর্শ বা জনস্বার্থের চেয়ে ক্ষমতার বৃত্তে নিজেদের অবস্থান তৈরি ও সুসংহত করার লক্ষ্যের দিকেই বেশি ঝুঁকছে।

পেশিশক্তির ছত্রছায়া: সাফল্যের পথে কাঁটা

যে তারুণ্যের রাজনীতি প্রশাসনিক পেশিশক্তির ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে, তার সফলতা পরিমাপের মানদণ্ডটিও ভিন্ন হতে বাধ্য। এই ধরনের উত্থানের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো নিম্নরূপ:

০১. স্বকীয়তার সংকট ও জনগণের অনাস্থা

প্রশাসনিক আনুকূল্যে গড়ে ওঠা কোনো রাজনৈতিক শক্তি কখনোই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত বিশ্বাস অর্জন করতে পারে না। তাদের উত্থানকে মানুষ ক্ষমতার পালাবদলের একটি কৌশল হিসেবে দেখতে পারে, যা গণতান্ত্রিক আদর্শের পরিপন্থী। তরুণদের নতুন দল হিসেবে নয়, বরং তারা প্রশাসনের ‘প্রক্সি’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এতে তারা দ্রুত ক্ষমতা বা পরিচিতি পেলেও, দীর্ঘমেয়াদী গণভিত্তি এবং জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে।

০২. আদর্শিক শূন্যতা ও প্রতিশোধের রাজনীতি

এই তরুণ নেতাদের যদি দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন থেকে সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত হয়ে বা প্রতিশোধের মানসিকতা নিয়ে বেরিয়ে আসতে হয়, তবে তাদের নতুন রাজনীতির মূল ভিত্তি গঠনমূলক আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা প্রতিহিংসা হওয়ার ঝুঁকি থাকে। রাজনীতিকে যদি তারা বদলা নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে, তবে এই ধারার রাজনীতি দেশের জন্য নতুন কোনো গঠনমূলক বার্তা বয়ে আনতে পারবে না। এটি কেবল ক্ষমতার কেন্দ্রে মুখ পরিবর্তন করবে, কিন্তু দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অপশাসনের মূল কাঠামোকে অক্ষুণ্ণ রেখে দেবে।

০৩. কাঠামোগত দুর্বলতা ও ভঙ্গুরতা

প্রশাসনিক ছত্রছায়া হলো একটি কৃত্রিম অবলম্বন, যা কোনো রাজনৈতিক দলের নিজস্ব কাঠামোগত শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। একটি আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল তৃণমূল থেকে গড়ে ওঠে, দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে তার ভিত্তি মজবুত করে। কিন্তু যদি কোনো দল ক্ষমতার সুবিধা নিয়ে দ্রুত প্রতিষ্ঠা পেতে চায়, তবে সেই প্রতিষ্ঠা সাময়িক ও ভঙ্গুর হতে পারে। ছত্রছায়া সরে গেলে বা ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে এই তারুণ্যের রাজনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

০৪. তরুণদের রাজনীতির প্রতি বিমুখতা বৃদ্ধি

এই ধরনের রাজনীতি যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে দেশের বৃহত্তর তরুণ প্রজন্মের ওপর। এমনিতেই এক জরিপে দেখা গেছে, ৮৩ শতাংশের বেশি তরুণ রাজনীতিতে অনাগ্রহী (তথ্যসূত্র: সানেম-একশনএইড জরিপ, ২০২০-এর কাছাকাছি সময়ে)। যদি এই নতুন তারুণ্যনির্ভর উদ্যোগও দুর্নীতি, সহিংসতা এবং ক্ষমতার খেলায় জড়িয়ে পড়ে, তবে তা আরও বেশি সংখ্যক মেধাবী তরুণকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। ফলে রাজনীতিতে 'ভালো মানুষের' অভাব আরও প্রকট হবে।

সফলতার পথ ও শর্তাবলী

তবুও, বাংলাদেশের জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারুণ্যের এই উত্থানকে সুযোগের জানালা হিসেবেও দেখা যেতে পারে, যদি তারা নির্দিষ্ট শর্তগুলো পূরণ করতে পারে।

০১. আদর্শ ও নীতির প্রতি অঙ্গীকার

এই তরুণ নেতৃত্বকে দ্রুত প্রশাসনিক নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে হবে। তাদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের হাতিয়ার নয়, বরং সুশাসন, ন্যায়বিচার, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাদের অবশ্যই একটি সুস্পষ্ট এবং জনবান্ধব আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করতে হবে, যা কেবল ক্ষমতার মোহ থেকে তরুণদেরকে রক্ষা করবে।

০২. প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে গঠনমূলক রাজনীতি

অতীতের বঞ্চনা বা ক্ষোভকে কাজে লাগানো যেতে পারে, কিন্তু রাজনীতিকে প্রতিশোধের ক্ষেত্র বানানো যাবে না। তাদের দলীয় রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা করতে হবে, যেখানে মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন থাকবে এবং সব স্তরের তরুণদের জন্য রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে।

০৩. জনসম্পৃক্ততা ও বিকল্প নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা

তাদের অবশ্যই বিদ্যমান মূলধারা থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের সমস্যা সমাধানে মনোযোগী হতে হবে। এই শক্তিকে অবশ্যই তাদের সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ জনগণের কাছে নিজেদের যথাযথ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে হবে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

প্রশাসনিক পেশিশক্তির ছত্রছায়ায় গড়ে উঠা তারুণ্যের রাজনীতি বাংলাদেশের মতো জটিল রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি দ্বিমুখী তলোয়ারের মতো। একদিকে এটি তরুণদের রাজনীতিতে আসার একটি সুযোগ তৈরি করে, আবার অন্যদিকে এর ভিত্তি যদি ক্ষমতা, সুবিধাভোগ এবং প্রতিহিংসার উপর দাঁড়ানো থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের মুখ দেখবে না।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সত্যিকার সফলতা পেতে হলে এই তরুণ শক্তিকে অবশ্যই সাহসিকতার সাথে প্রশাসনিক পেশিশক্তির বাঁধন ছিন্ন করতে হবে এবং জনগণের ভালোবাসা ও আস্থা অর্জন করতে হবে। তাদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা কেবল ক্ষমতার হাতবদল নয়, বরং গণতন্ত্র, নৈতিকতা এবং প্রগতির একটি নতুন যুগের সূচনা করতে এসেছে। নতুবা, তাদের উত্থান কেবলই বাংলাদেশের দীর্ঘ ও জটিল রাজনৈতিক ইতিহাসের আরেকটি ক্ষমতাকেন্দ্রিক উপাখ্যান হিসেবে ব্যর্থ হয়ে যাবে।

তাদের সফলতা নির্ভর করছে একমাত্র তাদের আদর্শিক সততা ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত থাকার সক্ষমতার ওপর।

এই প্রতিবেদনটি অন্য কোনো পত্রিকায় প্রকাশিত কোনো সংবাদের বিশ্লেষণ নয়। এটি ‘ব্যাঙেরছাতা টিম’-এর নিজস্ব প্রতিবেদন। প্রতিবেদনটি পড়ার পর আপনার প্রতিক্রিয়া বা মতামত কী তা কমেন্টে লিখে জানান। কমেন্ট বক্স সকলের জন্য উন্মুক্ত।

মন্তব্যসমূহ